ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৪৭ মিনিট আগে
ডা. মুনিম রেজা

ডা. মুনিম রেজা

এমডি রেসিডেন্ট, চাইল্ড এন্ড এডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রি, বিএসএমএমইউ।


৩১ মার্চ, ২০১৯ ১০:১৮

চিকিৎসকের আতঙ্ক: ভুল চিকিৎসা আর অবহেলার অভিযোগ!

চিকিৎসকের আতঙ্ক: ভুল চিকিৎসা আর অবহেলার অভিযোগ!

ফুটফুটে এক বাচ্চা জন্ম দেয়ার ১৫ দিনের মাথায় হটাৎ করে মায়ের সমস্যা শুরু হল। উলটাপালটা আচরন, অসংলগ্ন কথাবার্তা বলা শুরু করলো। নিজের শরীরে যত্ন নেয়া কমে গেলো। বাচ্চার দিকেও খেয়াল নাই। রাতে ঘুম হয়না। মেজাজও খিটখিটে হয়ে গেলো। নিজের মা কিছু বললেই রেগে যায়। ঘরে থাকতে চায় না। ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বের হয়ে কোথায় যাবে সে ব্যাপারেও কোন খেয়াল নাই।

এই রোগী ভর্তি হল আমাদের বিএসএমএমইউয়ের সাইকিয়াট্রি ডিপার্টমেন্টে। চিকিৎসকরা যত্নের সাথে রোগীর হিস্ট্রি নিলেন। রোগ ডায়াগনোসিস করে যথাযথ ওষুধ দেয়া হল। কয়েকদিন পরে রোগীর অবস্থা উন্নতি হতে শুরু করলো। রোগীর বেডের পাশে যখন ফলোআপ দিতে যেতাম বাচ্চার দিকে তাকাতাম। সে আপনমনে হাত পা নাড়িয়ে খেলাধুলা করছে। কি খেলছে আমি জানি না। বাচ্চারা কি আসলেই খেলে? আমি এখনো ঠিক জানিনা

বাচ্চাটাকে দেখে মায়া হতো, খারাপ লাগতো মায়ের জন্য। নতুন জন্ম নেয়া বাচ্চার মুখের দিকে তাকালেই যে মায়ের সব কষ্ট নিমেষেই আনন্দে পরিনত হওয়ার কথা, সেই মায়ের বাচ্চার প্রতি যেন কোন অনুভূতিই নাই। অশান্ত তার মন। অস্থির তার জীবন।

গত বৃহষ্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে সকালের ডিউটি শেষ করে যখন রুমে ফেরার জন্য ব্যাগ নিয়ে বের হচ্ছি, হটাৎ করেই সেই রোগী সামনে এসে দাড়ালো। তার মুখে হাসি। হাসতে হাসতে বললো, স্যার ছুটি দেন বাড়ি যাবো।

আমি হেসে বললাম, এখন তো ছুটি হবেনা। শনিবার আপনাকে আবার স্যাররা সবাই দেখে সিদ্ধান্ত নিবেন। আমার মনে হয় আরকিছু দিন থেকে গেলেই আপনার জন্য ভালো হবে।

আমার কথা শুনে তার মুখে আশাহত হওয়ার চিহ্ন। কি বলবে যেন ভেবে পাচ্ছেনা। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়েই আছি। অবশেষে সে বললো, ছুটি দেন না স্যার, আমার বাবুর হাসপাতালে ভালো লাগছেনা। বাবু এখানে থাকতে চায় না। বাবুকে নিয়ে আমি বাড়ি যাবো।

একথা বলার সময় তার চোখ আশায় চকচক করে উঠলো। চোখের ভাষা যেন বলতে চাইছে, বাবুর কথা বলায় এবার নিশ্চয় ছুটি মিলবে।

যে মা এই সেদিনও বাচ্চার কোন খেয়ালই রাখছিলো না, আজকেই সে তার বাচ্চার কথা ভাবছে! বাচ্চার হাসপাতাল ভালো না লাগার কথা বলে ছুটি চাইছে! তার এই উন্নতি দেখে আমার মন ভালোলাগায় ভরে গেলো। আমি তাকে নিজের মত করে বুঝিয়ে বললাম, খুব দ্রতই স্যাররা আপনাকে ছুটি দিয়ে দিবেন।

আজকে সকালে আবার তার সাথে দেখা। সে কিছুটা অনুযোগের সুরেই বললো, স্যার আপনি কিন্তু বাবুকে বাড়িতে যাইতে দিলেন না। আমি শুনে হাসলাম। এক অন্যরকম ভালোলাগা দিয়েই চিকিৎসক দিবসটা শুরু হলো।

যাই হোক, এই ধরনের নানা সুখকর অনুভূতির দেখা আমরা চিকিৎসকরা প্রতিনিয়তই পাই। এটাকে আমরা সৌভাগ্য হিসাবে দেখি। আমরা জানি খুব কম মানুষই একটা অসুস্থ মানুষ সুস্থ হয়ে যাওয়ার আনন্দকে এত কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগ পান।

আমরা যারা চিকিৎসক তাদের জগৎ খুবই সীমিত। হাসপাতাল - লাইব্রেরী - চেম্বার, এই মূলত জীবনচক্র। এই সীমিত গন্ডিতে আমরা বেচে থাকি মূলত এই ভালোলাগার অনুভূতিকে সম্বল করেই। তবে সবই যে ভালোলাগার অনুভূতি তাও না। আতংকেও থাকা লাগে। এই বুঝি রোগীর স্বজন চড়াও হলো ভুল চিকিৎসা আর অবহেলার অভিযোগে!

চিকিৎসক হওয়ার শুরুর দিনগুলোতে অনেকের মত আমারও অনেক সপ্ন ছিলো। একটা নির্ঝঞ্ঝাট জীবনের প্রত্যাশা মেডিকেলে পড়ার ব্যাপারে বাড়তি আগ্রহ তৈরী করেছিল। এখন দেখি, এখানেও জীবন নানা ঝঞ্ঝাটে পূর্ণ।

চিকিৎসক রোগীর সম্পর্ক বর্তমানে খুবই খারাপ যায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে। রোগীরা চিকিৎসকদের কিছু কর্মকান্ডের কারনে তাদের প্রতি আস্থা পাচ্ছেন না, সাংবাদিকেরা অনেক সময় ভুলভাল লিখে রোগীদের আরো অনাস্থায় ফেলে দিচ্ছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ চিকিসকেরা অসাধু চিকিৎসকদের অপরাধের বোঝা ঘাড়ে টানতে টানতে বিতৃষ্ণ হয়ে উঠছেন। এমন এক পরিস্থিতিতে রোগী-চিকিৎসকের আত্নিক বন্ধন টিকিয়ে রাখাটা খুবই চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাড়িয়েছে।

নিজে চিকিৎসক হিসাবে বলতে পারি, ডাক্তার-রোগীর সম্পর্কের অবনতির দায় চিকিৎসকদেরও আছে। চিকিৎসক সমাজের একটা অংশ পেশার প্রতি সুবিচার করতে পারছেন না। তারা রোগীদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করেন। অপ্রয়োজনীয় ওষুধ আর অপারেশনে তারা রোগীর জীবন দুর্বিষহ করে তুলেন। কমিশন আর টেস্ট বানিজ্যে তাদের রক্ত বিষাক্ত হয়ে উঠেছে।

আপনারা জনগন তাদের যেমন ঘৃনা করেন, আমরাও তেমনি ঘৃণা করি। ঘৃনা করি এ জন্য যে, সুযোগ থাকার পরেও তারা অসৎ পথটাই বেছে নিয়েছে। তাদের প্রতি করুনাও হয় এটা ভেবে যে, ভালোবাসা-সুখ-শান্তিকে তারা অবৈধ টাকা দিয়ে কিনতে চাইছে। কত্ত বোকা তারা!

তবে একটা আপাদমস্তক দুর্নীতিতে ডুবে যাওয়া সমাজে তাদের দেখে আমি হতাশায় ডুবতে চাই না। সামাজিক অবক্ষয় ও দুর্নীতির দ্বার রুদ্ধ করতে পারলে তাদের অবস্থারও উন্নতি ঘটবে বলেই আমার বিশ্বাস। আর এই উন্নতির দায়িত্ব কিন্তু আমাদের সকলের।

আমি দেখেছি, অনেক চিকিৎসক সকালে বের হয় ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে, কাজও করে উৎসাহ উদ্দিপনা নিয়ে, কিন্তু দিনশেষে তারা সবাই ঘরে ফিরে কসাই তকমা নিয়ে। এ তকমা তার নিজের অর্জন নয়, অন্যের অর্জন করা তকমা একই পেশার হওয়ার কারনে তাকেও পরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এই তকমা গায়ে লাগিয়ে পরের দিন সে যখন কাজে যাচ্ছে তখন পূর্বের দিনের চেয়ে উৎসাহ কম পাচ্ছে। এভাবে এক সময় হয়তো সে সব উৎসাহ উদ্দিপনা ও ভালো উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলবে। এই ভয়টাই আমি পাই। একদিন কি আমিও অনুভূতিহীন এক খিটখিটে কর্কশ রোবট হয়ে যাবো ! আল্লাহ তুমি হেফাজত কোরো।

ভালোভাবে চিকিৎসা পাওয়ার পরেও দেখা যায় কেউ কেউ চরম অকৃতজ্ঞ। এই অকৃতজ্ঞদের ব্যাপারে আর মন খারাপ হয়না। আমি দেখেছি এই অকৃতজ্ঞরা তাদের সৃষ্টিকর্তার প্রতিই কৃতজ্ঞ নয়, আর আমরা তো নগন্য চিকিৎসক। এই অকৃতজ্ঞদের উপর রাগ করে কৃতজ্ঞদের বঞ্চিত করতে চাওয়া ঠিক না।

তবে আমার মনেও একসময় অনেক অভিযোগ এসে ভীড় জমাতো, মন খারাপ হতো। এখন আর ততটা হয়না। মন খারাপে যে সময় নষ্ট হতো, সে সময় এখন রোগীকে আরো ভালো চিকিৎসা দিতে জ্ঞান অর্জনে ব্যয় করার চেষ্টা করি।

আমি জানি, এরপরেও যদি আমার তত্ত্বাবধানে থাকা কোন রোগীর খারাপ কিছু হয়, তারা হয়তো আমাকে দুনিয়ার সবচেয়ে খারাপ মানুষ মনে করবে। তারা হয়তো ভাববে এই মানুষটা ক্লিনিক আর ওষুধ কোম্পানির টাকা খেয়ে ভুল চিকিৎসা দিয়েছে। কোন চিকিৎসকের হাতে জন্ম নেয়া কোন সাংবাদিক, যার শরীরে প্রথম স্পর্শই হয়তো ছিলো কোন গাইনী চিকিৎসকের, সেও হয়তো মনের মাধুরী মিশিয়ে কল্পিত কাহিনী লিখবে। আমাকে ভিলেন বানিয়ে এক পৈশাচিক আনন্দে লিপ্ত হবে।

এত বাজে সম্ভাবনা থাকার পরেও আমি আমার রোগীদের ভালোবেসে যাবো। ভালোবাসার বিনিময়ে আমি কারোকাছে কোন প্রতিদান চাইবো না। আমি শুধু চাইবো, আমার সৃষ্টিকর্তা যেন এই ভালোবাসার মিনিময়ে আমাকে ভালোবাসেন। এর চেয়ে বড় প্রতিদান আর কি হতে পারে?

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত