ঢাকা      বুধবার ১৮, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৩, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



আবদুল্লাহ আল হারুন

শিক্ষার্থী, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ


গন্তব্য সীমান্তপুর

আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি সময়। আমি ছিলাম এক দুরন্তপনা, গ্রাম কাঁপানো ছেলে। সারাদিন দৌড়াদৌড়ি, ডিগবাজি, গাছের পেয়ারা চুরি, ডাব চুরি এসবের মধ্যে নিমিত্ত ছিলাম। একদিন গ্রামে সাপুড়েদের আবির্ভাব। আমি সারাদিন তাদের পিছে পিছে ঘুরতে লাগলাম। কেন যেন আমার সাপধরা ব্যাপারটা অনেক আকর্ষণীয় মনে হচ্ছিল। দিনের শেষে সন্ধ্যা অবধি আমি সাপুড়েদের সাথে ছিলাম।

সন্ধ্যার পরে যখন বাড়িতে ফিরলাম দেখলাম আমার বুবু শিউলি এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছে। আমি ভাগিনা দেখে মহা খুশী। জীবনের প্রথম মামা হলাম। অল্প কিছুক্ষণ পরেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। মা এসে বলল তোর বুবু অসুস্থ, এখনো সুস্থ হয়নি। দেখতো তোর বাবা, দুলাভাই এরা আসতেছে কিনা।

বাবা আর দুলাভাই দুইদিন হল নদীতে মাছ ধরতে গেছে। আমাদের গ্রামের নাম সীমান্তপুর। চারদিকে নদী বেষ্টিত, সীমান্তের কাছাকাছি একটি গ্রাম। যাতায়াতে নৌকার কোন বিকল্প নাই। আর নদীই এখানকার বেশিরভাগ মানুষের জীবিকার উৎস। বাবা এবং ভগ্নিপতি দুইজনই নৌকার মাঝি। আমি এক দৌড়ে নদীর ঘাটে গেলাম, কিন্তু তাদের কাউকে দেখতে পেলাম না। পরক্ষণেই আবার বাড়িতে ফিরে এলাম। মাকে জিজ্ঞেস করলাম বুবুর কি হয়েছে? মা প্রথমে বলতে চাইল না, পরে কি যেন ভেবে বলল "তোর বুবুর রক্তক্ষরণ বন্ধ হচ্ছে না, কি যে করবো বুঝতেছিনা, আবার দেখে আসতো তোর বাবারা আসতেছে কিনা?"

আমি এর মানে বুঝতে পারলাম না। এতটুকু বুঝলাম বুবু অসুস্থ। আমি মাকে বললাম, "মা আমি বুবুকে সদরে নিয়ে যাই?" মা প্রথমে রাজি হল না। অনেক্ষন পর যখন দেখল বাবা দুলাভাই কেউ আসতেছে না, তখন রাজি হল। আমি বুবুকে নিয়ে নৌকায় করে রওনা দিলাম সদরের উদ্দেশ্যে। হঠাৎ বুবুর চেহারার দিকে লক্ষ্য করে দেখলাম, বুবুর চেহারা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সাদা সাদা মনে হচ্ছে বুবুকে।

বুবুকে এত সুন্দর লাগতেছে দেখে অবাক হলাম। জিজ্ঞেস করলাম বুবু তোমার কি বেশি খারাপ লাগতেছে? বুবু কথা বলতে পারলনা। শুধু মাথা নেড়ে না বলল। এই না বলা যে কতো কষ্টের সেটা বুঝার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা আমাকে দিয়েছে। আমি, বুবু আর আমার নৌকা ঠিক যখন নদীর মাঝপথে পৌছালাম হঠাৎ দেখলাম বুবু চোখ বন্ধ করে ফেললো। আমি বৈঠা ছেড়ে বুবুর কাছে দৌড়ে গেলাম। দেখলাম বুবুর শরীর নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।

বুবু আর বেঁচে নেই ভাবতেই আমার মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়ল। বাড়িতে এসে বুবুর দাফন-কাফন শেষ করলাম। ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিজে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। যাওয়ার আগে ভাগিনার নাম রাখলাম, জাফর সাদেক। কেন এই নাম রাখলাম জানিনা। সেই যে শহরের উদ্দেশে রওনা দিলাম তারপর থেকে যোধপুর স্কুল, যোধপুর কলেজ এবং সর্বশেষ যোধপুর মেডিকেল কলেজ।

যেদিন এমবিবিএস পাশের সার্টিফিকেট পাই সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। সার্টিফিকেটটা নিয়ে সোজা সীমান্তপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। অনেক বছর পর। সেই চেনা জায়গা কেমন যেন অচেনা লাগতেছে। পথঘাট গুলো কেমন যেন অপরিচিত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

অল্প কিছুদিনের মধ্যে গ্রামের সবার প্রিয় পাত্র হয়ে উঠলাম। গ্রামের প্রথম ডাক্তার। শতাধিক ঘরের এই সীমান্তপুরের সবার কাছে আমার নাম পৌঁছে গেল। যার যা সমস্যা, যতটুকু সমস্যা সব নিয়ে আমার ঘরে হাজির হয়। আমি সাধ্যমতো সবার রোগ সারানোর চেষ্টা করি। মানুষের যে সম্মান আমি পেয়েছি, তা অতুলনীয়। অবর্ণনীয়। একবার এক লোক খাবারের বাটি নিয়ে আমার ঘরে হাজির, আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম এগুলো কি?

খাবার কেন? লোকটা মাথা নিচু করে মৃদু হেসে বলল, স্যার আমার অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল আমার বড় মোরগটা জবাই করে কোন ভালো মানুষকে খাওয়াবো। স্যার আমার মনে হলো আপনি ফেরেস্তাতুল্য মানুষ। তাই আপনার কাছে মুরগির মাংস গুলো রান্না করে নিয়ে আসলাম। এ কথা শোনার পর আমি কেমন যেন আবেগী হয়ে গেলাম। মনে মনে বললাম সহজ সরল এই মানুষগুলোর এই অকৃত্রিম ভালোবাসা আদৌ কি টাকা দিয়ে মূল্যায়ন করা যায়!

বছর খানেক পরের কথা রমজান আলী ও আবুল বেপারীর মধ্যে ঝামেলা চলতেছিল কিছুদিন ধরে। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে রমজান আলী আবুল বেপারীর পায়ে লাঠি দিয়ে আঘাত করল। আবুল বেপারী "আল্লারে!"বলে মাটিতে শুয়ে পড়ল। গ্রামের মাতব্বররা সালিশ বসালো। সালিশে সিদ্ধান্ত হলো যদি আবুল বেপারীর পা ভাঙ্গে তাহলে রমজান আলীকে এর চরম মূল্য দিতে হবে। সবাই আমার কাছে পা ভাঙছে কিনা তার নিশ্চয়তার জন্য আসলো। আমি সদর থেকে পায়ের এক্সরে করে আনতে বললাম। এক্সরে দেখে বললাম পা ভাঙ্গেনি। একথা শুনে আবুল বেপারী চেহারাটা একটা আলোকিত রুমে হঠাৎ করে আলো নিভিয়ে দিলে যেমন অন্ধকার হয়ে যায় তেমনি অন্ধকার হয়ে গেল। এই কথা শুনে সবাই যার যার ঘরে চলে গেল।

আবুল বেপারী কোন সুবিধা আদায় করতে পারলো না। যাওয়ার সময় আবুল ব্যাপারী আমাকে বলল "ডাক্তার সাহেব, আপনি কাজটি ঠিক করেননি"। আমি অবাক হলাম! আমি সরাসরি বললাম এখানে তো আমার কিছু করার নেই। রিপোর্টে যা আছে আমি তাই বললাম মাত্র।

যতই দিন যাচ্ছে ততোই সীমান্তপুরের প্রতিটা মানুষ আমার কাছে আপন থেকে আরো বেশি আপন হতে লাগলো। নিঃসন্তান আমি এবং আমার স্ত্রীর কাছে গ্রামের সকল ছেলে মেয়ে যেন নিজ সন্তানের মত মনে হতে লাগলো।

অনেক বছর পরে আজ আমার স্ত্রী মাধবীকে নিয়ে নৌকা ভ্রমনে বের হলাম। নতুন নৌকা পুরানো সেই নদী, নতুন আমি আমার ভিতর পুরানো অনুভূতি। দুজনে নৌকায় করে নদীর মাঝখানে চলে গেলাম। আমি হঠাৎ করে মাধবীর দিকে তাকিয়ে বললাম "আচ্ছা মাধবী, যদি এখন নৌকায় একটা ছিদ্র করে দিই, তাহলে আমি সাঁতরে কূল ধরতে পারবো কিন্তু তুমি তো শহরের মেয়ে তুমি তো পারবা না"।

মাধবী দূরের বসা থেকে উঠে আমার গা ঘেঁষে বসলো। আমার দিকে তাকিয়ে বললো "শুধু তুমি কুল ধরতে পারলেই হবে, আমার যা হবার হোক"। আমি আর কথা বাড়ালাম না। যে মানুষটা আমাকে এত বেশি বিশ্বাস করে, এত বেশি ভালবাসে তার সাথে আর বেশি রসিকতা করা যায় না।

সেদিনের মত নৌকা ভ্রমণ শেষ হলো। ক্লান্ত শরীর নিয়ে দুজনেই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরলাম। রাত তখন ১২ টার মত। গ্রামের জন্য অনেক রাত। হঠাৎ দরজায় কে যেন কড়া নাড়াল। দরজার বাহির থেকে চিৎকার করে বলতে লাগলো, ডাক্তার সাহেব রোগীর অবস্থা খারাপ। দরজা খোলেন। আমি দরজা খোলার জন্য যে মাত্র উঠতে গেলাম, মাধবী পিছন থেকে টেনে ধরে বলল "এত রাতে কে না কে আসলো, ওদের সকালে আসতে বল"।

আমি বললাম, তা কি করে হয়! সকাল পর্যন্ত যদি রোগী না বাচেঁ! এই দায় কে নিবে? আমি তো এই জন্য সীমান্তপুরে আসেনি। মাধবী আমাকে ছেড়ে দিল। আমি গিয়ে যখনই দরজা খুললাম। সাথে সাথে লম্বা-চওড়া একজন লোক লাঠি দিয়ে আমার মাথায় হাতের সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করলো। আমি ও... মাধবী বলেছি চিৎকার দিয়ে পড়ে গেলাম।

মাধবী চিৎকার দিয়ে দৌড়ে এলো। মাধবীর চিৎকার-চেঁচামেচিতে আশে-পাশের বাড়ির লোকজন এসে জড়ো হলো। দু-তিন জন আমাকে শক্তকরে ধরে বলল "ডাক্তার সাহেব আপনাকে সদর নিয়ে যাবো, আমরা আপনার কোন সমস্যা হতে দিবোনা"। আমি কিছুই বলতে পারব না।মাথাটা ক্রমান্বয়ে ভারী হতে লাগলো। নৌকায় আমি মাধবীর কোলে মাথা রেখে আকাশের দিকে চেয়ে থাকলাম। আকাশের বিশালতা দেখে আমি আমার সব ব্যথা ভুলে গেলাম। মনে হলো কিছুই হয়নি আমার। আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। সমস্ত শক্তি দিয়ে বৈঠা বেয়ে চলছে জাফর সাদিক। আমার ভাগিনা জাফর সাদিক। আমার বুবুর ছেলে জাফর সাদিক। তবুও এই যাত্রা শেষ হবার নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

প্রশ্ন: স্যার আমি মেডিকেলের ৩য় বর্ষের ছাত্রী। মেডিকেলে ইতিমধ্যেই ১ বছর লস…

ডাক্তাররা রোগের চিকিৎসা করে, মৃত্যুর নয়

ডাক্তাররা রোগের চিকিৎসা করে, মৃত্যুর নয়

: ব্যাটসম্যানদের ভুলে আজ খেলাটা চলে গেল! : ভুল বলছেন কেন? বল…

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সিএমসি, ভেলোরে আমি যে রুমে বসে রোগী দেখছি সেখানে ইন্ডিয়ার অন্যান্য রাজ্যের…

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

রাস্তায় একজনের মুখে সরাসরি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিলো আনিস। আচমকা এ আচরণে…













জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর