ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১৫ মিনিট আগে
ডা. শামীমা জাহান

ডা. শামীমা জাহান

সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সার্জারী বিভাগ।
ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ,  ৫৩/১, জনসন রোড, ঢাকা।


২৭ মার্চ, ২০১৯ ১১:৫৬

ডা. জোহরা বেগম কাজী: কীর্তিময়ী-মানবদরদী এক চিকিৎসক

ডা. জোহরা বেগম কাজী: কীর্তিময়ী-মানবদরদী এক চিকিৎসক

ছেলেবেলায় আম্মার কাছে শুনেছি আমার জন্ম ঢাকা মেডিকেল কলেজে, ডা. জোহরা কাজীর হাতে। তখন তিনি সদ্য লন্ডন থেকে ফিরে স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিভাগের প্রধান। বড় হতে হতে উনাকে একবার দেখার ইচ্ছা আমার ক্রমাগত বেড়ে চলে। ১৯৭৯ সালে সুযোগটি পাওয়া গেলো। ছোট ফুপু অন্ত্বঃসত্তা। আমি তাঁর সাথে আটকে গেলাম, উনাকে একবার চোঁখের দেখা দেখবার আশায়।

তিনি বাসায় রোগী দেখতেন। আমাকে ভেতরে যেতে দেয়া হয়নি। আমি দু' এক পলক পর্দার ফাঁকে উনাকে দেখে নিলাম। আমার দ্বিতীয় জন্মদায়িনী (প্রথমজন আমার আম্মা)। আমার জন্মটি জটিল ছিলো। তিনি আমার আম্মাকে প্রসবকালীন সব জটিলতা সমাধান করে নিরাপদে স্বাভাবিক সন্তান প্রসব করিয়েছিলেন।

আম্মার প্রতি আমার তীব্র ভালোবাসা, তাঁর প্রতি আমাকে শ্রদ্ধাশীল করেছিলো। তাঁকে দেখে আমার কাঁপুনি এসেছিলো পরম শ্রদ্ধায়।

আমি এক ফাঁকে বাড়ীটি ঘুরে এলাম। বিশাল বাড়ীটি খানিকটা এজিবি কলোনির মতো। অজস্র মানুষের বসবাস। একজন কর্মচারীর কাছে জানলাম, এই বাড়ীতে তিনি ও তাঁর বড় ভাই (অকৃতদার) থাকেন। আমি তাঁকেও দেখে এলাম। অতিবৃদ্ধ একজন মানুষ। বিছানায় শুয়েছিলেন।

আমি অবাক হয়ে কর্মচারীটিকে প্রশ্ন করলাম, এই যে বাড়ী জুড়ে এতো মানুষ, উনারা কারা? উত্তর এলো, উনারা ম্যাডামের দরিদ্র আত্মীয়। এলাকার প্রতিবেশী ও পরিচিত বিভিন্ন পর্যায়ের। ম্যাডাম সবাইকে নিয়ে থাকেন, কেউ ভাড়াটিয়া নন। শিশু থেকে অতিবৃদ্ধ মানুষ সবই ছিল। আমি অত্যন্ত অবাক হলাম। রীতিমতো একটি অতি জনবহুল বিশাল বাড়ী।

১৯৮৯ সাল, আমি মগবাজারের একটি ক্লিনিকে কাজ করি। শুক্রবার। হঠাৎই খবর পেলাম, তিনি আসছেন তাঁর সহকারী ও রোগী নিয়ে, জরায়ু অপারেশন করবেন। আমি দ্রুত প্রস্তুতি নিলাম, উনাকে অপারেশন থিয়েটারে সাহায্য করবার জন্য। অপারেশন হয়ে গেলো, তিনি একটি সেভেন- আপ খেয়ে সহকারী নিয়ে চলে গেলেন। আমি কৃশকায় শ্যামলা দীর্ঘাঙ্গী উনাকে প্রানভরে দেখলাম। আমার জীবন ধন্য হয়ে গেলো।

এক নজরে জোহরা বেগম কাজী:

উনার পুরো নাম জোহরা বেগম কাজী। মাদারীপুরের গোপালপুর গ্রামের বিখ্যাত কাজী পরিবার। উনার পিতা একজন চিকিৎসক ও সুপরিচিত রাজনীতিবিদ ছিলেন। ভারতের মধ্যপ্রদেশে তাঁর জন্ম ১৯১২ সালে। মাতা পটুয়াখালীর বাউফলের। তিনি শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের খালাতো বোন।

স্কুল জীবনে সব পরীক্ষায় প্রথম হতেন। ১৯২৯ সালে আলীগড় মুসলিম মহিলা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। তিনিই ছিলেন একমাত্র মুসলিম ছাত্রী। ১৯৩১ সালে আইএ পাশ করেন। দু’টিতেই প্রথম বিভাগ অর্জন করেন। ১৯৩৫ সালে এমবিবিএস ডিগ্রী লাভ করেন ও প্রথম স্হান অধিকার করেন। বিরল মেধার জন্য বৃটিশ - ভারত ভাইস- রয় পুরষ্কার পান। একই সময় তিনি কুরআনে হাফেজও ছিলেন।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের আগে তেরো বছর ভারতে বিভিন্ন হাসপাতালে কাজ করেন। ১৯৪৮ সালে দেশে ফিরে আবাসিক চিকিৎসক হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজে যোগ দেন। সেই সময় আলাদা স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগ ছিলো না। তিনি তা প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত। পরে মিটফোর্ড হাসপাতালে ও আলাদা স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মায়েদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করেন।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

১৯৫৫ সালে বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ড যান। বিশেষ বারতি প্রশিক্ষণসহ DRCOG, FRCOG, MRCOG ডিগ্রী লাভ করে দেশে ফিরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কাজ শুরু করেন।(তিনি ছিলেন দ্বিতীয় মুসলিম মহিলা, যিনি এই ডিগ্রী গুলো অর্জন করেন। প্রথম মহিলা ছিলেন তাঁরই ছোটবোন শিরিন কাজী)।

অবসরে যাবার পর হলিফ্যামিলি রেড ক্রস হাসপাতাল, CMH এ অনারারী কর্ণেল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে অনারারী অধ্যাপক ছিলেন। ৩২ বছর বয়সে নরসিংদীর রায়পুর হাতিরদিয়ার জমিদারপুত্র রাজুদ্দিন ভূইয়া (এমপি) সাথে পরিনয় হয়। ১৯৬৩ সালে বিধবা হন। নিঃসন্তান ছিলেন। নিজের ছাত্র -ছাত্রী, দরিদ্র ও এতিমখানার শিশুদের নিজ সন্তানের মতো গড়ে তোলেন।

১৯৬৪ সালে তঘমা- ই- পাকিস্তান, ২০০৪ সালে বেগম রোকেয়া পদক পান। ২০০৮ সালে মরোনোত্তর একুশে পদক ও বিএমএ স্বর্ণপদক পান। ২০০৭ সালের ৭ই নভেম্বর, তিনি মৃত্যুবরন করেন ও তাঁকে বনানী গোরস্থানে দাফন করা হয়।

গৌরবময়- কীর্তিময়ী- মানবদরদী এই চিকিৎসক, এই পেশার একজন মহান আলোকবর্তিকা। আমি আজীবন আমার আম্মার সুচিকিৎসার জন্য কৃতজ্ঞ ছিলাম। এখন তাঁর বেহেশত নসীবের আল্লাহ'র দরবারে হাত তুলি। জাজাকাল্লাহ খাইরান।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত