ডা. নাজমুল ইসলাম

ডা. নাজমুল ইসলাম

অনারারি মেডিকেল অফিসার

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ, বগুড়া।


২৬ মার্চ, ২০১৯ ০৯:১৩ পিএম

গরিবের স্বাস্থ্যকেন্দ্র

গরিবের স্বাস্থ্যকেন্দ্র

উচ্চ রক্তচাপ ব্যাধিটি একটি নিরব ঘাতক। সংক্রামক রোগগুলোকে মানুষ চিহ্নিত করতে পারে এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়ার কারণে রোগ নিয়ন্ত্রণে সফল হয়। কিন্তু রক্তচাপের বিষয়টি একেবারেই আলাদা। কারণ হাসপাতালে অনেক রোগী স্ট্রোক করে ভর্তি হওয়ার পর জানা যায়, লোকটি এ রোগে আক্রান্ত। ফলে এর আগ পর্যন্ত উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার স্বজনেরা রোগ সম্পর্কে অন্ধকারে থেকে যান। আর এ কারণে তাদের অজ্ঞাতসারে রোগীর জীবনে ঘটে যায় বড় ধরনের বিপর্যয়।

বলার অপেক্ষা রাখে না, পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগে রোগ সম্পর্কে রোগী ও চারপাশের মানুষের পূবানুমান না থাকাটা এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য আরেকটি ভীতিকর দিক।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার চারভাগের একভাগই উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। গ্রামের তুলনায় শহরের লোকদের মধ্যে এর হার বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে এবং এই অবস্থা উদ্বেগজনক।

তবে দ্রুতগতিতে বাড়লেও বাংলাদেশের মানুষ উচ্চ রক্তচাপের বিষয়ে একেবারেই অসচেতন।সেই সাথে রয়েছে অর্থের ব্যাপারও।

উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষকে নিয়মিত ফলোআপে থাকতে হয়,যা ব্যক্তির কাছে ঝামেলাপূর্ণ মনে হয়।

উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক, কিডনি এবং চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।এই নিরব ঘাতক রোগে সারাবিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ লোক মারা যাচ্ছে।

উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তের রোগীরা স্ট্রোক করেন এবং এজন্য দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়।এর চিকিৎসাও ব্যয়বহুল।এর ফলে বাংলাদেশকে হারাতে হচ্ছে কর্মক্ষম জনশক্তি, যা বাংলাদেশের উন্নয়নে চরম প্রতিবন্ধক।তাই বাংলাদেশের মানুষকে সচেতন করতে উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ এবং প্রতিকারে সরকারি উদ্যোগের সহায়ক হিসেবে রংপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার।’

প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেন ২০০৮ সালের ১৪ নভেম্বর আর্ত-মানবতার সেবার লক্ষ্যে  ‘উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন-যাপন করূন’--স্লোগানকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেন।

সামাজিক সেবামূলক এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পেছনের উদ্দেশ্য ছিল উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে জনসাধারণের মাঝে সচেতনা সৃষ্টি ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের নামমাত্র মূল্যে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করে উচ্চ রক্তচাপ এবং এর জটিলতাগুলো প্রতিরোধ করা।   

আর্ত-পীড়িত মানুষের জন্য কিছু করার জন্য বাল্যকাল থেকেই মনের কোনে চিন্তা লালন করতেন অধ্যাপক ডা. জাকির। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করার পর ইন্টার্ন সমাপ্ত করে প্রয়াত অধ্যাপক এস.জি.এম. চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে ঢাকায় এস.জি.এম. চৌধুরী মেমোরিয়াল হাইপারটেনশন সেন্টারে অবৈতনিকভাবে কাজ করেন।

নিজের দক্ষতাকে শাণিত করতে পরবর্তীতে ১৯৯০-২০০০ সাল পর্যন্ত নরসিংদীর পলাশ উপজেলার সান্তানপাড়ায় ‘অধ্যাপক ডা. মুনীর উদ্দিন আহমেদ দাতব্য চিকিৎসালয়েও’ সম্পূর্ণ অবৈতনিকভাবে কাজ করেন তিনি।

এখানে দীর্ঘ এক দশক চিকিৎসা সেবা করতে গিয়ে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের অসহায়ত্ব দেখে মানব সেবার মহান ব্রত ডা. জাকিরের মনে আরও বদ্ধমূল হয়।

অন্যদিকে উচ্চ-রক্তচাপজনিত কারণে মায়ের স্ট্রোকে মৃত্য অধ্যাপক জাকিরকে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে কাজ করার তাগিদকে তরান্বিত করে।

এভাবে মানবসেবার মহান ব্রত নিয়ে বাবা-মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেন ডা. ওয়াছিম-ওয়ালেদা বহুমুখী কল্যাণ ফাউন্ডেশন।

প্রথম উদ্যোগ ছিল নিজ গ্রাম বগুড়ার ধুনটে। স্বাস্থ্যসেবার নিমিত্তে ফাউন্ডেশনটি শুরু হলেও ধীরে ধীরে এর কাজের পরিধি বৃদ্ধি পেতে থাকে।দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৃত্তি প্রদান, বিভিন্ন দুর্যোগে এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে অর্থ প্রদান করে ফাউন্ডেশনটি।

ডা. ওয়াছিম-ওয়ালেদা ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে বেশ কিছু কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। নিম্নে এগুলো উল্লেখ করা হলো:

১. ‘হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’
এ ফাউন্ডেশেনের তত্ত্বাবধানে ২০০৮ সালের ১৪ নভেম্বর রংপুরে যাত্রা শুরু করে ‘হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’।শুধুমাত্র উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তরাই এখানে চিকিৎসা নিতে পারেন।

তবে নিবন্ধিত রোগীরা উচ্চ রক্তচাপ ছাড়াও অন্যান্য রোগের চিকিৎসা পেয়ে থাকেন। চিকিৎসার দায়িত্বে রয়েছেন অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেনসহ একটি বিশেষজ্ঞ টিম। অধ্যাপক ডা. জাকির প্রধান অনারারী ডাক্তার হিসেবে রয়েছেন এখানে। একজন বড় মাপের বিশেষজ্ঞ দেখাতে যেখানে এক হাজার টাকার ফি প্রয়োজন হয়। সেখানে হাইপারটেনশন এন্ড রিসার্চ সেন্টার বিনামূল্যে সেবা দিয়ে যাচ্ছে ভুক্তভোগীদের।

সেবা নেয়ার জন্য একজন রোগীকে নামমাত্র ৫০ টাকা দিয়ে নিবন্ধন করতে হয় শুরুতে।তবে মুক্তিযোদ্ধা রোগীর ক্ষেত্রে কোন ফি দিতে হয় না। নিবন্ধন করার পর রোগীকে একটা বই দেয়া হয়। পরবর্তীতে প্রতিবার চিকিৎসা পরামর্শ ফি নেয়া হয় ৪০ টাকা। প্রতিদিন ১০-১২ জন করে নতুন রোগী নিবন্ধিত হয় সেন্টারটিতে এবং ফলোআপ রোগীর সংখ্যা থাকে ৫০-৬০ জন। বর্তনামে এখানে নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা ২২ হাজার ৪৯৩ জন।

‘হাইপারটেনশন এন্ড রিসার্চ সেন্টার সূত্র’ জানিয়েছে, রোগী দেখার ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের ফর্মুলা অনুসরণ করা হয় এখানে। রোগীদের রোগের ধাপ অনুযায়ী ক্যাটাগরি করে চিকিৎসক দেখানো হয়। প্রয়োজনে গঠন করা হয় মেডিকেল বোর্ড। উচ্চ রক্তচাপ কি এবং কিভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় তা নিয়ে রোগীকে স্লাইড শো দেখানোর পাশাপাশি কাউন্সেলিং করা হয়।

আবার রোগী চিকিৎসা নেয়ার পর প্রেসার নিয়ন্ত্রণে থাকলে মাঝপথে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। কারণ উচ্চ রক্তচাপে কোন উপসর্গ  থাকে না। তখন এ সকল রোগী আর ফলোআপে আসেন না। এধরনের রোগীদের টেলিফোন এবং চিঠি দিয়ে যোগাযোগ করা হয় ওই সেন্টারের পক্ষ থেকে।

উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করার লক্ষ্যে নিয়মিত সভা, সেমিনার ও র্যা লির আয়োজন করা হয়।নিয়মিতভাবে ফ্রি ব্লাড প্রেসার চেকআপ ক্যাম্প আয়োজন করা হয়। জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সেন্টারটি এখন পর্যন্ত উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কিত ২৪৭টি সেমিনার, ফ্রি ব্লাড প্রেসার ক্যাম্প ৭৮টি এবং ৩৭টি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প সম্পন্ন  করেছে।

এছাড়া সচেতনতামূলক নিয়মিত পত্রিকা ‘হাইপারটেনশন বার্তা’ প্রকাশ করে সেন্টারটি। মানসম্মত ল্যাবের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধার ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে।

২. ডা. ওয়াছিম-ওয়ালেদা চিকিৎসা কেন্দ্র:
নিজ গ্রামের হত-দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার নিমিত্তে সেন্টারটি চালু হয়। প্রতি শুক্রবার একজন এমবিবিএস চিকিৎসক সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সেবা দিয়ে থাকেন এখানে।

৩. বৃত্তি প্রকল্প:
নিজ গ্রাম গোসাইবাড়ী,ধুনটে এ প্রকল্পের মাধ্যমে মেধাবী ও দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বৃত্তি প্রদান করা হয়। এখন পর্যন্ত ৫০ জনের বেশি ছাত্রছাত্রী ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়েছেন এই বৃত্তি প্রকল্পের কল্যাণে।

ডা. ওয়াছিম-ওয়ালেদা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন স্বপ্ন দেখেন একদিন সারা বাংলাদেশেই তার এই মহৎ উদ্যোগ ব্যাপ্তি লাভ করবে।

তিনি মনে করেন, হাইপারটেনশন সেন্টারটি একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে সরকারের স্বাস্থ্যসেবার সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। কারণ দেশের বিপুল-সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা সেবার দায়িত্ব সরকারের একার পক্ষে নেয়া কষ্টসাধ্য। এ কারণে বেসরকারী উদ্যোগও সমানভাবে জরুরি।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না