ঢাকা      মঙ্গলবার ১৬, জুলাই ২০১৯ - ১, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. তুহিন মুশফিক

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


একাত্তরের স্বাস্থ্যযোদ্ধা: যাদের অবদানে স্বাধীন বাংলাদেশ

বাঙালির সবচেয়ে গর্বের ইতিহাস ১৯৭১। টানা নয় মাসের অগ্নিঝরা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতা। এই রক্তাক্ত সংগ্রামে দেশের আপামর মানুষ যেমন ঝাঁপিয়ে পড়েন, তেমনইভাবে চিকিৎসকরা স্বাধীনতার যুদ্ধে নিজেদের বীরত্বগাঁথা ইতিহাস রচনা করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন চিকিৎসকরা। অনেক চিকিৎসক শহীদ হন, অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করেন।  তারা আমাদের একাত্তরের স্বাস্থ্যযোদ্ধা, চিকিৎসক সমাজের সবচেয়ে বড় অহংকার।

একদিকে বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থী সক্রিয়ভাবে অস্ত্রহাতে শত্রুপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। আবার অন্যদিকে শরণার্থী শিবির এবং দেশের অভ্যন্তরে আরেকদল চিকিৎসক সেবা শুশ্রূষায় সুস্থ করে তোলেন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের। অনেকেই সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

ডা. শিশির মজুমদার, ডা. সরওয়ার আলী, অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান, ডা. মাকসুদা নার্গিস, ডা. কাজি তামান্না, ডা. ফৌজিয়া মোসলেম ও ডা. সমীর কুমার শর্মা প্রমুখ (অনেকের নাম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি)। 

মেডিকেল কলেজের তৎকালীন ছাত্রদের মধ্যে বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে-শাহ আলম (পরবর্তীতে বীরউত্তম খেতাবপ্রাপ্ত), মোয়াজ্জেম হোসেন, সেলিম আহমেদ, আলী হাফিজ সেলিম, আবু ইউসুফ মিয়া, ইকবাল আহমেদ ফারুক, মুজিবুল হক, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, মোজাফ্ফর, আমজাদ হোসেন, ওয়ালী, ওসমান, গোলাম কবীর, জিল্লুর রহিম, ডালু, নুরুজ্জামান, শাহাদত প্রমুখ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

বাংলাদেশের প্রথম হাসপাতাল "বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল"। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মেঘালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। আহত মুক্তিযোদ্ধা আর শরণার্থীদের সেবায় নিবেদিত এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন ডা. মো. আব্দুল মবিন এবং ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সেক্টর-২ এর অধীনে সেখানকার কমান্ডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করতেন ডা. ক্যাপ্টেন সিতারা রহমান (পরবর্তীতে যিনি বীরপ্রতীক খেতাব পান)।

ডা. ফজলে রাব্বীসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অবদান:

মুক্তিযুদ্ধে চিকিৎসকদের কথা বললেই প্রথমে যে নামটি চলে আসে, তিনি হচ্ছেন ঢাকা মেডিকেলের কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. ফজলে রাব্বি। তিনিই ঢাকা মেডিকেলে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দিতে টিম গঠন করেন। তার সঙ্গে যুক্ত হন মিটফোর্ড হাসপাতালের চক্ষু বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আলিম চৌধুরী। মিটফোর্ডের ডাক্তার হলেও সেবার স্বার্থে বেশিরভাগ সময় তিনি ঢাকা মেডিকেলেই থাকতেন। 

যুদ্ধে আহত রোগীদের অপারেশন:

সংশ্লিষ্ট সব দায়িত্ব ছিল সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা: সামসুদ্দিন আহমেদের। তার সহযোগী হিসেবে সহকারী সার্জন ছিলেন ডা. আজহারুল হক ও ডা. এ বি এম হুমায়ুন কবির। এই দুজনে জরুরি বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। রোগী ভর্তি করার জন্যও অনেক প্রতিকূলতা পোহাতে হতো। অনেক সময় ডাক্তারদের হাসপাতালে প্রবেশ করতে হতো রোগী হিসেবে। ডা. আজহারুল হক কিছু রোগীর চিকিৎসা করতেন হাতিরপুলে তার নিজের বানানো ডিস্পেন্সারি “সাঈদা ফার্মেসী” তে। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ১ম বর্ষের ছাত্রী নিপা লাহিড়ী যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতে যাবার পথে ফতুল্লায় নিহত হন। আর একজন ছাত্র সিরাজুল ইসলাম হাসপাতালে বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতেন। তিনি রাতে হোস্টেলে না গিয়ে হাসপাতালের ক্যান্সার ওয়ার্ডে ঘুমাতেন। ১১ ডিসেম্বর রাতে রাজাকার বাহিনী ক্যান্সার ওয়ার্ড থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নির্মমভাবে হত্যা করে।

খুরশীদ, মেজর শামসুল আলম, ক্যাপ্টেন আব্দুল লতিফ মল্লিক, ক্যাপ্টেন মোশারেফ হোসেন, ক্যাপ্টেন আ. মান্নান, লে আখতার, লে নুরুল ইসলাম প্রমুখ অফিসারবৃন্দ বিভিন্ন সেক্টরে নিয়োজিত ছিলেন। তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ক্যাপ্টেন খুরশীদ বীরউত্তম ও লে. আখতার বীরপ্রতীক উপাধি পেয়েছিলেন। তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের যে সমস্ত সদস্য শহীদ হয়েছেন তাঁদের মধ্যে ডা. লে. ক. এএফ জিয়াউর রহমান, ডা. মেজর আসাদুল হক, ডা. লে. আমিনুল হক, ডা. লে. খন্দকার আবু জাফর মো. নূরুল ইমাম প্রমুখ ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় চিকিৎসক, মেডিকেল কলেজের ছাত্র, কলেজ ও হাসপাতালের নানা শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবদান রেখেছেন নানাভাবে। কেউ যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন অস্ত্র হাতে, কেউ আবার হাসপাতালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আবার অনেক চিকিৎসক মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সরবরাহে সাহায্য করেছেন, সহযোগিতা করেছেন তথ্য আদান-প্রদানে। চিকিৎসকদের গাড়িতে করে পার হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা, আনা হয়েছে অস্ত্র, ওষুধসহ নানাকিছু।

চিকিৎসাসেবা মানব ধর্ম-সেটা মুক্তিযুদ্ধের সময় পদে পদে চিকিৎসকরা শিখিয়েছেন, করে দেখিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তাদের ভূমিকা ছিল অনন্য এবং ব্যতিক্রমী। এই ভূমিকা পালন করতে গিয়ে চরম মূল্যও দিতে হয়েছে চিকিৎসকদের একটা বিরাট অংশকে। চক্ষু বিশেষজ্ঞ আলীম চৌধুরীকে ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাজাকার-আলবদর বাহিনী তার বাসা থেকে নিয়ে যায় এবং ওই দিন দিবাগত রাতে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নির্মমভাবে হত্যা করে। ডা. ফজলে রাব্বীকে ১৯৭১ সনের ১৫ ডিসেম্বর বিকেলে পাকবাহিনীর কয়েকজন সৈন্যসহ রাজাকার- আলবদরদের কয়েকটি দল তার সিদ্ধেশ্বরী বাসা থেকে নিয়ে যায় এবং ১৮ ডিসেম্বর দিনের বেলায় রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে পাওয়া যায় তার ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ।

শুধু ডা. ফজলে রাব্বী এবং ডা. আলীম চৌধুরীই নয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনী হত্যা করে অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দীন আহমেদ, অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবীর, ডা. আজহারুল হক, ডা. সোলায়মান খান, ডা. আয়েশা বদেরা চৌধুরী, ডা. কসির উদ্দন তালুকদার, ডা. মনসুর আলী, ডা. মোহাম্মদ মোর্তজা, ডা. মফিজউদ্দীন খান, ডা. জাহাঙ্গীর, ডা. নুরুল ইমাম, ডা. এস কে লালা, ডা. হেমচন্দ্র বসাক, ডা. ওবায়দুল হক, ডা. আসাদুল হক, ডা. মোসাব্বের আহমেদ, ডা. আজহারুল হক (সহকারী সার্জন), ডা. মোহাম্মদ শফীকেও।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এসব মহান চিকিৎসকদের নিয়ে একটি বই লিখেছেন দ্যা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভিলেন্স অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (নিপসম) পরিচালক ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ। ২০০৯ সালে প্রকাশিত এই বইতে তিনি প্রায় ১০০ জন চিকিৎসকের এবং ১৫ জন মেডিকেল শিক্ষার্থীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন।

একাত্তরের এইসব অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করা চিকিৎসক এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবাদানকারী স্বাস্থ্যযোদ্ধা চিকিৎসকদের আলোচনা আমরা খুব একটা শুনতে পাই না। অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো এখানেও চিকিৎসকদের আলোচনা পাদপ্রদীপের আলোর নিচে থাকে না। কিন্তু একাত্তরের অস্থির সময়ে যারা তাদের হাতে সেবা শুশ্রূষা এবং চিকিৎসা পেয়েছিলেন, কেবল তারাই জানেন, এসব স্বাস্থ্যযোদ্ধার গুরুত্ব কতখানি। স্বাধীনতার এই মাসে মেডিভয়েসের পক্ষ থেকে এসব বীরযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর