ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৪, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



রহমান এম শুভ্র


কনসালটেন্ট কার্ডিয়াক সার্জন, 
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মহাখালী।


ডাক্তার নয়, রোগী আর রোগের গল্প

৫২ বছর বয়সী মর্জিনা বেগমের সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বাংলাদেশে কার্ডিয়াক সার্জারির নতুন এক দিক উন্মোচন করলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসকরা। 

মর্জিনা বেগমের হার্টের ৪টির মধ্যে ৩টি ভাল্ভই অকেজো হয়ে গিয়েছিল। এ কারণেই সুস্থ হওয়ার প্রবল আত্মবিশ্বাসে তার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা। 

এসে বুঝতে পারলেন তিনি হার্টের অপারেশন না করালে আর বেশি দিন তার দুনিয়ার আলো-বাতাস গ্রহণ করা সম্ভব হবে না। আবার একটা নয় দুইটা নয় তিন তিনটি ভাল্ভই তার অপারেশন করতে হবে। 

সাধারণত এ রকম জটিল অপারেশনে রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকিও অনেক অনেক বেশি। কিন্তু বাঁচার তাগিদ সবারই থাকে। কথায় আছে, ‘যতক্ষণ আশ (আশা) ততক্ষণ শ্বাস’। 

সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে ভুগতেই তিনি চকিত সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললেন, এসপার না হয় ওসপার। অপারেশন তিনি করবেনই।

যথারীতি সকলের থেকে অশ্রুসিক্ত চোখে বিদায় নিয়ে চললেন অপারেশন থিয়েটারে। মনে আকাশসম শঙ্কা—এই পরিচিত মুখগুলো কি তিনি আবার দেখতে পারবেন?

অপারেশন থিয়েটারে প্রধান সার্জন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিয়াক সার্জারির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. রেজওয়ানুল হক (বুলবুল) দৃপ্ত হস্তে অপারেশন করলেন। দুটি ভালভ তিনি কৃত্রিম টিশ্যু ভাল্ভ দিয়ে প্রতিস্থাপন করলেন, অপর একটি ভাল্ভ তিনি রিপেয়ার করলেন। 

সফল অস্ত্রোপচার শেষে রোগী মর্জিনা বেগমকে নিয়ে আসা হলো নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করলেন কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা।

অপারেশনের দিন রাত ১২টা—সারাদেশ যখন ঘুমিয়ে, তখন ডাক পড়লো মর্জিনার স্বজনদের। উৎকণ্ঠা নিয়ে আইসিইউতে ঢুকে তারা দেখলেন, মর্জিনা বেগম বিছানায় বসে আছেন। নার্স তার দাঁত ব্রাশ করছেন।

মর্জিনার স্বজনকে দেখে নার্স বললেন, আপনার রোগী ভাল আছে। অল্প কথা বলবেন আর দ্রুত উনার জন্য চা, বিস্কুটের ব্যবস্থা করবেন।

মর্জিনা বেগম ভালো আছেন, তিনি বাড়ি ফিরার দিন গুণছেন। বাড়িতে আম গাছে মুকুল এসেছিল, ওইগুলা মনে হয় এখন একটু বড় হয়েছে। যত্ন না নিলে কালবৈশাখীর ঝড়ে সব ঝরে যাবে। 

মর্জিনারা ভালো হয়ে বাড়ি ফিরে যাবেন—ভুলে যাবেন তার চিকিৎসককে। আর এভাবেই আড়াল হয়ে যাবে চিকিৎসকদের ইতিবাচক কাজগুলো। কখনো বা অনাকাঙ্খিত ছোট কোনো ভুলের কারণে হাজারো বিদ্রুপাত্মক মন্তব্যে এই জাতির কাছে এভাবেই হারিয়ে যায় চিকিৎসকের সাফল্য। 

এ রকম অর্জনের মাধ্যমে দেশ চিকিৎসা সেবায় এগিয়ে গেলো—তাতো কেউ জানতে চাবেই না, মানবেও না। বরং এ পেশায় জড়িত নিরব সাধকদের নিয়ে সব সময় অনেকেই নেতিবাচক প্রচারণায় তৃপ্তি খুঁজবেন।  

আক্ষেপ করে বলতে হয়, ‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ের’ মতোই, ‘দেবী শেঠীরা ভারতেই সুন্দর, ভুল-চিকিৎসকেরা বাংলাদেশে’।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

হাসপাতালের সকলে মিলে সমাজকে অনেক কিছুই দিতে পারে। সাধারণত যে মানুষ যেভাবে…

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব…

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal…

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থান। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নানা রকম হরমোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর