ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৪, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


গল্পের মোড়কে বাস্তবতা অথবা বাস্তবতার মোড়কে গল্প

এক.
ব্রেকিং নিউজ! `নবজাতকের নাড়িভুড়ি বের করে ফেললেন ডাক্তার!’ হেড লাইন পড়ে মাথা চক্কর দিয়ে ওঠলো! ভয়ঙ্কর, বিভৎস ব্যপার! কী বলে এসব? দেশে কি আইন কানুন নেই? এমন কাজ কেউ করে? অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। হাসপাতাল ভাঙচুর তো মামুলি ব্যাপার, মামলা, ফাঁসি হওয়া উচিত। দেশটা কী মগের মুল্লুক? এই ডাক্তার এবার গেছে। আমরা জনগণ যদি এমন প্রতিক্রিয়া দেখাই, বাড়াবাড়ি বলা যায় কি?

দুই.
প্রতিবেদনের ভাষা এতই জোস হইসে যে, এইবার বুঝবা তুমি বাছাধন, আমি কতবড় সাংঘাতিক। ঘুঘু দেখেছো, ফাঁদ দেখোনি—রিপোর্টারকে তৃপ্ত দেখায়। অখ্যাত পত্রিকাটা এইবার যদি একটু জাতে ওঠে, সেই সাথে নিজের অবস্থানও। কেউ তো আসলে তেমন দাম দেয় না, কয় আমি নাকি মুদি দোকান করলেই পারি, সারাদিন হলুদ বেচবো। কত্ত বড় কথা। ডাক্তারদের নিউজ মানুষ খায় বেশি, আমিও তক্কে তক্কে ছিলাম এমন একটা নিউজের। রাখে আল্লাহ মারে কে! এইবার কে আমারে পুছবি না, দেখি তো। 

বেটার কাছে বিজ্ঞাপন চাইতে গেছিলাম, চেম্বারের। হাজার বিশেক টাকাই তো, দেয় নাই; কয় কি তার নাকি বিজ্ঞাপন লাগে না। এখন দেখ তোর কত্তো বড়ো খবর করে দিলাম। নে এবার বোঝ্। যদিও ঘটনাটার ব্যাপারে আমি একদমই অজ্ঞ, চাইলে গুগল করলে জানতে পারতাম; কী দরকার? 

অবশ্য প্রকৃত সাংবাদিক হলে তাই করতো, সঠিক ঘটনাই তুলে ধরতো। আমার এত সত্য-মিথ্যা হিসাব করলে চলে না, রোগীর লোক বলেছে, আমিও দেখেছি বাচ্চার নাড়িভুড়ি বাইরে, ব্যাস রিপোর্ট করে দিয়েছি। তর তর করে নিউজের টিআরপি বাড়ছে! আহা! আমি শুধু একটা শব্দ যোগ করেছি, 'পেট কেটে' যদিও আমি শিউর না ডাক্তারসাব বাচ্চাটার পেট কেটে ফেলেছিলেন কিনা। ধূরর, আমি আবার বিলা করছি কেনো? পেট যদি নাই কাটে, নাড়িভুড়ি বের হবে ক্যামনে?

তিন.
ডাক্তার আজমাইন বেশ জোরের সাথেই বলছেন, বাচ্চাটার যা হয়েছে—সেটা একটা জন্মগত ত্রুটি। প্রতি পাঁচ শ’ ডেলিভারিতে একটা হয়। এক্ষেত্রে বাচ্চার পেটের ওয়াল মানে পেটের চামড়া তৈরি হয় না। ফলে নাড়িভুড়িসহ অন্যান্য অঙ্গ যেমন লিভার, স্টমাক বাইরে বের হয়ে আসে। এটাকে বলে গ্যাস্ট্রোস্কাইসিস। 
আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে পেটের শক্ত মোটা চামড়ার পরিবর্তে শুধুমাত্র পলিথিনের মতো পাতলা একটা পর্দা দিয়ে নাড়িভুড়ি ঢাকা থাকে, একে বলে ওম্ফেলোসিল। এই পর্দা আবার সহজে নষ্ট মানে ছিঁড়ে, নাড়িভুড়ি বের হয়ে যেতে পারে বিশেষ করে ডেলিভারির সময়; যেটা এই বাচ্চার ক্ষেত্রে হয়েছে। 

রোগীর লোকজন আগে থেকে জানত না, মূলত তারা রোগীকে কখনো ডাক্তারের কাছে নিয়েও যায়নি চেক-আপের জন্য। বাসায় ডেলিভারি বিলম্ব হওয়াতে ক্লিনিকে নিয়ে আসে, তখন কিছু করার ছিল না। ইমার্জেন্সি সিজার করে দেখা গেলো বাচ্চার নাড়িভুড়ি তার পেটের বাইরে। রোগীর লোকজনকে বলা হলেও তারা ব্যপারটা ঠিকঠাক বুঝতে পারেনি। আর আমরাও পর্যাপ্ত কাউন্সলিং করতে পারিনি। তার আগেই আপনার আগমন। আশা করছি আপনি সঠিক তথ্য দিয়েই রিপোর্ট করবেন। 

ওহ যা বলছিলাম, ওম্ফেলোসিলের সঙ্গে আরো কিছু জন্মগত ত্রুটি থাকে। যেমন: ঠোঁট কাটা, তালু কাটা, মেরুদণ্ডে ত্রুটি, কিডনিতে ত্রুটি, ক্রোমোজমের ত্রুটি এবং আরো অনেক কিছু। ফলে এই বাচ্চারা সাধারণত বাঁচে না। জন্মের পরপর অপারেশন করাতে পারলে যদিও বা বাঁচে সেক্ষেত্রে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কি কারণে এমনটা হয় যদি জানতে চান তাহলে বলবো, অনেক ক্ষেত্রেই কারণ জানা যায় না। তবে ফলিক এসিড স্বল্পতা, এলকোহল, ডায়াবেটিস ও পরিবেশগত কারণ ইত্যাদি।

চার.
ডাক্তারের বিস্তারিত ব্যাখ্যা শোনার পরও নিউজটা পরিবর্তন করি নাই। জানি কাজটা ঠিক হয় নাই। কী করবো, একটা বাজারকাটতি নিউজের জন্য কত্ত অপেক্ষা করেছি, নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে কত কিনা করেছি, পত্রিকার কপাল থেকে অখ্যাত তকমাটি উপরে ফেলতে মনেমনে কত পরিকল্পনা করেছি, অবশেষে ভাগ্য প্রসন্ন হলো! 

এই যে বড় বড় পত্রিকা থেকে ফোনের পর ফোন আসছে। যে ফুটেজ আমি সংগ্রহ করেছি নানা সমীহ করে সেটা নিতে চাচ্ছে। কত প্রলোভন যে দিচ্ছে; এটা আমি মিস করতে চাই না। তবে খচখচ যে একটু লাগছে না তা নয়; প্রকৃত ঘটনা জানার পরও নিউজটা এভাবে ছাপানোর জন্য। প্রকৃত ঘটনাই আসলে লেখা উচিত। কিন্তু প্রকৃত নিউজ যে জনগণ খায় না; ওই যে পুরনো ফর্মুলা, হেলদি খাবার টেস্টলেস। খাবার মুখরোচক করতে হলে মশলা তো মেশতেই হবে। 

জানেন কিনা জানি না, নিউজ হলো সবচেয়ে চমকপ্রদ খাবার। নিত্য নতুন চমক না হলে যে আপনাদের মুখে রোচে না। ডাক্তার সাবের উপর একটা বড় অন্যায় করা হলো। বেচারা কোনো দোষ না করেও এখন ভিলেন। সবকিছু জানিয়ে আমাকে লিখিত একটা প্রতিবাদপত্র দিয়েছেন। কিন্তু সেটাও আমি ছাপবো না। কে আর ইচ্ছে করে নিজের অবস্থান নিচে নামায় বলেন? উপরে ওঠতে হলে একটু আধটু অন্যায়কে আমলে নিলে চলে না। 

তবে ডাক্তার যদি একটা মামলা করে দেয় তাইলে আমি ফেঁসে যাবো। তবে আশার কথা এরা নির্বিরোধী, কারো সাতেপাঁচে থাকে না। আত্মকেন্দ্রিক এবং কিছুটা আনসোশ্যাল হয়। সারাদিন বইয়ের ভেতর মুখ ডুবিয়ে থাকে। তাছাড়া প্রকাশিত নিউজে বেচারা নিজেই এখন হালুয়াটাইট, আমারে টাইট দেয়ার চিন্তা নিশ্চয়ই করবেন না।

পাঁচ.
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা এবং বানোয়াট নিউজ প্রকাশের জন্য ‘দৈনিক আজব বার্তার’ রিপোর্টারের বিরুদ্ধে দশ কোটি টাকা মানহানির মামলা। পত্রিকার পক্ষ থেকে ডাক্তারের সাথে মিউচুয়াল করার জন্য যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু আত্নকেন্দ্রীক নির্বিরোধী ডাক্তার আজমাইন যে এমন কঠোর হবেন কে জানত? 

তার একটাই কথা, দুদিন পর পর অবিবেচনাপ্রসূত মনগড়া একটার পর একটা নিউজ করে সাধারণ মানুষের মনে ডাক্তার সম্বন্ধে ভুল বার্তা দিচ্ছে এইসব মানহীন পত্রিকার হলুদ সাংবাদিকগণ। এতে লাভ হচ্ছে হেলথ টুরিজম নামে ব্যবসা ফেঁদে বসা বিদেশি দালাল এবং তাদের এদেশের দোসরদের। জনগণ বিভ্রান্ত হচ্ছে, তাদের ভোগান্তি বাড়ছে।  এর অবসান হওয়া উচিত; আমি এর শেষ দেখেই ছাড়ব।

বিঃদ্রঃ- ঘটনা সত্যি হলেও নাম ধাম এবং কিছু অংশ কাল্পনিক। কারো সাথে মিলে গেলে কাকতালীয় মাত্র।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

হাসপাতালের সকলে মিলে সমাজকে অনেক কিছুই দিতে পারে। সাধারণত যে মানুষ যেভাবে…

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব…

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal…

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থান। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নানা রকম হরমোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর