ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৪, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

এমবিবিএস, এফসিপিএস (গাইনী)

ফিগো ফেলো (ইতালি)

গাইনী কনসালট্যান্ট, বগুড়া।


বিবেক স্খলনের বলি যখন দেবশিশু

বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে দূর্ঘটনাবশতঃ সন্তানের আগমন অতঃপর তাকে সবার অলক্ষ্যে জন্মদান এবং ট্রাঙ্কে ঢুকিয়ে তালাবদ্ধ করা। পুরো ব্যাপারটা আমাকে এতোটাই আহত করেছে যে, এ মুহূর্তে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। এইরকম অসংখ্য ঘটনার স্বাক্ষী আমি। আমরা যারা নিয়ত সন্তান আকুতি আর সন্তান সম্ভবনা নিয়ে কাজ করি।

অনেকক্ষণ চিন্তা করলাম। কেন আমার এত অস্থিরতা? কেন এক নিঃশব্দ হাহাকার আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। উত্তর আমি নিজেই দিয়ে ফেলেছি কিছুক্ষণ আগে। আমরা সন্তানের জন্য হাজারো মায়ের আকুতি দেখেছি,দেখছি প্রতিনিয়ত। তাই যখন কেউ এসে নির্দ্বিধায় জানায়, গর্ভের সন্তানটি সে রাখতে চায় না, তখন অজান্তেই বিরক্তি ফুটে উঠে চোখেমুখে, রুষ্টতা স্পষ্ট হয় কন্ঠে।

তবে কেন? সন্তান না চাইলে এ খেয়ালীপনা কেন? দেশে কি জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার এতোটাই অভাব?

তারাও রুষ্ট হন আমার কথায়। তাদের জীবন, তাদের জরায়ু, তাদের সন্তান, আমার এতো কথা কেন? আমাদের এত মাথাব্যথা কেন? আহারে মেয়েরা, কেন তা যদি তোমরা বুঝতে! নিঃসন্তান মায়ের আহাজারি দেখেছো কখনো? দেখেছো হাহাকার? শুধু একটি সন্তানের জন্য আকুলতা! বোঝার চেষ্টা করেছো কখনো সমাজ-সংসারের তীক্ষ্ণ ফলায় তার ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া বুকের প্রতি মুহূর্তের রক্তক্ষরণের যন্ত্রণা?

ক'দিন আগে এক হিন্দু মহিলা এসেছিল আমার চেম্বারে। দশ বছরের সংসারে সন্তানের মুখ দেখেনি। সে কাঁদতে কাঁদতে এসে আমার পা ধরে বসে পড়ল, 'ম্যাডাম, আমাকে যেভাবে পারেন, একটা বাচ্চার ব্যবস্থা করে দেন। কিভাবে নাকি ইঞ্জেকশন পুশ করে বাচ্চা হয়,তাই করে দেন। আমার অনেক কষ্ট, একটা বাচ্চা আমার খুব দরকার।'

ওর আহাজারি দেখে যে কারো চোখে জল আসবে। আর আমরা তো পাষাণ হয়ে গেছি। ওর মতো শত-হাজার নারী এমনিভাবেই হাহাকার করে ফিরছে। আর তোমরা? ইচ্ছে হল, বাঁধহীন প্রেমের জোয়ারে নিজেকে ভাসিয়ে দিলাম। তারপর ভুল করে আসা অনাহুত সন্তানকে টেনে-হিঁচড়ে নিজের শরীর থেকে বের করে ছুঁড়ে ফেললাম আস্তাকুঁড়ে।

আশ্চর্য্যের ব্যাপার কি জানো? এ কাজটা তোমাদের মধ্যে কোন অনুশোচনা বা অনুতাপের সৃষ্টি করেনা। নিঃশঙ্কোচে কত ব্যাখ্যা দাও, বয়স কম, পড়ালেখা শেষ হয়নি, বাচ্চা নেয়ার বয়স হয়নি..!

খারাপ কথা মুখে চলে আসে। সামলিয়ে নিই। আরে তোর বাচ্চা নেয়ার বয়স হয়নি, বয়ফ্রেন্ড রাখার বয়স হয়েছে? শারীরিক সম্পর্কে জড়ানোর বয়স হয়েছে? বিবাহিতারাও কম যান না এ ব্যাপারে।

: বাচ্চা ছোট ছিল ম্যাডাম। কি করব?

: বাচ্চার বয়স কত?

: চার বছর।

: আর কিছু বলার আছে? চার বছরের ছোট্ট বাচ্চা আছে বলে চার মাসের পেটের বাচ্চাটাকে খুন করে ফেলার কি সুন্দর সোজাসাপ্টা ব্যাখ্যা! মাঝে মাঝে রাগ করে বলে ফেলি, দুটোর একটাকে খুন করতে হলে কোলেরটাই করেন না কেন? একই তো কথা!

সপ্তাহখানেক আগে এক দম্পতি এলো। দোকান থেকে বাচ্চা নষ্ট করার ওষুধ খেয়ে রক্তস্রাব শুরু হয়েছে। এখন ক্লিয়ার হল কিনা জানতে এসেছে। জিজ্ঞেস করলাম, নষ্ট করলে কেন প্রথম বাচ্চা? অকপটে চট করে জবাব দিল, আমি তো স্টুডেন্ট! কেন নিব?

: স্টুডেন্ট হয়ে তাহলে বিয়ে করেছো কেন? প্রথম ইস্যু নষ্ট করার পর তোমার যদি আর বাচ্চা না হয়! তখন?

উত্তর দিল না। কেমন একটা নির্লিপ্ত ভাব চেহারায়। মনে করিয়ে দিলাম, এই যে তোমার স্বামী দোকান থেকে ওষুধ এনে খাওয়ালো বাচ্চা নষ্ট করার জন্য, যেদিন বাচ্চা চাইলেও হবেনা সেদিন কিন্তু ও আর তোমাকে চিনবে না। একবারও মনে রাখবে না,সেই ওষুধ তুলে দিয়েছিল তোমার মুখে।

ছেলেটার দিকে তাকাইনি। সাধারণত রোগীর পুরুষ সঙ্গীর দিকে তাকাই না আমি। মেয়েটা একটু অর্থপূর্ণ চোখে তাকালো সঙ্গীর দিকে। এবার তাকিয়ে দেখলাম, সঙ্গী মাথা নীচু করে আছে। কিছুক্ষণ পর আমার এসিস্ট্যান্ট এসে বলল, ম্যাডাম,মনে হয় বিয়েই হয়নি মেয়েটার।

অবাক হলাম না। এমন ভুরি ভুরি দেখি। নতুন কিছু নয় তো! পরদিন জরায়ুতে আটকে পড়া গর্ভের বাদবাকী অংশ ডিএন্ডসি করে বের করার পর ক্লিনিকের ম্যানেজার জানালো, আসলেই সে বিবাহিত নয়।

: কিভাবে বুঝলে?

: ম্যাডাম, ভর্তি ফর্ম পূরণের সময় স্বামীর নাম জিজ্ঞেস করতেই পাশে থাকা ছেলেদের দিকে তাকালো। পরে এক ছেলে এসে স্বামীর নাম বললো।

: আহারে মেয়ে! অবাধ স্বাধীনতার যুগে বয়ফ্রেন্ডের সাথে একান্তে সময় কাটাতে পারো, তার সন্তান গর্ভে ধারণ করতে পারো, নিঃশঙ্কোচে সেটা নষ্টও করতে পারো আর সন্তানের পিতা হিসেবে তার নামটা উচ্চারণ করতে এত দ্বিধা! পারমিশন নেয়ার জন্য তার দিকে তাকাতে হয়? এখনও বোঝনা মেয়ে, তোমার অবস্থানটা কোথায়?

মেয়েদেরকে বলছি, শোন মেয়েরা.. ভালবাসো, প্রেমে পড়ো, চুটিয়ে ডেট করো, কিন্তু নিজের সীমানাটা ঠিক রাখো। নিজের চারপাশের লক্ষণরেখা স্পষ্ট করে রাখো, সঙ্গীর জন্য দৃশ্যমান করে রাখো। চারপাশে এত এত উদাহরণ দেখেও কেন শেখো না তোমরা? কেন বোঝ না, প্রেম করা আর দায়িত্ব নেয়া এক জিনিস না।

বয়ফ্রেন্ডের দায়িত্বশীলতার উপর আস্থা রেখে নিজের ব্যাপারে দায়িত্বহীন হয়ো না। মনে রেখো, ভীড়ের স্রোতে হাত ধরে রাখা সহজ। স্রোতের উল্টোদিকে চলতে গেলে পা পিছলাবেই। কাজেই সে পথে হাঁটার আগে নিশ্চিত হয়ে নিয়ো বিপরীতমুখী স্রোতে ভেসে গেলে সঙ্গী তোমার হাত শক্ত করে ধরে থাকবে তো! নাকি সে নিজের জীবন বাঁচাতে স্রোতের অনুকূলে গা ভাসিয়ে হারিয়ে যাবে জনসমুদ্রে? ভেবে দেখেছো কখনো?

: না, আমার ও ওরকম না। আমার ও খুব ভাল। আমাকে খুউব ভালবাসে।

: মেয়ে তুমি ভালোবাসার চিনেছো কি? এতো ভালোবাসে যে পুরুষ,সে নিজের ভালোবাসার ফুলকে ছিঁড়ে ফেলতে চায় কেন? আর তুমি? তুমি নিজে বোঝ, ভালোবাসা কি? বুঝলে তুমি মা হয়ে পারতে নির্মমভাবে নিজের ভালোবাসার উপহারকে বলিদান দিতে? নিজেকেই কি ভালোবাসতে পেরেছো তুমি? নাড়ি ছিঁড়ে যে ধন ফেলে দিলে অবহেলায়, তাকে ভালবাসতে পেরেছো? তাহলে খামাকা ভালোবাসার দোহাই দিও না আর।

যেদিন নিজের গর্ভে ধারণ করা সন্তানকে মাথা উঁচু করে জন্মপরিচয়সহ দুনিয়াতে নিয়ে আসার সাহস অর্জন করবে, সেদিন জরায়ুর ব্যবহার করো। আর নইলে সমাজের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের সন্তানকে নিজের পরিচয়ে বড় করার শক্তি ধারণ করো। তোমাদের ভালোবাসার লোক দেখানো মিথ্যে টানাটানিতে আর কোন দেবশিশুকে বলিদান দিও না। প্লিজ। আল্লাহর গজব পড়বে। যে জান দেয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই, তারটা নেয়ার কোন অধিকারও আমাদের থাকতে পারেনা।

সময় থাকতে সাবধান হও মেয়েরা। নইলে ধর্ম, সমাজ, পরিবার, এমনকি নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতেও লজ্জায় মাথা নত হয়ে যাবে। মেরুদণ্ড সোজা করে ঘুরে দাঁড়াও। সামনে এগিয়ে যাও। কোন পাপবোধ সাথে নিয়ে নয়, কোন কাপুরুষের সাথে কদম মিলিয়ে নয়, এগিয়ে যাও আপন আলোয়, আপন শক্তিতে, আত্মমর্যাদা নিয়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

হাসপাতালের সকলে মিলে সমাজকে অনেক কিছুই দিতে পারে। সাধারণত যে মানুষ যেভাবে…

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব…

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal…

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থান। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নানা রকম হরমোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর