ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৪, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. বাহারুল আলম

প্রখ্যাত পেশাজীবী নেতা


প্রাইভেট প্রাকটিস: প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পরিবর্তনে আশাবাদী চিকিৎসকরা

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কেবল হাসপাতালের এক কর্নারে সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্রাকটিস গড়ে উঠলে ও হাসপাতাল ভবন আধুনিকায়ন হলেই চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিদ্যমান বিশাল সংকটের সমাধান হবে না। আমাদের আমলা নিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশের স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার বেহাল ও গুরুদশা দীর্ঘদিনের। সমাধানের আবেদন, নিবেদন, আন্দোলন –সেটাও দীর্ঘদিনের। কখনও মন্ত্রী বা তার মন্ত্রণালয় সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেনি।

অবশেষে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি আংশিক সমাধা-কল্পে নির্দেশ দিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও তার মন্ত্রণালয়ের প্রতি। যারা ৪৮ বছর ধরে এই সমস্যায় জর্জরিত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর চাপিয়ে দিয়ে ভালমানুষ সেজে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে। কারো কথায় যখন তাদের টনক নড়েনি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পরিবর্তন আসবে বলে আশাবাদী ভুক্তভোগী রোগী ও চিকিৎসক সমাজ।

১. সরকারি চিকিৎসকদের হাসপাতালের কোন এক কর্নারে প্রাইভেট প্রাকটিস করার নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী এবং কর্তৃপক্ষকে সকল হাসপাতালে এ নির্ধারিত কর্নার প্রস্তুত করে দেওয়ার কথাও বললেন। ব্যাপক বিশ্লেষণে না গিয়ে কেবল প্রশ্ন, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বাদে দুপুর আড়াইটা থেকে পরদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত অধিকাংশ হাসপাতালে জরুরি ও আন্তঃবিভাগে কোন চিকিৎসকের পদ সৃষ্টি বা পদায়ন নাই। শুক্রবার সহ অন্যান্য ছুটির দিনে হাসপাতাল সমূহে একজন চিকিৎসককে জরুরি বিভাগ, আন্তঃবিভাগ ও অপারেশন থিয়েটারে দায়িত্ব পালন করতে হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান অপপ্রয়োগে কি ভয়াবহ দৃশ্য!

প্রধানমন্ত্রীর জানা থাকার কথা, এর সাথে যুক্ত আছে প্যাথলজি, এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, ইসিজি, ইকোকাডিওগ্রাম সহ রোগ নির্ণয়ের আধুনিক যন্ত্র ও সরঞ্জামাদি এবং দক্ষ টেকনোলজিস্টের অভাব। এছাড়াও জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের ক্ষেত্রে সংকট আরও তীব্র।

সড়ক দুর্ঘটনা, হৃদপিণ্ডে ও মস্তিষ্কে স্ট্রোক, কারখানায় মেশিনারি দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া ও আগ্নেয়াস্ত্র সহ বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র দিয়ে বিপক্ষকে আঘাত করা রোগীদের জন্য ক্যাজুয়াল্টি ওয়ার্ড, সিসিইউ, আইসিইউ, বার্ন ইউনিট, জরুরি চিকিৎসার ঔষধপত্র, সার্বক্ষণিক জরুরি রোগীর অপারেশন থিয়েটার ও এনাস্থেসিয়োলজিস্ট, জরুরি বিভাগের সাথে সংযুক্ত না থাকার কারণে হাসপাতালে হৃদয়বিদারক চিকিৎসা সংকট দেখা দেয়। এ সকল সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ থাকা প্রয়োজন ছিল।

প্রাসঙ্গিকতায় বলা যায়, বাংলাদেশে সিএমএইচ (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) এর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার আদলে সকল হাসপাতাল বা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে রোগী–চিকিৎসকের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। সরকার পরিচালিত হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের সকল হাসপাতালের ঊর্ধ্বে থাকবে, প্রধানমন্ত্রীর সর্বাগ্রে এ বিষয়ে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।

২. হাসপাতাল ভবন ও অবকাঠামো নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যথার্থ বলেছেন। হাসপাতাল গুলো আলো-বাতাসহীন, অন্ধকার, জরাজীর্ণ, অস্বাস্থ্যকর ও কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে স্থাপিত হওয়ার পেছনে বিগত সময়ের স্বাস্থ্যমন্ত্রীগণ ও তার মন্ত্রণালয় দায়ী। এজন্য অতীতে তাদের কৈফিয়ত দেওয়া লাগেনি, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরে বাস্তবায়িত না হলেও লাগবে না।

অতীতে যে কারণে কর্তৃপক্ষ হাসপাতাল স্থাপনের পূর্বে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, ভবন, লোকবল, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম ও ঔষধপত্র সহ জরুরি উপকরণ নিয়ে ভাবেনি, তাদের সেই ক্ষমতা বহাল থাকার কারণে এখনও তারা ভাববে না।

এ নির্দেশনার পূর্বে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ও তাঁর আন্তরিকতা, ভালবাসা যারা হৃদয়ঙ্গম করতে পারত এবং তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়নের মত যাদের জ্ঞান আছে- সেই অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের মন্ত্রণালয়ে স্থান দিলেই সুচারুরূপে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন হওয়া সম্ভব ছিল। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠা ও বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বাজেট ও “কৃত্য পেশাভিত্তিক মন্ত্রণালয়” প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন সর্বাগ্রে। নইলে তাঁর নির্দেশ অতীতের ন্যায় হাসপাতাল হবে ইমারতের জঞ্জাল, (প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় হোটেল হোটেল মনে হয়)।

চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকটের কারণভিত্তিক সমাধান না করে কেবল উপরে সমাধানের প্রলেপ দিলে ভেতরে সংকটের পাহাড় গড়ে উঠবে। সরকারি হাসপাতাল সমূহের ব্যবস্থাপনা রোগীকে পুর্ণাঙ্গ চিকিৎসা প্রদানের উপযোগী করে দিলে চিকিৎসা সংকটের অবসান হতে বাধ্য ।

জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে স্থাপিত হাসপাতালের চিকিৎসা প্রদানের সক্ষমতা পরিপূর্ণ থাকলে চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্রাকটিস সম্পর্কে জনগণের সমালোচনা বা ক্ষোভ – দূর হয়ে যাবে।

৩. বেসরকারি খাতে চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। সেটি যথাযথ নিয়ন্ত্রণের অভাবে জনজনগণের ভোগান্তি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। ঐ বিভ্রান্তি ও ক্ষোভের রেশ পড়ে চিকিৎসকের উপর, যা কর্তৃপক্ষ বা মন্ত্রণালয় সম্পূর্ণ আড়ালে থাকে। সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাকে পুঁজি করে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বেসরকারি খাত গড়ে উঠেছে। নিয়ন্ত্রণের অভাবে লাভ হচ্ছে পুঁজিপতিদের, ক্ষতি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও দুর্নাম হচ্ছে চিকিৎসকদের।

বেসরকারি চিকিৎসা খাত কখনও সরকারি চিকিৎসা খাতের ঊর্ধ্বে বা বিকল্প যেন না হয়- এ ভারসাম্য রক্ষিত না হলে দেশের জনগণ, চিকিৎসক ও চিকিৎসা ব্যবস্থাকে অমর্যাদা করা হয়। যা এখনও বিদ্যমান। এদিকেও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি নিবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।

৪. রাষ্ট্রের কর্ণধার, আমলা ও পুঁজিপতিরা বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে থাকে। এ কারণেও সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা ও চিকিৎসকদের উপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস ক্রমান্বয়ে কমছে। ভিআইপিদের চিকিৎসা দেশে নেওয়ার প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশ থাকলে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন হওয়ার সম্ভাবনা বা সুযোগ ছিল।

কেবল চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্রাকটিস হাসপাতালের কোন এক কর্নারে স্থাপনের অনুমতি ও সকল হাসপাতাল ভবন আধুনিকায়ন করলেই এ বিশাল সংকটের সমাধান হবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর