ঢাকা      বুধবার ২২, মে ২০১৯ - ৮, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


যে কথা হয়না বলা

তখন ইন্টার্নশিপ চলছে। একদিন ইভিনিং ডিউটি করছি। লেবাররুম থেকে এক মায়ের তীব্র চিৎকার। সন্তান জন্মদানের এই চিৎকারের তীব্রতা কিভাবে বুঝাই! একেতো নবীন ডাক্তার, তার উপর জন্ম প্রক্রিয়ার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখতে হলো আমায়।

রক্ত, বাচ্চার কান্না এবং বাচ্চার মুখ দেখে মায়ের হাসি সব মিলিয়ে কেমন যেন একটা আবেশ সৃষ্টি করল। আর ডাক্তার হিসাবে প্রথম ডেলিভারি করাতে পারার থরথর অনুভূতি, আহা! সব প্রথমই অন্যরকম আবেদন রাখে। সেই আবেদনের কৌতুহলে রোগীর এটেন্ডেন্সের সাথে বাচ্চার কুশল বিনিময়ের সময় আবিষ্কার করলাম তিক্ত সত্য। 

ম্যাডাম, আপনাদের মিষ্টি খাওয়ার কথা বলে রহিমা খালা পাঁচশত টাকা নিলো। আমরা মিষ্টি এনে দিতে চাইলাম, খালা বলল, আপনারা নাকি যেখানে সেখানের মিষ্টি খান না। এসব শুনে মেজাজ খুবই খারাপ হলো। কী বলে এসব? আমরা কেনো মিষ্টি খেতে যাবো? নতুন ডাক্তার, রক্ত টগবগে। ওয়ার্ডে এসে খালাকে চার্জ করলাম। এরপর রানী কুঠির বাকী ইতিহাস...

দুই.

আয়া, খালা, মাসিরা প্রতিটি নবজাতকের জন্য পাঁচশ, হাজার টাকা নেয়। কখনো কখনো ডাক্তারের কথা বলে নেয়। হায়, ডেলিভারির মতো কর্মযজ্ঞে রক্ত, পানি, প্রস্রাব, পায়খানা মাখামাখির কাজ করবে ডাক্তাররা আর তাদের বেঁচে দিয়ে গুড় খাবে অন্যরা! সরকারি হাসপাতালে ডাক্তাররা বিনামূল্যে অপারেশন করে কিন্তু আয়া বুয়া, দাদুদের টাকা না দিলে রোগী ওটি টেবিলে ওঠবেও না, নামবে ও না।

সেদিন আমার এক কলিগের চাচার অপারেশন হলো নিউরোসার্জারীতে। পাক্কা চারঘন্টার অপারেশন। আপা আফসোস করছিলেন, চার ঘন্টা ঠায় দাঁড়িয়ে অপারেশন করা সার্জন টীমকে এক কাপ চা খাওয়াতে পারলাম না, অথচ দাদুকে দিতে হলো পাঁচশ পাঁচশ হাজার টাকা! একদিন দেখি, এক খালা রোগীর হিবিটেন ক্রিম ব্লাউজের ভিতর গুঁজছে। বিরক্ত হয়ে বললাম- একি! এটা নিচ্ছো কেনো খালা?

: আফা, থাক থুইয়া দেই।

: আরেহ..! মাসিকের রাস্তা পরীক্ষা করার ক্রিম দিয়ে তুমি কী করবে?

: এমনি আপা, এট্টু পরীক্ষা করে দেখতাম।

পরে জানা গেলো সে খালার নাকি একটা ক্লিনিক আছে! সে বাচ্চা ডেলিভারি করায়!

তিন.

নরমাল ডেলিভারির পূর্বশর্ত হচ্ছে ডেলিভারির ব্যাথা শুরু হওয়ার প্রথম দিকে রোগীকে হাঁটাচলা করতে বলা। এই হাঁটাচলায় একজন মাসি রোগীর সাথে ট্যাগ হয়ে যায়। তাকে এটা ওটা আগিয়ে দেয়। প্রসব ব্যাথায় কাতর রোগীর মন থাকে নরম। খালার কথায় হাটতে হাটতে পার্শ্ববর্তী ক্লিনিকে চলে যায়। রোগী প্রতি হাজার, দুই হাজার নাকি এদের আয়। এদের কাজকর্ম গায়েমাখিনাটাইপ। কিচ্ছু বলে কোনো লাভ হয় না। উল্টো কাজের সময় দেখা যাবে হাতের জিনিসটা এগিয়ে দেবে না।

এই যে হাসপাতাল নোংরা অপরিচ্ছন্ন থাকে, কেনো থাকে? থাকে কারণ এরা নিজেরা নিজেদের কাজ করে না, বদলি লোক নিয়োগ করে। বদলিদের কাজ করার চেয়ে আবার বকশিসের দিকে নজর বেশি। ট্রলি টানা, রোগী ওঠানো নামানো, এটা সেটা আগিয়ে দিয়েই বেতনের বহুগুণ পায়। সরকারি আয়া বুয়া দাদুরা বছরের পর বছর একই জায়গায় পোষ্টেড থাকে। এক জায়গায় থাকতে থাকতে এদের শিকড় গজিয়ে ওঠে। সেই শিকড় আবার কচুরিপানার শিকড় না, টান দিলে ছিড়ে যাবে। এদের শিকড় বট পাকুড়ের, অতলান্তে ছড়িয়ে থাকে। কিছু বলবেন, খবর আছে। কর্তৃপক্ষ খবররে খুবই ডরায়। না হলে অন্তত পরিস্কার পরিচ্ছন্নের ব্যাপারটা আরো একটু উন্নত হতে পারত। অবশ্য ওরা লজিক দেয় কাজের তুলনায় লোকবল কম। এটাও অবশ্য মিথ্যা না।

চার.

রোগী এবং রোগীর লোকজনেরা হচ্ছে একেকজন চিজ। খাবারের ঠোঙ্গাটাসহ এটা সেটা বারান্দা, জানালা দিয়ে ছুঁড়ে মারতেই আনন্দ তাদের। আমার কথা বিশ্বাস করার দরকার নাই, যেকোনো সরকারি হাসপাতালের চারপাশটা একবার চক্কর দিয়ে আসলেই বুঝতে পারবেন চিত্রটা কতটা অস্বস্তিকর। স্বাস্থ্যখাতের উন্নতিতে যে সাফল্য তার অনেকটাই সরকারি হাসপাতালের অপরিস্কার অপরিচ্ছন্নতার নীচে ঢাকা পড়ে যায়।

হতাশার কথা বাদ, আশার কথা বলি, স্বপ্নের কথা বলি; একদিন নিশ্চয়ই এমন হবে ময়লা আবর্জনা আমরা যত্রতত্র ফেলব না। প্রতিটি রোগী অন্তত একটি বেড পাবে চিকিৎসার জন্য। অসুস্থ একজন রোগীকে ফ্লোরে, বারান্দায়, করিডোরে চিকিৎসা দিতে একদম ভালোলাগে না। বিশ্বাস করেন, একদম না। আর প্রতিটা নাগরিকই তার নাগরিক দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করবে, ব্যাস।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

৩৯তম বিসিএসের নন-ক্যাডারদের দাবি, বিপক্ষ মতের যুক্তিখণ্ডন

৩৯তম বিসিএসের নন-ক্যাডারদের দাবি, বিপক্ষ মতের যুক্তিখণ্ডন

যুক্তি-১ বিপক্ষ মতের কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, একসঙ্গে এত চিকিৎসক নিয়োগের…

‘প্রধানমন্ত্রীর স্বদিচ্ছা সত্ত্বেও নিয়োগবঞ্চিত নন-ক্যাডার চিকিৎসকরা’

‘প্রধানমন্ত্রীর স্বদিচ্ছা সত্ত্বেও নিয়োগবঞ্চিত নন-ক্যাডার চিকিৎসকরা’

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার আগের দুই মেয়াদে আওয়ামী…

নিরাপত্তাহীনতায় কর্মস্থল বদল

নিরাপত্তাহীনতায় কর্মস্থল বদল

যায় দিন ভাল, আসে দিন খারাপ! জানি না আর কি কি খারাপ…

শিশুদের উচ্চ রক্তচাপঃ এক অবহেলিত অধ্যায়

শিশুদের উচ্চ রক্তচাপঃ এক অবহেলিত অধ্যায়

শিশুদের রক্তচাপ মাপতে গেলেই রোগীর বাবা-মা সবসময়ই যে প্রশ্নটি করেন সেটি হল…

দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার বাস্তবতা ও আমার কিছু অভিজ্ঞতা

দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার বাস্তবতা ও আমার কিছু অভিজ্ঞতা

আমার মা ২ সপ্তাহ আগে মারা গেছেন। উনি গত আড়াই বছর ধরে…

চিকিৎসক জীবনের সবচেয়ে মধুর সম্বোধন!

চিকিৎসক জীবনের সবচেয়ে মধুর সম্বোধন!

খবর: ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করায় সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) সঞ্চিতা…























জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর