ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৪, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. মেহেদী হাসান

সিনিয়র মেডিকেল অফিসার,
এসআইবিএল ফাউন্ডেশন হাসপাতাল


মা

পেশাগত কারণে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যু চিকিৎসকদের কাছে একটি স্বাভাবিক ঘটনা। মৃত রোগীর ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিয়ে আমরা খাই, পড়ি, গল্প করি। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি অনুভূতিহীন হয়ে পড়ছি দিনদিন। তবে আবার মনকে বোঝাই, অত বেশি আবেগী ও সংবেদনশীল মনোভাবাপন্ন হলে তো যথাযথ চিকিৎসা সেবা বাধাগ্রস্ত হবে। যাক।  

আজকের ঘটনা ভিন্ন। রোগীকে সামান্য এন্ডোট্রাকিয়াল টিউব দিতে গিয়েই চোখের পাতা ভিজে উঠলো। কারণ আজ যাকে চিকিৎসা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তিনি একজন ভদ্রমহিলা। শারীরিক অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। লাইফসাপোর্টে দিতে হবে এক্ষুণি।

অবশ্য এটা কোনো উল্লেখযোগ্য বিষয় না। ঘটনা হলো, আজ যাকে চিকিৎসা দিচ্ছি, তিনি দেখতে আমার মায়ের মতোই। যে কারণে সকল প্রস্তুতি থাকার পরও তাঁকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে কেন যেন তালগোল পেকে যাচ্ছে। অজানা এক কারণে অপ্রস্তুত হয়ে যাচ্ছি আমি।

বারবার মায়ের মুখটি চোখের সামনে ভেসে আসছে। একজন সংকটাপন্ন রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়েও একটিবারের জন্য তাকে ভুলতে পারছি না।  

দ্রুত প্রসিডিউর শেষ করে মাকে ফোন দিলাম। আদর করে মা আমাকে মধু বলে ডাকে। মন খারাপ হলে মা ঠিকই বোঝে। মায়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আজ চোখের পানি আর বাঁধ মানলো না। দ্রুত ফোন রেখে দিলাম।
 
আহারে! প্রায় চারমাস মাকে দেখি না। ঢাকা আর যশোরের দূরত্ব কি এতই বেশি? আসলে নাগরিক ব্যস্ততাই মায়ের কাছ থেকে আমাকে দূরে রাখছে। শত ইচ্ছা সত্ত্বেও মায়ের পরশ নিতে পারছি না।

মা-বাবা দুজনই গ্রামে থাকেন। গ্রাম বাবার শেকড় আর আমার শেকড় গজিয়েছে ঢাকায়। তাই চাইলেও মা সবসময় আমার কাছে থাকতে পারেন না। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে শিকড় উপড়ে ফেলে গ্রামে চলে যাই, মায়ের সোহাগমাখা কোলে।

আমার মায়ের রোগের শেষ নেই। চিকিৎসা মূলত আমি নিজেই করি। প্রয়োজন হলে কোন স্যারের পরামর্শ নেই। প্রতিমাসে অনেক টাকার ওষুধ লাগে। বিকাশ একাউন্ট খুলে দিয়েছি বছর খানেক হল। মাসের প্রথমেই আমি টাকা পাঠিয়ে দেই।

মার হজ্জ করার খুব ইচ্ছা। মা-বাবাকে হজ্জ করিয়ে আনার মতো টাকা আমার নেই। আমি যে টাকা দেই, তা থেকে কিছু কিছু করে সঞ্চয় করে মার ২০ হাজার টাকা হয়েছে। গতবার যখন বেড়াতে আসলো, তখন এ ২০ হাজার টাকা আমার হাতে দিয়ে মা বলেছিল, ‘বাকি টাকা দিয়ে আমারে একটু হজ্জ করায়ে আনিস মধু।’

টাকাটা সযত্নে রেখে দিয়েছি আলমারিতে। বের করলে মার কথা মনে পড়ে আর চোখ ভিজে আসে। সেখানে প্রতিমাসে আমিও কিছু টাকা রাখি। কবে যে বাবা-মাকে বাইতুল্লাতে নিতে পারবো!

হাসপাতালের ডিউটি ডাক্তারের রুমে শুয়ে এসব স্মৃতির পাতা উল্টাতে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম কল্পনার রাজ্যে। সম্বিত ফিরলো সিস্টারের জরুরি তলবে। হন্তদন্ত হয়ে আইসিইউর ভিতরে গিয়ে দেখি রোগীর হার্টরেট কমে আসছে। কাছে যেতে যেতেই হার্ট বন্ধ হয়ে গেল। সিপিআর দিলাম অনেক্ক্ষণ। বুকে চাপ দিতে দিতে হাত অবশ হয়ে আসছে। কার্ডিয়াক মনিটরের ইসিজির লাইনটা স্ট্রেইট হয়ে গেছে, তবুও আমি থামতে পারছি না। মনে হচ্ছে, আমার মা যেন হজ্জ না করেই মরে যাচ্ছে!

সিস্টারের কণ্ঠ শুনতে পেলাম। দূর থেকে ভেসে আসছে, ‘ডাক্তার, আর কতক্ষণ সিপিআর দিবেন? মনে হয় আর ফিরবে না। ডেথ ডিক্লেয়ার করে দেন।’

‘এডরেনালিন দিতে থাকেন’-গলার স্বর শুনে সিস্টার আর কথা না বাড়িয়ে এড্রিনের এম্পুল ভেঙে পুশ করে দিল। মোহগ্রস্তের মতো সিপিআর দিয়েই চলেছি, দশ মিনিটের বেশি হয়ে গেছে। হঠাৎ কার্ডিয়াক মনিটরে রিদম দেখতে পেলাম। গলায় হাত দিয়ে দেখলাম কেরোটিড পালসও ফিরেছে।

এসির ভিতরেও আইসিইউ ড্রেস ঘামে ভিজে গেছে। অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রতিজ্ঞা করলাম, বাবা-মাকে যে করেই হোক হজ্জ করিয়ে আনবো, ইনশাআল্লাহ।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

হাসপাতালের সকলে মিলে সমাজকে অনেক কিছুই দিতে পারে। সাধারণত যে মানুষ যেভাবে…

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব…

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal…

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থান। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নানা রকম হরমোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর