ঢাকা      বুধবার ২২, মে ২০১৯ - ৮, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. রুমি আহমেদ

সাবেক ছাত্র, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ;
যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত।


নাকডাকা রোগের চিকিৎসা

স্লিপ এপনিয়ার (নাক ডাকা রোগ) চিকিৎসা যতটা না বায়োমেডিকেল সাইন্স ভিত্তিক, তার চেয়ে বেশি ফিজিক্স, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমস্যা।

আগেই বলেছি, নাক ডাকা রোগের মূল কারণটা হচ্ছে গভীর ঘুমে আমাদের গলার মাংসপেশিগুলো রিলাক্স হতে হতে এক পর্যায়ে ঢলে পড়ে। আর এতেই স্বাভাবিক শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। আরও সহজ করে যদি বলি, আলজিহ্বার আশ-পাশের জায়গা থেকে গলার ছাদটা ঢলে পড়ে যায় এবং দুপাশ থেকে চেপে আসে, ফলে শ্বাস নেয়ার পুরো রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়।

এর চিকিৎসা তো আর ওষুধ দিয়ে হবে না। ছাদ ঢালাইয়ের আগে যেমন বাঁশের শাটারিং দিয়ে ছাদকে ঠেকা দিয়ে রাখা হয়, সেভাবেই এই মাসলগুলোকে ঠেকা দিতে হবে, যাতে গভীর ঘুমে মাসলগুলো ঢলে পড়তে না পারে।

কিন্তু গলার মধ্যে ওইটা কিভাবে সম্ভব? চেষ্টা করা হলো, দাঁতের সঙ্গে একটা ফ্রেম টাইপের কিছু একটা লাগিয়ে মাসলগুলোকে গভীর ঘুমের মধ্যেও জায়গামতো রাখার। এটাকে বলে, স্লিপ ডেন্টিস্ট্রি। এ পদ্ধতির চিকিৎসায় কিছুটা সফলতাও আছে। তবে এই ডেন্টাল ডিভাইসটা খুব অস্বস্তিকর এবং এটা তেমন কার্যকরও না।

সার্জনরা চেষ্টা করলেন, গলার ভিতরের আলজিহ্বা, মেমব্রেন আর মাসলগুলো কেটে ছোট করে টাইট করে দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে, চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে বলে uvulopalatopharyngioplasty।কিন্তু দেখা গেল, এটা খুবই মেসি একটা সার্জারি। অনেক যন্ত্রণাদায়ক, রিকোভারিও দীর্ঘমেয়াদী। অনেক রোগীর বেলায় এ চিকিৎসা কার্যকরি হলেও সব ক্ষেত্রে এর নিশ্চিয়তা মেলেনি। এটি এখনো চূড়ান্ত রোগীর বেলায় করা হয়, তবে খুব বিরল।

তবে সত্যিকারের চিকিৎসার প্রথম ব্রেকটা আসলো অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তখন ট্র্যাকিওস্টমি করে ডা. কলিন সুলিভান নাকডাকা রোগের চিকিৎসা করতেন। অনেক রোগীর ভোগান্তি হবে কিন্তু কোনো অবস্থাতেই ট্র্যাকিওস্টমি করবে না। উনি অন্য উপায় খুঁজলেন। তিনি ভাবলেন ঠেকা দেবার জন্য বাতাস ব্যবহার করলে কেমন হয়! যেমন ফুটবল বা বেলুন, বাতাস ভরা থাকলে শেপ মেইনটেইন করে, বাতাস না থাকলে নাকডাকা রোগীর গলার মতো ঢলে পরে। আবিষ্কৃত হলো, প্রথম সিপ্যাপ মেশিন! এটা ১৯৮১ সালের কথা।

সিপ্যাপ মেশিন টিউব আর মাস্ক দিয়ে ঘুমের সময় রোগীর নাক দিয়ে বাতাস পাম্প করে, গলার ভিতর বাতাসের প্রেসার মেইনটেইন করা হয় এবং এর ফলে বাতাস ভরা ফুটবলের মতো গলার মাসল আর ঢলে পড়তে পারে না।

কলিন সুলিভান প্রথম সিপ্যাপ মেশিন বানিয়েছিলেন ভ্যাকুয়াম কিনারের মোটর আর টিউবিং ব্যবহার করে। এখন টেকনোলজি এনেক এগিয়ে গেছে। রেসমেড আর ফিলিপ্স কোম্পানি প্রতিযোগিতা করে নতুন নতুন হাইটেক মেশিন বানাচ্ছে। কিছু মেশিন এখন টেবিল ক্লকের সাইজ আর একেবারে শব্দহীন।

নাকডাকা রোগের বর্তমান মূল চিকিৎসা সিপ্যাপ মেশিন! মেশিনের সঙ্গে টিউবের মাধ্যমে মাস্ক সংযুক্ত করে নাক বা মুখে একটা মাস্ক পরে ঘুমাতে হয়। তবে এ ক্ষেত্রে রোগীকে বশে আনা অনেক কঠিন কাজ। রোগী প্রথমেই বলে বসবে মুখে বা নাকে মাস্ক পরে ঘুমানো সম্ভব না। অনেকে কয়েক রাত চেষ্টা করেও এক পর্যায়ে হাল ছেড়ে দেয়। কিন্তু অধিকাংশ রোগী সিপ্যাপ মেশিনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেন। ওরা ফলোআপে এসে আমাকে বলবেন, কি ম্যাজিক মেশিন দিলেন ডক্টর! আমি জানতাম না যে, এর মাধ্যমে এতো গভীরভাবে ঘুমানো যায়! আমার জীবন বদলে গেছে! আমি ঘুম থেকে সতেজ হয়ে উঠি এবং সারাদিন নিজেকে শক্তিমান মনে হয়। আর এই মেশিন ব্যবহার করলে নাক ডাকা সম্পূর্ণ চলে যায়।

মাস্ক পরে ঘুমানো ঝামেলার। কিন্তু এটা যাপিত জীবনে এতো ইতিবাচক প্রভাব ফেলে যে, নাকডাকা রোগীরা কোনো অবস্থাতেই একটা রাতও এটা ছেড়ে থাকবেন না। এমনটি একরাতের জন্য কোথাও গেলেও মেশিন সাথে নিতে ভুল করবেন না।

সফল চিকিৎসার একটা প্রধান উপাদান হচ্ছে রোগীর উপযোগী মাস্ক, যাতে বাতাস লিক না করে। এজন্য সিপ্যাপ মেশিন কেনার সময় সাথে অবশ্যই তিন ধরণের মাস্কও নিয়ে নেবেন। যেমন: ফুল ফেস মাস্ক, নাকের মাস্ক আর নাকের ভিতরে অক্সিজেনের মতো ন্যাসাল পিলো। যদিও ন্যাসাল পিলো দেখতে ছোট আর সহনীয় আকৃতির মনে হয় এবং অনেকে ওটাই চায় প্রথমে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ফুল ফেস আর ন্যাসাল মাস্ক অনেক বেশি স্বস্তি ও আরামদায়ক|

নাকডাকা রোগের চিকিৎসা একটা নতুন ক্ষেত্র। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই মেডিকেল কলেজগুলোতে এই বিষয়ে কোর্স নাই। বাংলাদেশে তো নাইই। যুক্তরাষ্ট্রে যদিও প্রতিবছর ট্রেইন্ড স্লিপ বিশেষজ্ঞ বের হচ্ছেন, তবে এখন পর্যন্ত রেসপিরেটরি বা পালমোনারি বিশেষজ্ঞই। কম ক্ষেত্রেই নিউরোলজিস্ট রা স্লিপ এপনিয়ার চিকিৎসা করছেন। আমেরিকার রেসপিরেটরি বা পালমোনারি কোর্স কারিকুলামে স্লিপ মেডিসিন খুব গুরুত্ব সহকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমরা যারা প্রশ্ন তৈরি করি, তাদেরকে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া আছে, রেসপিরেটরি বা পালমোনারি সাব স্পেশিয়ালাইজেশন পরীক্ষাগুলোতে যেন কমপক্ষে ১০% স্লিপ রিলেটেড প্রশ্ন থাবে।

বাংলাদেশে নাকডাকা রোগের চিকিৎসা এখন পর্যন্ত স্বল্প পরিসরেই হয়। তাও আবার ব্যয়বহুল। এখানে একটা সিপ্যাপ মেশিনের দাম রাখা হয় আমেরিকারও তিনগুণ। পরীক্ষাও বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। বাংলাদেশে ঢাকার অনেক রেসপিরেটরি বা পালমোনারি বিশেষজ্ঞ এখন নাকডাকা রোগের চিকিৎসা দিচ্ছেন। শুনেছি, অনেক নাক-কান-গলা (ইএনটি) বিশেষজ্ঞও এই চিকিৎসা দিচ্ছেন।

ঢাকার কর্পোরেট হাসপাতালগুলো, যেমন: এপোলো, ইউনাইটেড, স্কয়ার ও ল্যাব এইড ইত্যাদি হাসপাতালে এ রোগের ডায়াগনোসিসের জন্য স্লিপ ল্যাব আছে। জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক যুক্তরাষ্ট্রের স্লিপ ও রেসপিরেটরি চিকিৎসক Humayun Kabir ডা. হুমায়ুন কবির ভাই গুলশানে ঘুম চিকিৎসা কেন্দ্র খুলেছেন। তিনি বছরের অনেকটা সময় দেশে থাকেন এখন। বাকি সময় স্লিপ টেলিমেডিসিনের সাহায্যে চিকিৎসা দেন। আমার বন্ধু Adnan Choudhury ডা. আদনান ইউসুফ চৌধুরীও স্লিপ চিকিৎসা দেয়া শুরু করেছেন|

আপনার স্লিপ এপনিয়া সন্দেহ হলে প্রথমে আপনাকে স্লিপ টেস্ট করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো এতো ক্লাসিক আর সিভিয়ার যে টেস্ট ও করার প্রয়োজন হয় না। সরাসরি সিপ্যাপ মেশিন ব্যবহার করা শুরু করা যায়। স্লিপ টেস্ট ল্যাবে গিয়ে সারারাত ঘুমিয়ে করতে হয়। তবে হোম স্লিপ স্টাডি আজ কাল বেশ জনপ্রিয়। বুকে একটা বেল্ট পরে নিজের বাসায়ই ঘুমাবেন। এটাই আপনার স্লিপ স্টাডি। এটাও এখন ঢাকাতে হয়।

স্লিপ মেডিসিনে যদিও বেশ কিছু জটিল ব্যাপার আছে এবং এজন্য বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণ দরকার। কিন্তু অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ এপনিয়া ও সিপ্যাপ ট্রিটমেন্ট খুব সোজাসাপটা এবং বাংলাদেশে এর চিকিৎসা সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া উচিত।

আমি মনে করি, বাংলাদেশে সব মেডিসিন বিশেষজ্ঞেরই উচিত স্লিপ এপনিয়া চিকিৎসা দেয়া শুরু করা। এভাবেই প্রত্যেকটি কার্ডিওলজিস্টের চেম্বারে স্লিপ এপনিয়া স্ক্রিন করা উচিত, যেখানে ESS আর STOP-BANG কোশ্চেনিয়ারগুলোর বাংলা অনুবাদ সব রোগীকে পূরণ করতে বলা হবে।

দেশের সব মেডিসিন কারিকুলামে নাকডাকা রোগ খুব গুরুত্ব সহকারে পড়াতে হবে, যাতে প্রত্যেক এফসিপিএস মেডিসিন, এমডি মেডিসিন, কার্ডিওলজি, চেস্ট, নিউরোলজি, এমএসইনএনটি ইত্যাদিরা স্লিপ চিকিৎসা করতে সক্ষম হয়ে বের হন। সেই সঙ্গে এমবিবিএস কোর্সেও স্লিপ এপনিয়া অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
স্লিপ টেকনিশিয়ানদের একটা দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। এইচএসসি অথবা যেকোনো গ্রাজুয়েট ডিগ্রিধারী হলেই হবে। তারা বাড়ি গিয়ে গিয়ে হোম স্লিপ স্টাডি সেটাপ করবেন, সঠিক সাইজের মাস্ক ফিট করতে সহায্য করবেন। সুনির্দিষ্ট কোনো জায়গা থেকে স্লিপ টেস্টগুলোর ইন্টারপ্রিটেশনের ব্যবস্থা করা যায়।

আমি স্বপ্ন দেখি দেশের আনাচে কানাচে প্রতিটি ব্যস্ততম মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, কার্ডিওয়স্ট স্লিপ এপনিয়া স্ক্রিনিঙ করছেন ESS আর STOP-BANG questionnaire দিয়ে। আর প্রতিটি চেম্বারেই একজন স্লিপ টেকনিশিয়ান আছেন, যারা হোম স্লিপ টেস্টের ব্যবস্থা করছেন আর মেশিন সেটাপ/মাস্ক ফিটের ব্যবস্থা করছেন।

এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে দেশের ব্যবসায়ীদেরকেও। বাংলাদেশ পোটেনশিয়ালি সিপ্যাপ মেশিনের বিশাল বাজার। অন্তত এক কোটি রোগী সবচেয়ে কনজারভেটিভ এস্টিমেটে। রেসমেড কোম্পানির ডিলারশিপ এনে মেশিনের দাম কমিয়ে আনতে হবে। সিপ্যাপ মেশিনের বাজার বাংলাদেশে এখন সিটিসেল মনোপোলির আমলে মোবাইল ফোন ব্যবসার মতো। ১০০ গুণ বেশি দামে যন্ত্র বিক্রি হচ্ছে। সব শ্রেণীর রোগীদের মুক্তি দিতে কমদামের চাইনিজ মেশিন আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে।

আর একটা কথা,শিশুদের ও স্লিপ এপনিয়া হয়। এ ব্যাপারে সতকর্কতার জন্য শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা এগিয়ে আসবেন বলে আশা করি।

 

নাক ডাকা রোগে ঘটতে পারে প্রাণহানি!

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নাকের এলার্জিতে করণীয়

নাকের এলার্জিতে করণীয়

এলার্জিক রাইনাইটিস অথবা নাকের এলার্জি নাকের একটি এলার্জি জনিত সমস্যা যাতে নাকের…

পরিবারের কারও রক্ত নিলে যে রোগের শংকা!

পরিবারের কারও রক্ত নিলে যে রোগের শংকা!

রক্ত জীবন বাচায়,রক্তেই জীবন যায়।  হ্যাঁ, নিজ পরিবারের (বাবা, মা, সন্তান, ভাইবোন)…

মাথাব্যাথা হলেই মাইগ্রেন নয়

মাথাব্যাথা হলেই মাইগ্রেন নয়

মাথাব্যথা হলেই অনেকে মাইগ্রেন ভেবে নেন। এমন ধারণা আমাদের মধ্যে অনেকেরই আছে।…

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, সম্ভাব্য জটিলতা ও প্রতিকার

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, সম্ভাব্য জটিলতা ও প্রতিকার

গর্ভাবস্থায় যে কোনো সময়ে ডায়াবেটিস শুরু হলে বা প্রথমবারের মত ধরা পড়লে…

































জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর