ঢাকা      বৃহস্পতিবার ২১, মার্চ ২০১৯ - ৬, চৈত্র, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. সুরেশ তুলসান

সহকারী অধ্যাপক (সার্জারি), কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ।


মলাশয়ের ক্যান্সার: প্রয়োজন সচেতনতার

রেকটাল ক্যানসার বা মলাশয়ের ক্যান্সার বিষয়ে কিছু কথা বলার আগে কয়েকটি হৃদয়বিদারক ঘটনার অবতারণা করতে চাই।

ঘটনা–১

এক পঞ্চাশোর্ধ সহজ-সরল গ্রাম্য এক নারী। দুই মেয়েকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। ছেলেরা রাগ করে সঙ্গে আসেনি। কারণ, কিছুদিন পূর্বেই তারা মায়ের অপারেশন করিয়েছে অনেক টাকা পয়সা খরচ করে। রোগ ভালো না হলে তাদের কি দোষ? তারা বারবার অপারেশন করাতে পারবে না। 

বেশ মায়াই লাগছিল সব দেখে এবং শুনে।  বললাম, মা আপনার সমস্যাটা বলেন।

উত্তরে তিনি বললেন, তিন মাস হয়ে গেলো অপারেশন করিয়েছি। সমস্যা যেমন ছিল তেমনই আছে।  কিছুই ভালো হয়নি, বলতে গেলে একটু বেড়েছে।

বললাম, আপনার সমস্যাটা কি সেটাই তো আমাকে বললেন না এখনও। কি করে বুঝবো, আপনার কি সমস্যা ছিলো আর এখন কি অবস্থা?

তিনি উত্তর দিলেন, আজ দুই বছর ধরে রক্ত ভাঙছে। তিন মাস হলো অপারেশন করালাম। কিন্তু, যা ছিল তাই। এখনও আগের মতোই ভাঙছে। বরং, আগের চাইতে একটু বেশি।

আমি বললাম। রক্ত ভাঙছে ভাল কথা, কিন্তু কোন রাস্তা দিয়ে ভাঙছে? মাসিকের না পায়খানার রাস্তা দিয়ে?

রোগী উত্তর দিলেন, পায়খানার রাস্তা দিয়ে।

বললাম, আপনার রক্ত ভাঙছে পায়খানার রাস্তা দিয়ে। জরায়ুর অপারেশন করালেন কেন?

রোগী উত্তর দিলেন, গ্রামের সব মহিলারা বলাবলি করে, জরায়ুর অপারেশন করালে নাকি রক্ত ভাঙা সেরে (Cure) যায়।

আমাদের গ্রামেরই একজন। খুব ভালো মানুষ। বিপদে-আপদে ডাকলে কাছে পাওয়া যায়। সাথে করে নিয়ে যেয়ে অপারেশন করিয়ে দিয়েছে। দালাল কিনা জানি না। 

আমি বললাম, যে ডাক্তার আপনার অপারেশন করেছেন, তাকে বলেছিলেন কোন রাস্তা দিয়ে রক্ত ভাঙছে। 

রোগী বললেন, ডাক্তারকে বললাম রক্ত ভাঙছে। শুনে ডাক্তার বলেছেন, অপারেশন করলে ভালো হয়ে যাবে। তিনি তো জিজ্ঞেস করেননি কোন রাস্তা দিয়ে রক্ত ভাঙছে!

রোগীকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার কি মাসিক ঠিকমতো হয়? তিনি উত্তর দিলেন মাসিক তো আজ ৮-৯ বছর ধরে বন্ধ। তা সে কবে সেরে গেছে। 

বুঝলাম, মেনোপজ অনেকদিন।

আমি রোগীর অন্যান্য সব অসুবিধা শুনে মোটামুটি নিশ্চিত হলাম, মলাশয়ের ক্যান্সার।

এবার রোগীকে পরীক্ষা করার পালা। মলদ্বারে আঙ্গুল দিতেই আঙ্গুলের মাথায় অনেক বড় এডভান্সড ফিক্সড একটা গ্রোথ (টিউমার অর্থাৎ ক্যান্সার) পেলাম।  

একে তো ক্যান্সার, তার উপর বিনা প্রয়োজনে মেনোপজ পরবর্তীতে জরায়ু কাটার (Total abdominal hysterectomy) মতো এত বড় একটা অপারেশন, যেন মরার উপর খাড়ার ঘাঁ।

ঘটনা—২

ঘটনাটা প্রায় একই রকম। তবে এক্ষেত্রে রোগী অঘটন ঘটার পূর্বেই আমার কাছে এসে হাজির। তিনিও একজন মহিলা রোগী। বয়স ৪৩-৪৪ বৎসর হতে পারে। স্বামী ছেলেমেয়েসহ আমার চেম্বারে এসেছেন। হাতে আল্ট্রাসনোসহ অন্যান্য অনেকগুলো রিপোর্ট। 

হাসপাতালের ভর্তি টিকিট দেখে বুঝলাম, কিছু দিন পূর্বে হাসপাতালে হয়তো ভর্তিও ছিলেন। বললাম, হাসপাতালের টিকিট কেন বাড়িতে নিয়েছেন। এটা হাসপাতালের সম্পত্তি, বাড়িতে নেয়ার নিয়ম নাই। কি বুঝলেন, জানি না। তবে একগাল হাসি দিলেন।

জিজ্ঞাসা করলাম আপনার কি অসুবিধা?

প্রায় সমস্বরে সকলেই একসাথে বলে উঠলেন, জরায়ুতে ইনফেকশন, অপারেশন করা লাগবে। কুষ্টিয়ার একজন ডাক্তারের নাম বললেন, তিনি নাকি জরায়ুর অপারেশন করতে পরামর্শ দিয়েছেন। গতকাল অপারেশন করার কথা ছিল। ছেলে বড় ডাক্তার ছাড়া করাবেন না, তাই হয়নি।

আমি বললাম, জরায়ুতে ইনফেকশন হয়েছে ভালো কথা। আপনার কি কি শারীরিক অসুবিধা, সেটা আমাকে বলেন।

উত্তরে বললেন, জরায়ুতে ইনফেকশন ছাড়া উনার আর কোন অসুবিধা নাই। জরায়ুর অপারেশন করলেই ভালো হয়ে যাবেন।

রিপোর্টগুলো হাতে নিলাম, আলট্রাসনো রিপোর্টে Pelvic inflamtory disease- PID এবং রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কম। এছাড়া আর তেমন কিছু পজিটিভ ফাইন্ডিংস চোখে পড়লো না।

রোগীকে বললাম, ঔষধ লিখে দিচ্ছি, খান ভালো হয়ে যাবে। অপারেশন লাগবে না।

আবারও সকালে সমস্বরে সবাই বলে উঠলো, আমরা অপারেশন করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েই বাড়ি থেকে এসেছি। গতকালই অপারেশন হয়ে যেতো। ছোট ছেলের পরামর্শেই আপনার কাছে আসা।

বললাম, তাহলে VIA পরীক্ষা করে আসেন। আগামীকাল VIA-র রিপোর্ট দেখে তারপর কথা বলবো। সবাই নাছোড়বান্দা বান্দা। বললেন, VIA করা আছে রিপোর্ট নরমাল। আপনি আজই অপারেশন করে দিন। ছেলে ঢাকা যাবে। ওর ছুটি নাই।

মহাবিপদ। বললাম, অপারেশন করতে রাজি আছি। তবে, জরায়ুর ইনফেকশনের কথা ভুলে যান আর আপনার অসুবিধাগুলো আমাকে ভালো করে বলতে হবে।

বললাম, আপনি তো একেবারেই রক্তশূন্য, আপনার কি মাসিক অনিয়মিত বা বেশি হয়? উত্তর দিলেন, মাসিক স্বাভাবিক।

আপনার আর কোনো অসুবিধা আছে কি? বললেন, শরীরে ব্যথা। (শরীর বলতে আমাদের এই অঞ্চলে সাধারণত External Genitalia কে বোঝানো হয়)।

এছাড়া আর কি কি সমস্যা আপনার? আর আপনি এর রক্তশূন্যই বা কেন?

তখন উত্তর দিলেন, গত কয়েক বছর ধরে প্রতিদিন আমাকে ২০-২৫ বার পায়খানায় যেতে হয়। পায়খানা আসে না, শুধু আম আসে। আর আমের সঙ্গে অল্পস্বল্প বদরক্ত যায়।  

তবে তাতে আমার খুব একটা অসুবিধা হয় না। এটা আমার অনেক পুরাতন আমাশা। তাই আপনাকে বলা হয়নি। মাঝেমাঝে একটা-দুটা এমোডিস বড়ি খেলেই কমে যায়।

মেজাজটা বিগড়ে টক হয়ে গেল। বহু কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলাম। তাকে বললাম, মেডিকেলের ভাষায় আপনার রোগটিকে বলে, Spurious diarrhoea বা নকল ডায়রিয়া।
 
পরে তাকে পরীক্ষা করা শুরু করলাম। গুরুতর রক্তশূন্য। রিপোর্টে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ যা আছে তার অর্ধেকেরও নিচে হবে হয়তো। 4gm/dl এর কম ছাড়া বেশি হওয়ার কথা না।

মলদ্বারে আঙ্গুল দিয়ে পরীক্ষা করলাম। যথারীতি যা নিয়ে আশঙ্কায় ছিলাম, মলাশয়ের ক্যান্সার।!
যথেষ্ট এডভান্সড স্টেজ। Sacrum এর সাথে fixed.

মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলাম। ফাঁদেপড়া বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য।

ঘটনা—৩

একজন পুরুষ রোগী। বয়স বায়ান্নো বৎসর। ভারি শরীর। স্বাস্থ্য আরও ভালো ছিল। গত ছয় মাসে ওজন কমেছে বেশ খানিকটা।

জিজ্ঞাসা করলাম সমস্যা কি? উত্তর দিলেন, পাইলসের সমস্যা ছিল। অর্শ গেজ ভগন্দর চিকিৎসালয়ে গিয়েছিলেন ৪ মাস পূর্বে। ওরা কি যেনো একটা মলমের মতো কিছু মলদ্বারে লাগিয়ে দেয়। তারপর সম্পূর্ণ মলদ্বারে পুড়ে দগদগে ঘা। ৪ মাসে ঘা শুকিয়েছে ঠিকই, তবে মলদ্বার সরু হয়ে প্রায় একেবারেই বুজে (বন্ধ হয়ে যাওয়া) গেছে।

রোগীর কবিরাজি চিকিৎসা পূর্ববর্তী সমস্যার কথা শুনে মনে হলো না যে তার পাইলস বা HEMORRHOID ছিল।

মলদ্বার পরীক্ষা করে দেখলাম। চামড়া পুড়ে একেবারে এবড়োখেবড়ো হয়ে গেছে। মলদ্বারে আঙ্গুল দেয়ার চেষ্টা করলাম। মলদ্বার বলতে ছোট্ট একটা ছিদ্র। আমরা কেনো আঙ্গুলের (কনিষ্ঠ তর্জনী) মাথাও ভিতরে প্রবেশ করাতে পারলাম না। এরকম অবস্থাকে আমরা বলি Severe anal stenosis.

রোগীকে বললাম, Anoplasty নামক একটি অপারেশন করে মলদ্বার ঠিক করতে হবে।

আগে থেকেই সন্দেহ ছিল। Anoplasty অপারেশন করার সময় মলদ্বারের ভিতরে আঙ্গুল দিয়ে এবং PORCTOSCOPY করে দেখলাম মলাশয়ের ক্যান্সার এবং যথারীতি বেশ এডভান্সড।

এক্ষেত্রে রোগীর কি কি ক্ষতি হলো হিসাব করা যাক।

১. একজন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর মলদ্বার কবিরাজি মলমের অন্তরালে এসিড দিয়ে পোড়ানো হলো।
২. রোগীর ক্যান্সারের মূল চিকিৎসার জন্য দেরি হওয়ায় ক্যান্সার শরীরে ছড়িয়ে যাওয়া।

৩. চিকিৎসাটা জটিল ও ব্যয়বহুল হওয়া এবং চিকিৎসার ফলাফলে এর বিরূপ প্রভাব।

৪. মলদ্বার পুড়ে যাওয়ায় ক্যান্সারের জন্য প্রয়োজনীয় অপারেশনটা আরও কঠিন হয়ে গেলো।

৫. আর্থিক ক্ষতি, এই টাকাগুলো তিনি ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যয় করতে পারতেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নিজ দেশের দেবী শেঠিদের ক’জন চেনেন!

নিজ দেশের দেবী শেঠিদের ক’জন চেনেন!

আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষই ভারতের প্রখ্যাত হার্ট সার্জন ডা. দেবীপ্রসাদ শেঠি…

বিবেক স্খলনের বলি যখন দেবশিশু

বিবেক স্খলনের বলি যখন দেবশিশু

বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে দূর্ঘটনাবশতঃ সন্তানের আগমন অতঃপর তাকে সবার অলক্ষ্যে জন্মদান এবং…

ডাক্তারদের নিয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো বাণিজ্য ফাঁদ

ডাক্তারদের নিয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো বাণিজ্য ফাঁদ

মাইজদীর এক ক্লিনিকে সিজারের বিল ৪৮ হাজার টাকা। এইবার জনগনের বিষোদগার ডাক্তাদের…

ঘুম সমন্ধে যে তথ্যগুলো আপনি জানেন না!

ঘুম সমন্ধে যে তথ্যগুলো আপনি জানেন না!

গতকাল পালিত হয়ে গেলো বিশ্ব ঘুম দিবস। এই দিবসে যারা আমার মতো…

গরিবের হার্ট অ্যাটাক এবং তার চিকিৎসা

গরিবের হার্ট অ্যাটাক এবং তার চিকিৎসা

পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত মৃত্যুর এক নম্বর কারণ হলো হার্ট এ্যাটাক। এর ভয়াবহতা…

সরকারি হাসপাতালের নিত্যদিনের গল্প

সরকারি হাসপাতালের নিত্যদিনের গল্প

দিন শেষে রোগী চরম বিরক্ত। কারণ সিট না পাওয়ায় তার স্থান হয়েছে…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর