ঢাকা      বৃহস্পতিবার ২১, মার্চ ২০১৯ - ৬, চৈত্র, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. ওমিদ খান

সিনিয়র ক্লিনিকাল ফেলো,
রয়্যাল উলভারহ্যাম্পটন এনএইচএস ট্রাস্ট, ইংল্যান্ড।


ব্রিটেনের স্বাস্থ্যসেবা বনাম বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবা

আজকাল অনেকেই কথায় কথায় বাংলাদেশের সাথে অন্যান্য দেশের চিকিৎসা সেবার তুলনা করেন। না জেনেই ছাড়া ছাড়া কিছু তথ্য দিয়ে প্রমান করতে চান বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবা সেই দেশের থেকে ভাল অথবা খারাপ। দেশে সরকারী/বেসরকারী হাসপাতাল, আর দেশের বাইরে (UK) ডাক্তার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা বলব। UK নিয়ে অপেক্ষাকৃত একটু বেশী বলব, কারন আমাদের বেশীরভাগেরই UK এর হেলথকেয়ার নিয়ে ধারনা কম।প্রথমত, ডাক্তারদেরকে বলতে চাই দুই জায়গাতেই কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকলে আপনি আপনার বায়াসড ওপিনিয়ন দিচ্ছেন। এর ওর কাছে শোনা কথা আপনি সোশ্যাল মিডিয়াতে ট্রানসমিট করছেন যেটা কিছুটা হলুদ সাংবাদিকতার মতই।

দ্বিতীয়ত, Healthcare(স্বাস্থ্যসেবা) আর Treatment(চিকিৎসা) দেয়ার মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। চিকিৎসা, স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার একটা অংশমাত্র। এই কনসেপ্ট বোঝাটা জরুরী।

ব্রিটেনে “স্বাস্থ্যসেবা” দেয় সরকারী প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে প্রতিষ্ঠিত এই সরকারী প্রতিষ্ঠানটা বিশ্বের প্রথম ইউনিভার্সাল হেলথকেয়ার সিস্টেম। জনবল এর সংখ্যার দিক দিয়ে এই প্রতিষ্ঠান সরকারী/বেসরকারী প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে বিশ্বে পাঁচ নম্বর। উপরে আছে শুধু আমেরিকান আর্মি, চাইনিজ আর্মি, ওয়ালমার্ট এবং ম্যাকডোনাল্ডস।

এই বিশাল জনবলের খুব ছোট একটা অংশ ডাক্তার। আর এখানে সব ডাক্তারকে শুধু চিকিৎসা দেয়ার বাইরেও অডিট, রিসার্চ, টিচিং, কোয়ালিটি ইম্প্রুভমেন্ট, ম্যানেজমেন্ট, লিডারশীপ, গভার্নেন্স ইত্যাদি নিয়ে কাজ করতে হয়। আর চিকিৎসা দেয়ার আগে রোগীর সামগ্রীক ওয়েলবিয়িং নিয়ে চিন্তা করতে হয় শুধু রোগের চিকিৎসা নিয়ে না।

NHS এর ফাউন্ডিং প্রিন্সিপাল- “Services should be comprehensive, universal and free at the point of delivery”।

মানে ব্রিটেনে বসবাসরত সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা ফ্রি, আর স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে সবার অধিকার সমান। সবাইকে সমান চোখে দেখলে আপনি সবার সবরকম স্বাস্থ্য সমস্যার সাথে সাথে সমাধান করতে পারবেন না। এটাই বাস্তবতা। তাই শুধু মাত্র ইমারজেন্সি রোগের চিকিৎসা আপনি সাথে সাথে পাবেন। অন্যসব ক্রনিক (নন-ইমারজেন্সি) রোগের চিকিৎসার জন্য আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে (যদিও অপেক্ষারত অবস্থায় আপনার যেন কোন রকম অসুবিধা না হয় সেই খেয়াল রাখা হয়)। আপনি যতবড় রাজনীতিবিদ, টাকা-পয়সার মালিক বা আপনার পরিবারে যতজনই ডাক্তার থাকুক, আপনাকে আর সবারমতই অপেক্ষায় থাকতে হবে NHS এর সার্ভিস নেয়ার জন্য (কোন কোন ক্ষেত্রে কয়েক মাস)। আর এই সার্ভিসে শুধুমাত্র চিকিৎসা দেয়া হয়না, শারিরীক আর মানসিকভাবে ভাল থাকার সব ব্যাবস্থা করা হয়।

আপাতদৃষ্টিতে কিছু কিছু রোগীর দৃষ্টিকোন থেকে অপেক্ষার ব্যাপারটা বিরক্তিকর মনে হলেও সামগ্রীক সামাজিক দিক বিবেচনায় বিনামূল্যে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করার জন্য এই মডেল সর্বজনগৃহীত। আর অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডাও পরে কিছুটা এই মডেল অনুসারে তাদের স্বাস্থ্যসেবা সাজায়।

ব্রিটেনে স্বাস্থ্যসেবা পুরাটাই সরকারী, বেসরকারী হাসপাতাল হাতে গোনা, অঢেল সম্পত্তির মালিক না হলে সেগুলোতে যাওয়া কঠিন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা সরকারীর চেয়ে অনেক বেশী। স্বাস্থ্যসেবা বলতে বাংলাদেশে কিছু নাই, আছে শুধুই চিকিৎসাসেবা। দুঃক্ষজনক হলেও সত্য দেশের নীতিনির্ধারকরা এবং শতকরা ৯৯ শতাংশ ডাক্তাররাও স্বাস্থ্যসেবা বলতে শুধুমাত্র চিকিৎসাই বুঝে। আর শুধুমাত্র ডাক্তারের একার পক্ষে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য সেবা দেয়া সম্ভবও না।

যদি আপনার পকেটে অল্পকিছু টাকা থাকে, আপনার যদি মনে হয় আপনার ক্রনিক রোগের চিকিৎসা আপনার বাসার সামনের রিকশাচালক এর থেকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ কারণ আপনার জীবনের মূল্য তার থেকে বেশী। আর সরকারী হাসপাতালের আউটডোরে তথাকথিত গরীব রিক্সাচালকের সাথে আপনি লাইনে দাড়াবেন না, তাহলে বাংলাদেশ আপনার জন্য খুব চমৎকার একটা জায়গা।

উন্নতবিশ্বের তুলনায় (বেসরকারী ভাবে) নামমাত্র মূল্যে ভাল ডাক্তারের কন্সালটেশান পাবেন খুব জলদি আর সহজে। দামী দামী পরীক্ষা করতে পারবেন খুব জলদি আর অপেক্ষাকৃত কম খরচে।

শুধুমাত্র কষ্ট করে ভাল ডাক্তার খুঁজে বের করতে হবে, যা মানহীন মেডিকেল কলেজ তৈরীর হাস্যকর সরকারী নীতি আর দূর্বল পোস্টগ্র্যাড ট্রেনিং এর কারনে দিন দিন অনেক কঠিন একটা কাজ হয়ে যাচ্ছে। তাও শুধুমাত্র ডাক্তার দেখানোর জন্য দেশের বাইরে পাড়ি দেয়া হাস্যকর, এখনো দেশে অনেক ভাল ডাক্তার আছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সাফল্য আছে, ব্যর্থতাও আছে, যা শুধুই বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সবকিছু লিখে শেষ করা যাবেনা।

এত কথা বলার উদ্দেশ্য ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া আর কানাডার “স্বাস্থ্যসেবাকে” বাংলাদেশের “চিকিৎসাসেবার” সাথে তুলনা না করা। সবার স্বাস্থ্যসেবার মডেল আলাদা, সব দেশ স্বাস্থ্যকে এক দৃষ্টিতে দেখে না।

 

আরও পড়ুন

হাসপাতালেই ডাক্তারদের প্রাইভেট প্রাকটিস: প্রধানমন্ত্রী

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্যাম্পল ঔষধের কিছু ক্ষতিকর দিক!

স্যাম্পল ঔষধের কিছু ক্ষতিকর দিক!

টক'-শো তে তো কতো লোকে কত কথাই বলে। ওষুধের স্যাম্পল নাকি ডাক্তারদেরকেই…

প্রাইভেট প্রাকটিস: প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পরিবর্তনে আশাবাদী চিকিৎসকরা

প্রাইভেট প্রাকটিস: প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পরিবর্তনে আশাবাদী চিকিৎসকরা

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কেবল হাসপাতালের এক কর্নারে সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্রাকটিস গড়ে উঠলে ও…

ইরানে যেভাবে কিডনি দিবস পালিত হয়

ইরানে যেভাবে কিডনি দিবস পালিত হয়

বিশ্ব কিডনি দিবস বাংলাদেশে কিভাবে পালিত হলো তা নিয়ে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর দিকে…

সড়কে মৃত্যু মিছিল: রক্ষা পাওয়ার উপায়

সড়কে মৃত্যু মিছিল: রক্ষা পাওয়ার উপায়

সেনেগাল, গাম্বিয়ার মত আফ্রিকান দেশে যখন বাস, মিনিবাস একটা সুন্দর সিস্টেমে চলে,…

বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস: চাই সুষ্ঠ সমন্বয়

বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস: চাই সুষ্ঠ সমন্বয়

ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাধীনভাবে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ ও মানুষের সেবা করার এক প্রাচীনতম প্রতিযোগিতাপূর্ণ…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর