ঢাকা      বুধবার ২২, মে ২০১৯ - ৮, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ - হিজরী



আহমাদ যোবায়ের

পিএইচডি স্টুডেন্ট,

সেলচুক ইউনিভার্সিটি, তুরস্ক।


দেশের বাইরে চিকিৎসা অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশের বাস্তবতা

দেশে থাকাকালীন মাঝে মাঝেই কোমরে ব্যথা হতো। ভারি কিছু উঠানামা বা টানাটানি করলে ব্যথা বেড়ে যেত। আবার দুই-তিন দিন পর এমনিতেই ভাল হয়ে যেত। এই সমস্যার জন্য কখনো কোন চিকিৎসক দেখাইনি।

তুরস্কে আসার পর গতমাসে আবার সেই ব্যথা অনুভব করলাম। এবার ব্যথার তীব্রতা আগের চেয়ে বেশি। সাথে জ্বরও উঠল। তবুও ডাক্তার দেখালাম না। ২ দিন পর জ্বর নেমে গেল। কিন্তু কোমরে ব্যথা থেকে গেল। কয়েকদিন অপেক্ষা করলাম। ব্যথা কমলো না। নিজের দেশ থেকে সাত সমুদ্র তের নদী দূরে থাকি, তাই এবার কোন ঝুঁকি নিলাম না। গেলাম ডাক্তার দেখাতে। সাথে ছিল বাংলাদেশি ছোটভাই রাকিব। স্কলারশিপপ্রাপ্ত ছাত্র হিসেবে হেলথ ইনস্যুরেন্স থাকায় এখানে আমাদের চিকিৎসা সম্পূর্ণ ফ্রি। তাই ডাক্তার দেখাতে টাকা-পয়সার ভয় ছিল না।

প্রথমে দেখলেন ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের একজন চিকিৎসক। ব্যথার বর্ণনা শুনে তিনি এক্স-রে এবং বেশ কিছু ব্লাড টেস্ট করতে দিলেন। কিন্তু কোনো ঔষধ দিলেন না। প্রথম হোঁচট খেলাম। দেশের কোন ডাক্তার এমন করলে নিশ্চিত ভাবতাম, ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কমিশন খাবার জন্য এতোগুলো টেস্ট ধরিয়ে দিয়েছে। কোনো ওষুধই দিল না, অন্তত ব্যথা কমার ওষুধ তো দিতে পারতো!

যাক, আমার যেহেতু টেস্ট করতে কোনো টাকা লাগছে না তাই আপত্তিরও কিছু নেই। টেস্ট করলাম। সব রোগীর জন্য একটি নির্দিষ্ট আইডি আছে। রিপোর্ট কম্পিউটার সিস্টেমে আমার আইডিতে জমা থাকবে। পরের দিন আবার গেলাম ডাক্তারের কাছে। এবার তিনি কম্পিউটারে আমার আইডিতে ঢুকে আমার রিপোর্ট দেখে প্রিন্ট দিলেন। ভিটামিন ডি থ্রি-র লেভেল একেবারেই কমে গেছে। ক্রিয়েটিনের লেভেল সামান্য বেড়ে গেছে। আরো ২-৩টা ইন্ডিকেটর নরমাল রেঞ্জের চেয়ে কম-বেশি ছিল।

ভাবলাম, এবার বুঝি ডাক্তার সাহেব ওষুধ লিখবেন। ওমা! তিনি কাগজে একটি পাসওয়ার্ড লিখে দিলেন। এই কাগজ ফার্মেসিতে নিয়ে গেলে ওষুধ দিবে। আলাদা করে কোন প্রেসক্রিপশন আমাদের দিবেন না। এটাই না-কি সিস্টেম। টেস্টের রিপোর্ট এবং প্রেসক্রিপশন কম্পিউটারের সিস্টেমে আমার আইডিতে জমা থাকবে। শুধু ডাক্তাররাই সেটা দেখতে পারবেন।

প্রথমে অদ্ভুত মনে হলেও পরে বুঝলাম এই সিস্টেমটাই ভালো। বাংলাদেশে হলে তো আমরা এই প্রেসক্রিপশন আর টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে আরো দশ জায়গায় গিয়ে ভেরিফাই করতাম এবং আরো কনফিউজড হতাম।

প্রথম ডাক্তার সাহেব আমাকে নেফ্রোলজি ও রিউম্যাটোলজির ডাক্তার দেখাতে বললেন। এবার গেলাম নেফ্রোলজি বা কিডনি বিভাগের ডাক্তারের কাছে। ক্রিয়েটিনিন লেভেল বেড়ে যাওয়ায় তার কাছে আসা। তিনিও কোন ওষুধ দিলেন না। হাতে ধরিয়ে দিলেন আলট্রাসনোগ্রাফি ও কয়েক ধরনের ব্লাড টেস্ট। ওইদিকে রিউম্যাটোলজির ডাক্তারও কিছু ব্লাড টেস্ট দিলেন। টেস্টের পরের দিন রিপোর্ট অটোমেটিক্যালি সিস্টেমে চলে আসে।

সব টেস্ট করা হলো। কিন্তু আলট্রাসনোগ্রাফির তারিখ পড়লো প্রায় ২ সপ্তাহ পর। এখানে কেবল ইমার্জেন্সি রোগীদেরকেই সিরিয়ালবিহীন চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। আর বাকিদের সব কিছুই সিরিয়ালি। ঘুষ দিয়ে সিরিয়াল আগানোর কোন সিস্টেম নেই।

তবে পরের দিন রিউম্যাটোলজির ডাক্তারের চেম্বারে গেলাম দেখা করতে। অ্যাসিস্টেন্টকে বললাম, আমাদের ক্লাস আছে। তিনি তাড়াতাড়ি দেখানোর ব্যবস্থা করে দিলেন। ঘুষ চাইলেন না। ডাক্তার এবার রিপোর্ট দেখে আর রোগের বর্ণনা শুনে একই ব্লাড টেস্ট পরের সপ্তাহে করতে বললেন। কারণ, ইনডিকেটরগুলো না-কি পরিবর্তন হতে পারে।

আমাদের দেশের ডাক্তার হলে এমন সাহস করতেন কি-না, বলতে পারছি না। কারণ, রোগী মনে করতেন খামোখা আবার টাকা খরচ আর ডাক্তার কমিশন খাবেন।

পরের সপ্তাহে ব্লাড টেস্ট রিপোর্টে সব কিছু নরমাল আসলো। রিউম্যাটোলজির ডাক্তার এবার একটি ওষুধ দিলেন। আর বললেন, আল্ট্রাসনোগ্রাফির পর আবার যেন দেখা করি।

ওষুধের পাসওয়ার্ড পেয়ে মহাখুশি আমি দ্রুত ফার্মেসিতে গেলাম। তবে আমার খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কারণ ওষুধটি ছিল আমাদের দেশের অতি পরিচিত প্যারাসিটামল।

যাক, আলট্রাসনোগ্রাফি করার পর আবার নেফ্রোলজির ডাক্তারের কাছে গেলাম। তিনি সিস্টেমে রিপোর্ট দেখে এবার আরো কিছু ব্লাড টেস্ট ও ইউরিন টেস্ট দিলেন। কোন ডাক্তারই তেমন কোন কাউন্সেলিং করলেন না। কী করা যাবে, কী করা যাবে না, কিছুই বললেন না। চেম্বার থেকে বের হয়ে রাকিবকে বললাম, গত সপ্তাহে তো ব্লাড টেস্ট করলাম, আবার কেন? ও বললো, ভাই এখানে তারা নিশ্চিত না হয়ে কোন ঔষধ দেবেন না। আমাদের দেশে হলে এই তিন ডাক্তারের নামে এতক্ষণে ফেসবুকে কসাই-টসাই রব উঠে যেতো।

সব মিলিয়ে গত তিন সপ্তাহে কেবল ১৫ সিরিঞ্জ রক্ত দিলাম টেস্টের জন্য। একবার ইউরিন টেস্ট, একবার দুই পাশের এক্স-রে, একবার আল্ট্রাসনোগ্রাফি টেস্ট করতে হলো।

যাক, এবার সব টেস্টের রিপোর্টই নরমাল এসেছে। তবে কোমরে ব্যথা এখনো উঠা-নামা করছে। ওষুধও চলছে।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে ল্যাবটেস্ট রোগ নির্ণয়ের একটা বড় হাতিয়ার। আমার মনে হয়, আমাদের দেশের ডাক্তাররা এই হাতিয়ার পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারেন না। কারণ, তাদেরকে নিয়ে ক্রমাগত নেতিবাচক প্রচার চলে। টেস্ট বেশি দিলেই ডাক্তারের ১৪ গোষ্ঠী উদ্ধারের প্রবণতা। নিজেদের ভালোর জন্যই আমাদের এসব প্র্যাকটিস কমানো উচিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

৩৯তম বিসিএসের নন-ক্যাডারদের দাবি, বিপক্ষ মতের যুক্তিখণ্ডন

৩৯তম বিসিএসের নন-ক্যাডারদের দাবি, বিপক্ষ মতের যুক্তিখণ্ডন

যুক্তি-১ বিপক্ষ মতের কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, একসঙ্গে এত চিকিৎসক নিয়োগের…

‘প্রধানমন্ত্রীর স্বদিচ্ছা সত্ত্বেও নিয়োগবঞ্চিত নন-ক্যাডার চিকিৎসকরা’

‘প্রধানমন্ত্রীর স্বদিচ্ছা সত্ত্বেও নিয়োগবঞ্চিত নন-ক্যাডার চিকিৎসকরা’

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার আগের দুই মেয়াদে আওয়ামী…

নিরাপত্তাহীনতায় কর্মস্থল বদল

নিরাপত্তাহীনতায় কর্মস্থল বদল

যায় দিন ভাল, আসে দিন খারাপ! জানি না আর কি কি খারাপ…

শিশুদের উচ্চ রক্তচাপঃ এক অবহেলিত অধ্যায়

শিশুদের উচ্চ রক্তচাপঃ এক অবহেলিত অধ্যায়

শিশুদের রক্তচাপ মাপতে গেলেই রোগীর বাবা-মা সবসময়ই যে প্রশ্নটি করেন সেটি হল…

দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার বাস্তবতা ও আমার কিছু অভিজ্ঞতা

দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার বাস্তবতা ও আমার কিছু অভিজ্ঞতা

আমার মা ২ সপ্তাহ আগে মারা গেছেন। উনি গত আড়াই বছর ধরে…

চিকিৎসক জীবনের সবচেয়ে মধুর সম্বোধন!

চিকিৎসক জীবনের সবচেয়ে মধুর সম্বোধন!

খবর: ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করায় সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) সঞ্চিতা…























জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর