ঢাকা      বৃহস্পতিবার ২১, মার্চ ২০১৯ - ৬, চৈত্র, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. আব্দুন নূর তূষার

ঢাকা মেডিকেল কলেজ

মিডিয়া ব্যক্তিত্ব


ওবায়দুল কাদের ও দেবী শেঠি বিতর্ক: আমার কিছু কথা

দেশের সব রোগী বিদেশে চিকিৎসা নেয় না। তারা সবাই ভিআইপিও নয়। কারো সামর্থ্য নাই, কারো বা ক্ষমতা নাই। আমাদের অনেকের প্রিয় একজন মানুষ ওবায়দুল কাদেরের দেশে বা বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে যারা বেশ কিছুদিন ধরে তর্ক বিতর্ক করছেন তাদের মধ্যে চিকিৎসকরাও আছেন।

১. তিনি কেন বিদেশে যাবেন?

কেন যাবেন না? বাংলাদেশে রোগীর অবনতি হলে বা মৃত্যু হলে ডাক্তার প্রহার করা হয়। কোন কিছু না জেনে নানারকমভাবে চিকিৎসকদের সমালোচনা করা হয়। তিনি বিদেশে গিয়ে বরং চিকিৎসকদের বাঁচিয়ে দিয়েছেন।

এখন তিনি বাংলাদেশের চিকিৎসকদের সেবায় বেঁচে ছিলেন এবং উন্নতি করেছেন বলে বিদেশে যেতে পেরেছেন। তবে এই একই অবস্থায় বহু রোগী হাসপাতালে আসেন এবং সকল চেষ্টা সত্ত্বেও অনেকসময় বাঁচেন না। কারন চিকিৎসা সঠিক হলেও সকলের শরীর চিকিৎসায় একইভাবে সাড়া দেয় না। যদি কাদের ভাই সেদিন আল্লাহর অশেষ কৃপায় বেঁচে না উঠতেন, তখন আপনারা কি বলতেন? তখন সকল চিকিৎসা সঠিক হলেও বলতেন, বাংলাদেশের ডাক্তার ভালো না।

২. তিনি ভিআইপি

অবশ্যই তিনি ভিআইপি। দেশের সবচেয়ে বড় দলের সাধারন সম্পাদক, মন্ত্রী, একসময়ের ছাত্রনেতা। তার চিকিৎসা দেশে বিদেশে যে কোনখানে হতে পারে এবং এই সিদ্ধান্ত তার পরিবার, তার প্রিয়জনেরা এবং তার দলের সভাপতি ও নেতৃবৃন্দরা মিলে নিতেই পারেন।

৩. দেবী শেঠি কেন এলেন?

অরুন্ধতি রায় কেন আসে? ভিএস নাইপল কেন আসে? শাবানা আজমি কেন আসে? অমর্ত্য সেন কেন আসে? সেমিনার সিম্পোজিয়ামে রাজ্যের বিদেশীরা যখন আসে, তখন কি আমাদের বুদ্ধিজীবীদের মানহীন অপদার্থ বলে মনে হয় আপনাদের? মনে হয় তারা সত্য বলতে পারেন না বা তাদের লেখা বা কথা অকার্যকর? দেবি শেঠি এসে যখন বলেছেন এর চেয়ে ভালো চিকিৎসা কোথাও হতো না, তখনো আপনাদের মনে হচ্ছে না যে দেশের চিকিৎসকরা ভালো চিকিৎসা করতে পারেন?

এবার আমার কথা বলি:

১. দেশের চিকিৎসকরা এরকম লাখ লাখ রোগীর চিকিৎসা করেন এবং তারা সুস্থও হন।

২. বাংলাদেশে কেবল এক বছরে ঢাকা মেডিকেল কলেজে আউটডোরে যে চিকিৎসা দেয় হয়, পৃথিবীর বহু দেশে সারা বছরে সব হাসপাতাল মিলেও তত লোকের চিকিৎসা হয় না।

৩. ঢাকা মেডিকেল বার্ন ইউনিটে দুদিন আগেও ৫৩৭ জন রোগী ছিল যেখানে বেডের সংখ্যা ৩০০। বাকি ২৩৭ জন কোথায় থাকে আর ঘুমায়? হাসপাতালের সকল সুবিধা , চিকিৎসকের সংখ্যা সবই কিন্তু ৩০০ লোকের জন্য। তারমানে প্রতিটি ডাক্তার প্রায় দ্বিগুন লোককে সেবা দিচ্ছেন । তার মানে ৮ ঘন্টায় ১৬ ঘন্টার কাজ করছেন।

৪. চিকিৎসকদের নিরাপত্তা দেয়ার কোন লোক নাই। যখন তখন যে কেউ তার হাসপাতালে প্রবেশ করতে পারে এবং রোগীর আত্মীয়রা লিফটে উঠতে না পারলে সেই কারনে তাকে মারতে পারে। সরকারী চাকুরীতে কর্মরত সকল কর্মকর্তার নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের। এমনতো নয় যে সরকারী চাকুরীতে যারা আছেন সবাই ভালো, কেবল ডাক্তাররা খারাপ? তাহলে অন্য চাকুরীজিবীরা কেউ কেউ যদি কোন অন্যায় করেন, তাহলে তাদের গায়ে মানুষ হাত তুলতে পারে?

৫. ডাক্তারদের এই দুর্দশার জন্য দায়ী তারা নিজেরাই। তাদের সংগঠনগুলি রাজনৈতিক নেতা তৈরীর মঞ্চ। তারা নিজেদের পেশার মানুষের জন্য দেনদরবার না করে নিজেরা এমপি, ডিরেক্টর, ভিসি, প্রিন্সিপাল হবার জন্য তদবির করেন। চিকিৎসক কেন গাড়ী কেনার সরকারী সহায়তা বা ধার পাবে না? কেন সরকার তাকে একটা স্টেথো দেয় না, দেয় না নিজের নামে ছাপানো একটা কার্ড? কেন তাকে ব্যবস্থাপত্র লিখতে হয় চিরকুট সাইজের কাগজের টুকরোতে, যেখানে এক লাইনে অনেক ওষুধের নামও লেখা যায় না? চিকিৎসকদের কেন ভ্রমন কাহিনী লিখে পুরষ্কার পেতে হয়? কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর গ্রেড ১ আর চিকিৎসাবিদ্যার প্রফেসর গ্রেড ৩? এই প্রশ্ন করেছেন কোনদিন নেতাদের?

মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ভালো চিকিৎসা করে সেটা বোঝাতে ”দেব দেবী” হাজির করতে হয় কেন? হয় কারন নিজেরা দেবতার আসনে না গিয়ে অনুগ্রহভাজন হবার প্রতিযোগিতা করছেন।

আমি সরকারী চাকুরী করি না। ডাক্তারদের সুবিধা নিয়ে কথা বলি কারন আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজের গর্বিত একজন ছাত্র । আমি সারাজীবন চ্যারিটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। এখনো করি।

আমি বলি, কারন আমি হতাশ হই যখন দেখি, দেশের ১৬ কোটি মানুষ যখন এই চিকিৎসকদের সেবাতেই প্রতিনিয়ত ভালো থাকছেন তখন গুটিকয়েক লোকের জন্য চিকিৎসক সমাজ তার মর্যাদার সংকটে ভোগে।

আপনাদের চিকিৎসা যে ভালো হয় সেটা প্রমান করার জন্য কাদের ভাই কেবল একা নন, কোটি কোটি মানুষ স্বাক্ষী।

দয়া করে কাদের ভাইকে উদাহরন বানিয়ে বারবার পোস্ট দিয়ে নিজেদের হেয় করবেন না। কাদের ভাইয়ের সুস্থতার জন্য বরং দোয়া করেন। আল্লাহ তাঁকে সুস্থ করে আপনাদের জন্য আত্মগৌরবের সুযোগ দিয়েছেন, এজন্য কাদের ভাইকে ধন্যবাদ দিন যে তিনি নেতার মতোই কাজ করেছেন, সরকারী হাসপাতালে গেছেন। কোন ”একতাবদ্ধ” বা ”চতুষ্কোন” বা ”গ্রীকদেবতা” হাসপাতালে যান নাই। আর আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন। কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে সবাই ফেরে না। আল্লাহ তাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন । আলহামদুলিল্লাহ।

যদি তিনি না ফিরতেন তবে যারা পোষ্ট দিচ্ছেন তাদের অনেকেই হাসপাতালে থাকতেন এখন, রোগী হিসেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্যাম্পল ঔষধের কিছু ক্ষতিকর দিক!

স্যাম্পল ঔষধের কিছু ক্ষতিকর দিক!

টক'-শো তে তো কতো লোকে কত কথাই বলে। ওষুধের স্যাম্পল নাকি ডাক্তারদেরকেই…

প্রাইভেট প্রাকটিস: প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পরিবর্তনে আশাবাদী চিকিৎসকরা

প্রাইভেট প্রাকটিস: প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পরিবর্তনে আশাবাদী চিকিৎসকরা

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কেবল হাসপাতালের এক কর্নারে সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্রাকটিস গড়ে উঠলে ও…

ইরানে যেভাবে কিডনি দিবস পালিত হয়

ইরানে যেভাবে কিডনি দিবস পালিত হয়

বিশ্ব কিডনি দিবস বাংলাদেশে কিভাবে পালিত হলো তা নিয়ে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর দিকে…

সড়কে মৃত্যু মিছিল: রক্ষা পাওয়ার উপায়

সড়কে মৃত্যু মিছিল: রক্ষা পাওয়ার উপায়

সেনেগাল, গাম্বিয়ার মত আফ্রিকান দেশে যখন বাস, মিনিবাস একটা সুন্দর সিস্টেমে চলে,…

বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস: চাই সুষ্ঠ সমন্বয়

বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস: চাই সুষ্ঠ সমন্বয়

ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাধীনভাবে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ ও মানুষের সেবা করার এক প্রাচীনতম প্রতিযোগিতাপূর্ণ…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর