ঢাকা      বৃহস্পতিবার ১৮, জুলাই ২০১৯ - ৩, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ওয়াহিদ হৃদয়

শিক্ষার্থী,
প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ মেডিকেল কলেজ।


জীবন্ত কিংবদন্তী ডা. আবুল মনসুর স্যারের গল্প

‘বাবারা শোন, Distilled Water কেউ খায় না। মানুষ Mineral Water খায়। তাই শতভাগ সৎ থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু যতটুকু না করলেই নয় তার চেয়ে বেশি অসৎ হয়ো না। নিজের কাছে নিজে সৎ থাকো, এতে হয়তো কষ্ট হবে তবে মানসিক প্রশান্তি পাবে।’-কথাগুলো জীবন্ত কিংবদন্তী প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ আবুল মনসুর স্যারের।

জীবনে ক্লাস কম করিনি। সেই প্লে নার্সারি থেকে শুরু করে আজ এমবিবিএস থার্ড ইয়ারে আছি। কতশত ক্লাস করেছি আল্লাহই ভালো জানেন। কিন্তু টানা ৩ ঘন্টা লম্বা ক্লাস কবে করেছিলাম মনে নেই। এত লম্বা ক্লাস তবুও কোন বিরক্তি নেই, উল্টো হাসির লাগাম টেনে ধরা বড়ই মুশকিল।

সত্যিই জীবনের অন্যতম সেরা ক্লাস করেছিলাম গত বছরের ২২ ডিসেম্বরে। জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে সে দিনটি। প্রফেসর ডা.আবুল মুনসুর স্যার একজন লিজেন্ড সেটা শুনেছিলাম পূর্বে। হাতেনাতে প্রমাণ পেয়েছি সেদিন।

ময়মনসিংহের বিখ্যাত গফরগাঁও থানাধীন চরালের নিদ্রিয়ার চরে ১৯৫৬ সালের ৯ মার্চে জন্মগ্রহণ করেন মুনসুর স্যার। বাবা আহসান উদ্দীন সরকার (ডাকনামে মাটির বাপ নামেই পরিচিত ছিলেন)। তিনি পেশায় ছিলেন শিল্পী মানুষ। বাউল, জারি গান, পালা গান খুব দক্ষ ছিলেন উনি। সেই জন্যে উনি গ্রামে তিনি যশু, কবিয়াল নামে পরিচিত ছিলেন। এমনকি তৎকালীন সময়ে উনাদের বাড়িতে উমেদ আলী, খালিদ দেওয়ানের মত বিখ্যাত ব্যক্তিরাও বেড়িয়ে যেতেন। 

এদিকে মা ওলীমুন্নেসা বেগমের স্বভাব পুরোই উল্টো। উনি ঘরমুখো মানুষ, ধার্মিক। চার ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয় আবুল মুনসুর স্যার। ব্রহ্মপুত্র নদ ঘেষা নিদ্রিয়ার চরে বেড়ে উঠেছেন খুব দুরন্তপণা হিসেবে। ৪ বার নদী ভাঙনের শিকার পরিবারের আর্থিক অবস্থা টানাপোড়ন। 

বিদ্যুতহীন, কাচাঁ রাস্তার বন্ধুর পথ মাড়িয়ে ডা. আবুল মুনসুর স্যার পড়াশোনা শুরু করেছেন সে গ্রামেরই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দিনের মত দিন চলছিল টেনেটুনেই। নদী ভাঙনের ফলে জমিহীনা পরিবার গিয়ে ঘর তুলেন মামার দেয়া ভিটেয়। এরই মাঝে কোলের শিশু ছোট ছেলেটাকে রেখে মা মারা যান বক্ষব্যাধিরোগে (১৯৬৩সালে)। আবুল মুনসুর স্যার তখন ক্লাস টু’তে পড়তেন।

বড় দুই ভাই চাকরি নিয়ে ব্যস্ত। ছোট ভাইটার দ্বায়িত্ব পড়ে আবুল মুনসুর স্যারের ওপর। ছোট বাচ্চাটার দেখাশুনা করে, নিজেদের খাওয়ার জন্য খিচুড়ি পাকিয়ে আবুল মনসুর স্যার স্কুলে যান। যাওয়ার সময় ছোটভাইকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে যায় ঘরে।

অর্থকষ্ট নিয়েই বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। কিন্তু সেটা টিকেনি। একেবারে বড় ভাইয়ের চাকরি হয় মানিকগঞ্জে। ভাবিসহ ভাই থাকেন সেখানে। আবুল মুনসুর স্যার চলে যান ওখানে ছোটভাইকে নিয়ে। কিন্তু অভাগা যেখানে যায়, সাগর শুকিয়ে যায়। ছোট ভাইটা মারা যান।

দুঃখ কষ্ট নিয়েই মেধাবী মুনসুর স্যার পড়াশুনা চালিয়ে যান। কৃতিত্বের সাথে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান। মেট্রিক ও ইন্টারমিডিয়াটেও ফার্স্ট ডিভিশন পেয়ে উত্তীর্ণ হন। ততদিনে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। মেঝভাই ছিলেন রাজশাহীর রেডিওর মিস্ত্রী। সে সূত্রে কিরিংকারাং ভালোই পারেন ছোট থেকে। চলে যান রাজশাহীতে।

যুদ্ধকালীন সময়ে পালিয়ে যান করমচা গ্রামে। নিজে নিজে কিরিংকারাং করতে করতে একটি রিলে তৈরী করে রেডিওর খবর শোনার ব্যবস্থা করে ফেলেন। দুদিন পর জঙ্গলের সে রিলে ধরা পড়ে তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর মনির স্যারের স্টেশনে। উনার সাথে তখনই পরিচয়, আলাপ, উপদেশ নেয়া।

মুক্তিযুদ্ধ শেষ। আবুল মুনসুর স্যার ভর্তি পরীক্ষা দিতে গেলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভাইবা বোর্ডে দেখা সেই মনির স্যারের সাথে। স্যার উনাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন এপ্লাইড ফিজিক্সে।

ভালোই চলছিল দিনকাল, কিন্তু ঝামেলা পাকালেন মেজ ভাবি। উনি বললেন –মুনসুর (স্যার) ডাক্তারি পড়বে। ভাই ভাবির চাপাচাপিতে বাধ্য হয়ে সেকেন্ড টাইম মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দেন। চান্সও পেয়ে যান রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। ১৮তম ব্যাচে।

সবাই বলতেন, " Golden 18" ব্যাচ। কিন্তু উড়োমনা মুনসুর স্যার মেনে নিতে পারেনি মেডিকেল জীবন। তাই পড়াশোনা করেছেন ধরা ছাড়ার মত করে। মেধাবী ডা.আবুল মুনসুর কখনোই ফেইল করেননি। পাস করে গেছেন এভারেজে।

ছোট থেকেই গ্রামের যাত্রাপালায় মুনসুর স্যার অভিনয় করতেন বিবেক চরিত্রে। গলাও ভালো, তাই গানও চলতো অল্পস্বল্প। মেডিকেলে সেসব আশীর্বাদ হয়ে এলো। এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিসের জন্য গোল্ডেন ১৮ ব্যাচের সুনাম ছিল প্রতিবারই। প্রতিটি প্রোগ্রামে চ্যাম্পিয়ন এরাই হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত যারা বেশীরকম প্রোগ্রামবাজ ছিল তারা সবাই ফাইনাল প্রফে গাইনিতে ফেইল করে। সেই থেকে তাদের নাম হয় -AFB (Appeared But Failed Batch)!

যাইহোক, এমবিবিএস পাসের পাসের পর ১৯৮৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয় চাকরি জীবন। ইন সার্ভিস ট্রেনিং শেষ করে Supy Duty শেষে ময়মনসিংহের ফুলপুর কাশিগঞ্জ সাবসেন্টারে। অতঃপর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার কালিয়াচাপড়া সুপারমিলে বদলি। তারপর আবার কাশিগঞ্জে রদবদল।

১৯৯৬ সালে নিজ কাজে সহযোগিতার জন্য নিজে নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন Fox Pro নামে মিনি প্রেসক্রিপশন সফটওয়্যার। আজো সেটার ভার্সন চালান স্যার। ১৯৯৬ সালের শেষ দিকে MMC তে কম্পিউটার ট্রেইনার হিসেবে যোগ দেন তিনি। নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো ফরেনসিক মেডিসিনের লেকচারার হিসেবে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো - MMCতে চাকরিতে যোগ দেয়ার ৩ মাস পর পর্যন্ত মুনসুর স্যার জানেন না উনার ডিপার্টমেন্ট কোনটা! তিনি তখনো কম্পিউটার ট্রেইনার।

কয়েকদিন পর থেকে ফরেনসিক লিজেন্ড টাইগার মিজান স্যারের সংস্পর্শে ফরেনসিক মেডিসিনের সাথে যাত্রা শুরু। দিন যায় রাত্রী যায়। ফরেনসিক মেডিসিনের লেকচারার মানুষ। পড়ানো আর পোস্টমর্টেমই তো তাদের জীবন। এরই ফাঁকে DFM ও MCPS পাস করেন ২০০০ সালে। এসব নিয়েও MMC তে আবার লেকচারার হিসেবেই জয়েন দেন।

২০০০ সালের ২০ এপ্রিল। রংপুর বড়ইমারি ছিটমহল সীমান্তে ভারতের বিএসএফ বাহিনীর অতর্কিত হামলার প্রেক্ষিতে বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) বাহিনীর মাত্র ৫জন সাহসী সৈনিকের বীরবিক্রম যুদ্ধের ফলে ১৬ জন বিএসএফ নিহত হন। তখন একজন বিডিআর শহীদ হন। সে প্রেক্ষাপটে সবগুলো লাশ পোস্টমর্টেম করেন আমাদের ডা. আবুল মুনসুর স্যার।

বিএসএফের লাশগুলো ২১ এপ্রিল কামালপুর সেক্টর দিয়ে ভারতের কাছে হস্তান্তরিত হয়। সে লাশগুলো নিয়ে তখন মারাত্মক প্যাঁচ বাধিয়ে ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল আদালতে মামলা করে। তখন আমাদের স্যার তাদের তারিখ বিভ্রান্তির কথা, তাদের ডাক্তারের ( M.W.Momin,MPH) যোগ্যতার প্রশ্ন তুলে সে বিচারকার্যে দেশকে জয়ী করে নিয়ে আসেন। 

এবার সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে বদলি হলেন। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে পদোন্নতি পেয়ে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর (cc) হন তিনি। সিলেটে তখন তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। ক্লাসের অলওয়েজ ব্যাকবেঞ্চার ছেলেটাও মুনসুর স্যারের ক্লাস মিস দেন না, বসে ফার্স্ট বেঞ্চে। 

২০০৮ সালে গেলেন উচ্চতর ট্রেনিংয়ে। Biomedical DNA Profilling (Thailand) DNA profiling( Malaysia), Forensic Autopsy (England), Forensic Psychiatry(England) -এসব উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষ নাবিক একদিন সরকারি চাকরি জীবনের প্রান্তে এসে জাহাজ ভিড়িয়েছেন ২০১৫ সালে।

সত্যিই চলার পথে একদিন না একদিন বিদায় তো নিতেই হয়। সেদিন মুনসুর স্যারও চাকরি জীবন থেকে বিদায় নিয়েছেন। তবে বিদায়টা সুখের ও তৃপ্তির বিদায় হয়নি সেটা। স্যার নিজ বাড়ির কলেজ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে অবসরে যেতে চেয়েছিলেন, দেয়া হয়নি (!) 

২০১৫ সালেই এনাটমির লিজেন্ড প্রয়াত প্রফেসর ডা.মুনসুর খলীল স্যারের দাওয়াতে কিশোরগঞ্জ ঘুরতে আসেন তিনি। দেখান উনার মেডিকেল কলেজ (শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ)। এরপর নিয়ে আসেন আমাদের "Center of Excellence" খ্যাত প্রাণের কলেজ প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ মেডিকেল কলেজে।
আমাদের শ্রদ্ধাভাজন প্রিন্সিপাল প্রফেসর ডা. আ ন ম নওশাদ খান স্যার তখনই উনাকে ফরেনসিকের ডিপার্টমেন্ট হেড হিসেবে নিয়োগ দেন। সেই থেকে প্রফেসর ডা.আবুল মুনসুর স্যার আমাদের। 

টাইগার মিজান (প্রফেসর ডা. মিজানুল হক) স্যারের মাধ্যমে প্রথম অটোপসি দেখা। তারপর রফিক স্যারের সংস্পর্শে নিজ হাতে কাটা নিশিপদের গলাকাটা লাশটির পোস্টমর্টেম করতে গিয়ে ভয় পাওয়া ছেলেটির জীবনে পোস্টমর্টেম করার সংখ্যা আজ প্রায় ৯৬০০টি।

নিজ হাতে অটোপসি করার জন্য প্রফেসর ডা.আনোয়ারুল ইসলাম স্যার খুব চাপ দিতেন। সেই থেকে প্র্যাক্টিকেল হাত ভালো হবার অভ্যাস।

হজ্ব করে এসেছেন। নিজের কাছে যতটুকু সৎ থাকা যায় ততটুকুন নিয়ে আছেন বলে জানি। যথেষ্ট পরিমাণ দানশীল। নিজ বেতনের (প্রায় ৬০%) দান করে বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসার হুজুরদের বেতন চালান। বহু গরিব ছাত্র-ছাত্রীকে বিভিন্ন স্কুল, মাদ্রাসা, ভার্সিটি ও মেডিকেল কলেজে পড়ার জন্য মাসিক খরচ দিয়ে থাকেন। বর্তমানে উনার খরচে Medical College, DU, KUET, CU তে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। মজার ব্যাপার হলো-তিনি এসব কিছু করছেন গোপনে।
 
ফরেনসিক মেডিসিন নিয়ে স্যারের আশংকা:

যে হারে ডাক্তারদের ওপর মিথ্যা অপবাদ, অপপ্রচার, মামলা, হামলা হয়রানি করা হচ্ছে, এভাবে চলতে থাকলে আগামী দ ‘তিনশ বছরের জন্য ফরেনসিক মেডিসিনের শিক্ষক সংকটতায় পড়বে দেশ। এজন্য সরকারের উচিত ফরেনসিক মেডিসিনের শিক্ষকসহ ডাক্তারদের যথাযথ নিরাপত্তা ও সুবিধা প্রদান করা।

পারিবারিক জীবন:

ডা.আবুল মুনসুর ও তাঁর সহধর্মীনি জেসমিন আক্তারের সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে। বড় মেয়ে ফারিহা জেসিন মুনসুর জাপান থেকে পিএইচডি শেষ করে কুষ্টিয়া ইসলামিক ইউনিভার্সিটির মাইক্রোবায়োলজির এক প্রফেসরের সঙ্গে সংসার করছেন। আর ছেলে রিফাত সাব্বির মুনসুর বুয়েট থেকে পড়াশুনা শেষে এখন ভেনেজুয়েলা ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছেন।

স্যারের যত প্রিয়:

Diabetes Mellitus এর রোগী ডা.আবুল মুনসুর স্যারের প্রিয় খাবার তাঁর সহধর্মিনীর হাতের পিঠাসহ বাঙালী যত খাবার।

প্রিয় রং: নীল

প্রিয় শখ:ফটোগ্রাফি

প্রিয় কাজ: লং ড্রাইভে যাওয়া

প্রিয় মানুষ:  হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)

ব্যক্তিত্ব: প্রফেসর ডা.মুনসুর খলীল স্যার

স্বপ্ন: মাদকতার বিরুদ্ধে কাজ করা

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর