ঢাকা      সোমবার ২২, জুলাই ২০১৯ - ৭, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. হৃদয় রঞ্জন রায়

সহযোগী অধ্যাপক, সার্জারি বিভাগ

রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


গোয়েন্দা প্রতিবেদন

সিভিল ড্রেসে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড পরিদর্শন করলাম। নিজেকে কখনো রোগীর লোক, কখনো বা বিশেষ সংস্থার লোক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন রোগী, রোগীর লোকদের সঙ্গে নানামুখী কথা বললাম। শেষে যা অভিজ্ঞতা, তাতে বেশ মন খারাপ হলো আমার।

বেশিরভাগ রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগের শেষ নাই। মূল অভিযোগ হলো: তাদের রোগীকে কোন ডাক্তার দেখেননি। ৪/৫ দিন হলো ভর্তি হয়েছেন, কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোন ডাক্তার দেখেননি, ওষুধও সরবরাহ করা হয়নি। তাদের আরও অভিযোগ, সিস্টাররা কথা শোনেন না, স্যালাইন দেন না, ইত্যাদি।

অথচ খবর নিয়ে যা জানলাম, তাতে অবাক হওয়ার পাশাপাশি আমি কষ্টও পেলাম। মনে হলো, বঞ্চনার কারণে কোনো বিষয়ে অভিযোগ করা খুবই স্বাভাবিক এবং জরুরিও। এটি তাৎক্ষণিকভাবে হলেও আর ভালো। এমনটি না হলে বরং, সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী হতে পারেন না।

কিন্তু পর্যাপ্ত প্রাপ্তির পরও যখন রোগী বা তাদের স্বজনেরা বঞ্চনার অভিযোগ তোলেন, তখন অভিযুক্ত ব্যক্তি কিংকর্তব্যে বিমূঢ় হয়ে যান। রাজ্যের সমস্ত অসহায়ত্ব গ্রাস করে তাকে। কারণ পূর্ণ আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পরও ভিত্তিহীন এসব অভিযোগের কারণে কোনো কেনো ক্ষেত্রে হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের বড় ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হয়ে হয়। চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে তাঁদের সারাজীবনের ক্যারিয়ার।   

পরিচয় গোপন করে রোগী দেখার ঘটনায় উপলব্ধি হলো, আমাদের রোগী বা তাদের স্বজনেরা অভিযোগ করার সময় কেন যেন একপাক্ষিক হয়ে যান। তারা হাসপাতালে সেবা, ওষুধ ও আন্তরিকতাসহ অনেক কিছু পাওয়ার পরও সামান্য একটু অপ্রাপ্তিকেই বড় করে দেখতে চান, যা কোনো বিবেকবানের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।  
      
রোগীদের অভিযোগের বিপরীতে সংশ্লিষ্টরা আমাকে জানিয়েছিলেন, প্রতিদিনই ২/৩ বার করে ডাক্তার দেখেছেন, রোগীরা ঠিকমত ওষুধও পেয়েছে। জিজ্ঞেস করলে বলছে ‘বড় ডাক্তার তো দেখে নাই!’ কিন্তু বড় ডাক্তার যে কে সেটাও চেনেন না তারা। আসলে তাদের চাহিদাটা যে কি সেটা বোঝাই মুশকিল!

রোগী বা তাদের স্বজনেরা হাসপাতালের যত্র-তত্র নোংড়া করে রাখছে, ভাত তরকারি খাচ্ছে আর ফেলছে। থুথু,  পানের পিক ফেলছে, পানির বোতল/ডাবের খোসা ফেলছে। বাথরুম নোংরা করে রাখছে।

পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে নিষেধ করলে বলছে ‘আপনাদেরকে সরকার কিসের জন্য বেতন দেয়? এসব পরিষ্কার করার জন্য!’ কিন্তু বাস্তবতা হলো, একে তো হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের রয়েছে অপ্রতুলতা! দ্বিতীয় চুক্তির ভিত্তিতে তাদেরকে মাসিক ২ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হয়, যা ভিক্ষুকের রোজগারের চেয়েও কম। ফলে পেটের দায়ে অনেক সময় তারা বিভিন্ন বখশিসের উপর নির্ভরশীল হয়ে যান।

হাসপাতালে আমার অধীনে ভর্তি হওয়া একজন রোগীর স্বজনের অভিযোগ আমাকে সবচেয়ে অবাক করলো!

প্রচণ্ড পেটব্যথার কারণে ওই রোগীর অপারেশন হয়েছে। সেলাই কেটে বাড়ি যাবেন ২/৩ দিনের মধ্যে। ভালোই আছেন তিনি। কমপক্ষে ৪০ হাজার টাকার চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পেয়েছেন তিনি। আন্তরিকতা ও ভালবাসার কমতি ছিল না।

বাড়ি যাবার আগমুহূর্তে তার পাতলা পায়খানা শুরু হয়। সেদিনই সকালে আমার ইন্টার্নি চিকিৎসক তাকে দেখে চিকিৎসা দিয়েছেন, ঘণ্টাখানেক পর সিএ/আইএমও দেখে নিয়েছেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। এরও ঘণ্টাখানেক পর আমি যখন রাউন্ডে গেলাম তখন এক রোগীর স্বজন সরাসরি আমাকে অভিযোগ করলেন, ‘ভর্তি হবার পর কোন ডাক্তার আমাদের রোগী দেখেননি!’

আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে অপারেশন হলো কিভাবে? সেদিনই ঢাকা থেকে আসা রোগীর ছেলে আমার সঙ্গে অযাচিত আচরণ শুরু করে, যা রীতিমত মাস্তানি! তার অঙ্গভঙ্গি, কথাবার্তা, চোখের চাহুনি দেখে আমি ভড়কে গেলাম। যেন আমরা সবাই তার কেনা গোলাম! তার কথা ‘সরকারআপনাদের এত টাকা বেতন দিচ্ছে কিসের জন্য।’

সীমাহীন কষ্ট ও ঘৃণা নিয়ে বলতে চাই, মানুষ এত অকৃতজ্ঞ কেন? এক সময় ডাক্তারদের প্রতি মানুষের ভালবাসামিশ্রিত শ্রদ্ধা ও ভয় ছিল। তারাও মানুষের চিকিৎসা সেবাকে ব্রত ভাবতেন, এখনও ভাবছেন। আন্তরিকতা ও ভালবাসার সঙ্গে রাতদিন রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

তাহলে চিকিৎসকদের প্রতি এমন মনোভাব তৈরি হলো কেন? তাদের ইতিবাচক কাজগুলো আড়াল করে চিকিৎসকদের প্রতি বৈরি প্রচারণা চালানো হলো কেন? কার স্বার্থে? এর সঙ্গে কি শক্তিশালী কোনো সিন্ডিকেট জড়িত? অহেতুক চিকিৎসকদের সুনাম ক্ষুণ্ণ করে রোগীদেরকে বিদেশগামী করাই যাদের লক্ষ্য! দেশপ্রেমিক প্রতিটি নাগরিককে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে প্রতিটি প্রশ্নের বস্তুনিষ্ট জবাব।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

হাসপাতালের সকলে মিলে সমাজকে অনেক কিছুই দিতে পারে। সাধারণত যে মানুষ যেভাবে…

ভুতের হাসপাতাল!

ভুতের হাসপাতাল!

হুট করেই ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেল। পড়ার টেবলে অন্যমনস্ক আমি যেই না সামনে…

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি কর্পোরেশন সমীপে কিছু কথা

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি কর্পোরেশন সমীপে কিছু কথা

বেশ কিছুদিন ধরেই ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাসবাহী এডিস মশার প্রকোপ বেড়েছে। রাজধানীতে এর…

স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘হোয়াটস আপ ডক’ ৫০তম পর্বে

স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘হোয়াটস আপ ডক’ ৫০তম পর্বে

ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় ‘চিকিৎসা সংক্রান্ত’ অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আমরা সবাই অবগত। কিন্তু যদি বলা…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর