ঢাকা      বৃহস্পতিবার ২১, মার্চ ২০১৯ - ৬, চৈত্র, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. আসিফ সৈকত

রেজিস্ট্রার, ক্রিটিক্যাল কেয়ার ডিপার্টমেন্ট, এ্যাপোলো হাসপাতাল

 


ক্রীতদাসের হাসি

আমার বড় মেয়েটা ইদানিং আমার কাছ থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরে পুরোপুরি মা ঘেঁষা হয়ে যাচ্ছে। পিতা হিসেবে যতোটুকু বুঝছি যে- ওর একটা আলাদা জগত তৈরি হচ্ছে। আমি এমনই এক চিকিৎসক পিতা, যে তার সন্তানের দুই বছর বয়স পর্যন্ত তাকে এক মুহূর্ত সময় দিতে পারিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজে পোস্ট গ্রাজুয়েশনের অবৈতনিক ক্রীতদাস ট্রেনিং, ক্লিনিকের চাকরি, দালালের গালমন্দ হজম করে ঢাকা শহরে স্ত্রী সন্তান নিয়ে টিকে থাকতে হয়েছে। এমবিবিএস পাস করে ক্লিনিকে বাইশ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতে হয়েছে।  সপ্তাহে আটচল্লিশ থেকে বাহাত্তর ঘন্টা! পোস্ট গ্রাজুয়েশনের অবৈতনিক ট্রেইনিং করতে হয়েছে সপ্তাহে ন্যূনতম আটচল্লিশ ঘন্টা!

ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় এলেই দেড় বছর বয়সী বাচ্চাটা কোলে উঠতে চাইতো! আমি এমনই এক অভিশপ্ত পিতা, যে নিজের সন্তানকে বুকে নিয়ে ঠিক ভাবে ঘুম পাড়াতে পারতাম না। রাতের বেলা বাচ্চা একটু কাঁদলেই চিৎকার করতাম উন্মাদের মতো! স্ত্রীকে বলতাম- 'তোমরা আমার প্রতি একটু দয়া করো ....., একটু না ঘুমালে ঢাকা মেডিকেলে সিজার ওটিতে নাইট ডিউটি করতে পারবো না!'

বাচ্চা চুপ করে তাকিয়ে থাকতো আমার দিকে, হয়তো মনে মনে হয়তো বলতো- 'আমি ছোটো না বাবা! তুমি আমার বাবা না? আমি একটু কাঁদলেই তুমি মাকে এভাবে বকা দাও কেনো?'

DA final exam এর আগে  অ্যানেসস্থিসিয়া’র বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর আব্দুর রহমান ডেকে বলেছিলেন-'আসিফ, আপনি ক্লিনিকের চাকরি ছাড়ুন! নতুবা পাস করতে পারবেন না। আপনাকে উদভ্রান্ত লাগে, এতো চাপ নিয়ে পড়াশোনা করবেন কিভাবে?' আমি মাথা নিচু করে বলেছিলাম- 'স্যার! আমি ফাইনাল পরীক্ষা ড্রপ দিতে পারবো, কিন্তু ক্লিনিকের চাকরি নয়। আমার ছোট সন্তানের জন্য, ঢাকা শহরে টিকে থাকার জন্য আমাকে ক্লিনিকে চাকরি করতেই হবে!'

রহমান স্যার কিছুক্ষণ তাকিয়ে বলেছিলেন- 'অ্যাসেসমেন্ট পরীক্ষা এ আপনার রেজাল্ট ভালো, খবরদার পরীক্ষা ড্রপ দেবেন না!'

আমি পরীক্ষার দুইমাস আগ থেকেই আমার সন্তানকে কোলে নিতাম না! কোলে নিলে ও আর নামতে চাইতো না। আমি ওকে বলতাম- 'পড়তে দে! কাছে আসবি না। খবরদার, মার খাবি!'

পৃথিবীর কি জঘন্যতম পিতা আমি!

কি ভাবছেন জানিনা ! হয়তো ভাবছেন, মিথ্যা। সন্তান নিয়ে কোনো পিতা মিথ্যা বলেনা। হ্যাঁ এটাই বাংলাদেশের অনারারিরা ট্রেনিং করা প্রতিটি ক্রীতদাস চিকিৎসক পিতার জীবনের খন্ড চিত্র।

ক্লিনিকে বই নিয়ে পড়তে বসলেই দালালের বাচ্চারা মুখের সামনে মদ আর বিড়ির গন্ধ নিয়ে বলতো- 'চাকরীর টাইমের এতো লেহাপড়া কিসের আবার!' দালালদের তোষামোদ না করলে ক্লিনিকে চাকরি করতে পারবেননা ঢাকা শহরে! গজবের এক দেশ, পুরা ফাউল।

হ্যাঁ, এখন মাইনে ভালো পাই, ফেসবুকে পিতা কণ্যার হাস্যোজ্জ্বল ছবি আপলোডাই। কি সুখ! কি সুখ! আহারে! কিন্তু আমার মেয়েটা হঠাৎ হঠাৎ আমাকে এভোয়েড করে। তখন আমার আত্মা মুচড়ে ওঠে! মেয়েটা বড় হয়ে যাচ্ছে.! আমি আর কোনোদিন ফিরে পাবোনা সন্তানের সেই শৈশব, কোনোদিন না!

আমার এখন চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়- 'মা তুই আবার ছোটো হয়ে যা, আমার গায়ে আবার রাতের বেলা লাথি মার তুই, চিৎকার করে কাঁদ!' আমি তোকে কোলে নিয়ে ঘুমপাড়ানির গান শোনাবো- 'ঘুম পাড়ানি মাসিপিসি মোদের বাড়ি এসো!'

দেড় বছরের সেই ছোট্ট তুই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখ্, তোর সেই বিনা বেতনে অনারারি ট্রেইনিং করা ক্রীতদাস চিকিৎসক পিতার লজ্জিত কিংবা পরাজিত হাসি।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্যাম্পল ঔষধের কিছু ক্ষতিকর দিক!

স্যাম্পল ঔষধের কিছু ক্ষতিকর দিক!

টক'-শো তে তো কতো লোকে কত কথাই বলে। ওষুধের স্যাম্পল নাকি ডাক্তারদেরকেই…

প্রাইভেট প্রাকটিস: প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পরিবর্তনে আশাবাদী চিকিৎসকরা

প্রাইভেট প্রাকটিস: প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পরিবর্তনে আশাবাদী চিকিৎসকরা

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কেবল হাসপাতালের এক কর্নারে সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্রাকটিস গড়ে উঠলে ও…

ইরানে যেভাবে কিডনি দিবস পালিত হয়

ইরানে যেভাবে কিডনি দিবস পালিত হয়

বিশ্ব কিডনি দিবস বাংলাদেশে কিভাবে পালিত হলো তা নিয়ে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর দিকে…

সড়কে মৃত্যু মিছিল: রক্ষা পাওয়ার উপায়

সড়কে মৃত্যু মিছিল: রক্ষা পাওয়ার উপায়

সেনেগাল, গাম্বিয়ার মত আফ্রিকান দেশে যখন বাস, মিনিবাস একটা সুন্দর সিস্টেমে চলে,…

বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস: চাই সুষ্ঠ সমন্বয়

বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস: চাই সুষ্ঠ সমন্বয়

ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাধীনভাবে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ ও মানুষের সেবা করার এক প্রাচীনতম প্রতিযোগিতাপূর্ণ…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর