ডা. নাজমুল ইসলাম

ডা. নাজমুল ইসলাম

অনারারি মেডিকেল অফিসার

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ, বগুড়া।


০৫ মার্চ, ২০১৯ ০৫:৪০ পিএম

প্রচারবিমুখ একজন মানবিক মানুষ

প্রচারবিমুখ একজন মানবিক মানুষ

নীলফামারী। বাংলাদেশের উত্তর জনপদের একটি জেলা। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত হবার কারণে বরাবরই এখানে শীতের প্রকোপ বেশি। এই জেলার ডিমলা উপজেলার  তিস্তা নদীর পাড় ঘেঁষে একটি গ্রাম খালিশা চাপালী পাড়া। গ্রামটির বেপারী পাড়ায় প্রায় ৩০০টি পরিবারের বসবাস। গ্রামের সকলেই হত দরিদ্র। নগদ টাকা আয়ের সুযোগ নেই তাদের। এ জেলার মানুষের নিজেস্ব কোন জমি-জমা নাই। অপরের সামান্য জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন তারা। বছরে দুইবার ধান চাষ করেন। বছরের দুইটি মৌসুমে সংগ্রহ করা ফসলেই চলে তাদের জীবন। স্থানীয়দের ভাষায়, মৌসুম দুইটির একটিকে হেউদ (বোরো) এবং অন্যটি স্ক্রিম (ইরি) বলা হয়। অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে জীবন ধারণ করতে হয়। কাজের বিনিময়ে দিনপ্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পান।

তুলনামূলকভাবে পারিশ্রমিক কম হওয়ার পাশাপাশি রয়েছে কাজের সংকটও, যার ফলে ১২ মাসের মধ্যে ১১ মাসই বেকার থাকতে হয় তাদের। আর এই ১১ মাসই কুমিল্লায় কৃষিকাজ ও ঢাকায় রিকশা চালিয়ে জীবন যাপন করেন তারা। এভাবেই চলে তাদের জীবন। শীতের মৌসুমে হেইদ (বোরো ধান) ঘরে তুলেন এখানকার মানুষ। সেই ফসল পেয়ে ঘরে ঘরে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। এবারের শীতেও তার ব্যতিক্রম ছিল না।

নতুন ফসল গোলায় তুলে পাহাড়সম স্বস্তি নিয়ে নিত্যদিনের মতোই ঘুমাতে যায় বেপারী পাড়ার সকল মানুষ। গত বছরের ৯ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে আগুনের লেলিহান শিখা তাদের এ স্বস্তি আর আনন্দে ফেলে বিরহের ছাপ। আগুনে ঘর, ফসল ও গবাদিপশু সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এর সঙ্গে পুড়ে যায় তাদের স্বপ্নও।

আগুনে সবহারানো মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটাতে গত ৩০ নভেম্বর সেখানে শীতবস্ত্র বিতরণ করে এসেছি। ঘরবাড়িগুলোর দৃশ্য এখনো চোখে ভাসছে। বেপারী পাড়া গ্রামের পূর্ব-পরিচিত আব্দুর রহিম পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, ফসল আর গবাদিপশুর কিছু ছবি পাঠালেন আমাকে। ছবিগুলো দেখে ক্ষতির পরিমাণ সহজেই অনুমান করা গেলো।শীতবস্ত্র দেয়ার সময় তাদের দীনতা নিজের চোখে দেখেছি। রহিম পরামর্শ দিলেন, ভাই এই অসহায় লোকগুলোর জন্য কোন সহযোগিতার হাত বাড়ানো যায় কিনা?

রহিমের দেয়া ছবিগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে সকলের সহযোগিতা কামনা করি। তেমন কারো কাছে কোন সাড়া পেলাম না। ১২ ডিসেম্বর রাতে একটা ই-মেইল পেলাম। বাংলাদেশের প্রথম সারির একটা সরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যাএন্ড হাসপাতালের সন্মানিত পরিচালক জানালেন তিনি সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। এরই ধারাবাহিকতায় ১৩ ডিসেম্বর সকালে হাসপাতালে রাউন্ড দেয়ার সময় ফোনকল বেজে উঠে। ফোন হাতে নিয়ে দেখি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স্যার কল করেছেন। স্যার বললেন, আপনাকে আমি গতরাত থেকে ফোন করছিলাম। আপনি ই-মেইলে আমাকে আগুনে পুড়ে যাওয়া কিছু ঘরবাড়ির ছবি পাঠিয়েছেন। ছবিগুলো দেখার পর আমি ঘুমাতে পারিনি। ছবি দেখার পরপরই আপনাকে কল করি। কিন্তু পাইনি। নাজমুল, আমি পুড়ে যাওয়া ১২টি পরিবারকে সহযোগিতা করতে চাই। কিন্তু একটা শর্ত আছে। এই টাকার কথা কাউকে বলা যাবে না। কারণ তাতে রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা) প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আমি গোপনে মানুষের জন্য কিছু করতে চাই।

কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম আর ভাবছিলাম এই যুগেও এত পরোপকারী এবং নির্লোভ মানুষ আছেন! ছেলেবেলায় গল্প বইয়ে হাজী মোহাম্মাদ মহসিনের কথা যেমন শুনেছিলাম, স্যারের কথায় তেমন চরিত্রের সুস্পষ্ট নিদর্শন পেলাম। অথচ, বর্তমান সময়ে আমরা সকলেই কত সহজেই খ্যাতি পেতে চাই। স্যার কথায় কথায় নিজেকে খুব ক্ষুদ্র আর গুণাহগার মানুষ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছিলেন। অথচ তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি। বিশাল হৃদয়ের এ মানুষটি শুধু একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলই নয়, তিনি একজন চিকিৎসকও। বর্তমানে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রচারবিমুখ এই মানুষটি আমাদের সকলের প্রিয় শ্রদ্ধেয় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. নাসির উদ্দিন আহমেদ।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ময়মনসিংহবাসীর সঠিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। যে কারণে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন ৩ বছর ৪ মাস ধরে। ৫৭ বছরের মানুষটি ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন ২০ বছর। ইদানিং চোখে ছানি ধরা পড়েছে। দরকার অপারেশনের।

এমন শারীরিক অবস্থায় বড্ড প্রয়োজন ছিল পরিবারের সঙ্গে থাকা।কিন্তু হাসপাতালে সঠিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বেছে নিয়েছেন সেনা অফিসার রুমের একটা রুম। যেখানে অনেকটা নির্বাসনের মতো একা একাই বাস করছেন। একা রুমে সার্বক্ষণিক বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে চিন্তা করেন।

২০১৫ সালের ১ নভেম্বর হাসপাতালের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে স্যার হাসপাতালটিকে দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের জন্য রোল মডেল বানিয়েছেন।

তিনি পরম দায়িত্বশীলতায় হাসপাতালে শতভাগ ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছেন। এরই মধ্যে বন্ধ হয়েছে দালালদের দৌরাত্ম। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চালু করেছেন দেশের প্রথম ওয়ান স্টপ সার্ভিস।

প্রসূতি সেবার জন্য ২০১৮ সালে হাসপাতালটি দেশসেরা পুরস্কার লাভ করে। হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় এনেছেন আমূল পরিবর্তন। রোগীদের জন্য তৈরি করা খাবারের রান্না স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে হচ্ছে কিনা, তা দেখার জন্য নিজেই তদারকি করেন।

স্যারের এতসব পদক্ষেপ হাসপাতালে এনে দিয়েছে স্বস্তির সুবাতাস। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ৬ জেলার মানুষের স্বাস্থ্যসেবার বিড়ম্বনা কমিয়ে এনেছেন।

নির্মম হলেও সত্য, মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাওয়া নাসির উদ্দিন স্যারের এজন্য সইতে হয়েছে নানা বিড়ম্বনা। হাসপাতালের ওষুধ চুরি রোধ এবং দালালদের দৌরাত্ম বন্ধ করা এবং খাবার সরবরাহের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারদের অনিয়ম বন্ধ করার কারণে নানাবিধ হয়রানির শিকার হয়েছেন।

একটি কুচক্রী মহল ‘ময়মনসিংহ মেডিকেলকলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে সাংবাদিক নিষিদ্ধ’ এমন শিরোনামে একটি পুরাতন সংবাদকে স্যারের বিরুদ্ধে প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সাংবাদিকদের উস্কে দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ময়মনসিংহবাসী সবসময় এমন অপচেষ্টা রুখে দিয়েছেন। সাধারণ জনগণের ভালবাসাই নাসির স্যারের সৎ পদক্ষেপের পথে সাহসের বাতিঘর।

গুণী মানুষদের কদর করা জানতে হয়। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষায়, গুণীদের কদর না থাকলে দেশে গুণী জন্ম নেয় না। নাসির স্যারদের মতো মানুষদের কদর করলে বাংলাদেশরই লাভ, এদেশের ভাগ্য বিড়ম্বিত জনগণের লাভ।

মেডিভয়েসকে বিশেষ সাক্ষাৎকারে পরিচালক

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শতাধিক করোনা বেড ফাঁকা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না