ঢাকা      মঙ্গলবার ১৬, জুলাই ২০১৯ - ১, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. শামীম আফজাল

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদ,

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, কিশোরগঞ্জ


পোস্টমর্টেম

রফিক মিয়া কয়েকবার হুমড়ি খেয়ে পড়লো। স্যার আপনাকে বিষন্ন দেখাচ্ছে, তখন থেকে দেখছি পানি খেয়ে যাচ্ছেন, কোন সমস্যা? এতগুলো লাশের পোস্টমর্টেম করেছেন কখনো আপনাকে এত বিষন্ন দেখিনি..! 

রফিক মিয়া হাসপাতালের মর্গে থাকে। ১৮ বছর ধরে লাশ কাটার কাজ করে। এ কাজটা সে নির্ভয়ে করে। বহু বছরের পুরনো অভ্যাস, তাই হয়তো ভয় লাগে না। আমার মনে আছে প্রথম বার যখন রফিক মিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে রিপোর্ট লিখেছিলাম, বাসায় গিয়ে কয়েকবার বমি করেছিলাম। উপরের চামড়াটা সাদা হোক কিংবা কালো, পেটের ভিতরে একটা বিদঘুদে গন্ধ থাকে, এক গন্ধে একদম বমি এসে যায়।

রফিক মিয়ার দাঁড়িগুলো সাদা হয়ে গেছে কিন্তু চুলগুলো কালো। নিশ্চয়ই মাঝে মাঝে চুলে কালার করে।

দাঁড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে রফিক বললো, স্যার কিছু তো বলেন..।

: রফিক তুমি আমাকে আরেক গ্লাস পানি দাও।

রফিক আমাকে পানি দিলো, পানি খেয়ে কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করে রইলাম। রফিক অজ্ঞাত মেয়ের যে লাশটা মর্গে এসেছে তাকে আমি চিনি। রফিক ভ্রু কুঁচকে বললো, কি বলেন স্যার! আপনি কিভাবে চিনেন? কনস্টেবল আসলাম বলছে, মেয়েটা কে কেউ হাত পা বেঁধে জঙ্গলের পাশে ফেলে গেছে, কাপড়ের যা অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ধর্ষণ করা হয়েছে…। 

রফিক চুপ করো। (আমি ধমক দিলাম) রফিক চুপ করে গেলো কিন্তু তার মনের ভিতর বিষয়টা জানার জন্য অস্থিরতা কাজ করছে। 

: স্যার? ও স্যার, বলেন তো মেয়েটা কে হয় আপনার?

: মেয়েটার নাম নিলয়া, আমার বন্ধু সোহাগের প্রেমিকা। দুদিন ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। সোহাগ অবশ্য আমাকে কয়েকবার বলেছিলো বিষয়টা, সোহাগকে কিভাবে জানাবো বুঝতে পারছিনা।

রফিক আরেকবার ভ্রু কুঁচকালো…। রফিক তুমি এখন যাও তোমাকে দেখতেও বিরক্ত লাগছে।

সোহাগকে ফোন দিলাম, সোহাগকে না দেখিয়ে নিলয়ার দেহটা ব্যবচ্ছেদ করা ঠিক হবে না। একঘন্টা পর সোহাগ আসলো, আমি কিছু বললাম না। সোহাগকে নিয়ে লাশ কাটা ঘরে রওনা দিলাম। সে বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে তার সাথে।

নিলয়ার সামনে দাঁড়িয়ে আছি…। আঙ্গুল দিয়ে সোহাগ কে দেখালাম, সে নিলয়াকে দেখলো। একটু টু শব্দও করলো না, সোহাগ জ্ঞান হারালো। রফিক আর আমি ধরে ওকে হসপিটালে ভর্তি করালাম। নিলয়াও শুয়ে আছে, তার কিছু বলার ক্ষমতা নাই।

আমি কয়েকবার চোখে পানি দিলাম। চোখ থেকে পানি পড়ছে, একটা কঠিন কাজ করতে হবে। নিলয়ার সাথে প্রথমবার যখন দেখা করেছিলাম সে বলেছিলো, ডাক্তার ভাই, আমার যদি কখনো অসুখ হয় তুমি আমার চিকিৎসা করবে। কিন্তু এমন করে সে আমার সামনে উপস্থিত হবে আমার চিন্তার বাইরে ছিলো। এমন একটা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে ভাবতে পারিনি।

রফিক আমাকে ডাকলো, স্যার আসেন, দেড়ি করা ঠিক হবে না। আশে পাশে মাছি ভনভন করছে।

নিলয়ার জামা কাটা হয়েছে, গলার পাশে নখের আঁচড়। তার স্তনের পাশে অনেকগুলো কামড়ের দাগ। এই একটা মাংসপিন্ডের প্রতি কত লোভ মানুষের! রফিক নিচের দিকে তাকিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিদিনের মত এত কথা বলছে না। সে জানে আমার মন খারাপ, একটু পর সে আঁতকে উঠলো! যোনিটা থেতলে দেওয়া হয়েছে!!

১৮ বছর ধরে নির্ভয়ে কাজ করা মানুষটা ভয় পেয়ে গেলো। মাথায় পিছনে আঘাতের চিহ্ন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। আমার মাথা ঘুরাচ্ছে, মানুষ কিভাবে এত নরপশু হতে পারে আমার মাথায় ঢুকছে না। একটা তরতাজা জীবন তার পাঁচমিনিটের উত্তেজনা নিস্তব্ধ করার জন্য শেষ করে দিলো!!

রফিক কেঁদে দিলো। তার ১৭ বছরের একটা যুবতি মেয়ে আছে, এতদিনপর মেয়েটা কে নিয়ে তার ভয় হচ্ছে। একা একা কলেজে যায় মেয়টা, আল্লাহ না করুক মেয়েটা কে যদি কেউ…!! নাহ্ রফিক আর ভাবতে পারছে না, কাজ শেষ করে আমার সামনে বাসায় ফোন করলো। কিরে মা কেমন আছিস? রফিকের মেয়ে ফোন ধরলো। মেলাদিন তোর কোন খোঁজ পাইনা। সাবধানে থাকিস, কখনো একা চলবি না।

এই একটা সমাজ, যেখানে মেয়েরা একা চলতে ভয় পায়। পাওয়ার-ই কথা, না হয় কখন দেখবে নিলয়ার মত লাশ হয়ে শুয়ে আছে। রফিক ফোন কেটে বাইরে চলে গেলো। 

তিনদিন পর সোহাগের জ্ঞান ফিরলো, জ্ঞান ফিরেই সে নিলয়াকে দেখতে চাইলো। মাঝখান থেকে তিনদিন যে কেটে গেলো সে টেরই পেলো না। নিলয়ার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। সোহাগ আমার সামনে, আমি তার পেছনে। ও চিৎকার করে কেঁদে দিয়ে বসে পড়লো, তারপর বিড়বিড় করে কি যেনো বলে উঠে চলে গেলো।

বহুদিন কেটো গেলো আর কখনো সোহাগের খবর পাইনি, হয়তো নিলয়ার মৃত্যু শোকে নিজেকে শেষ করে দিয়েছিলো দূরে কোথাও গিয়ে, নয়তো মৃত্যু শোকে পাগল হয়ে কোন রেলস্টেশনের আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

পত্রিকায় মাঝে মাঝে খবর দেখি অমুকের মেয়েকে ধর্ষনের পর হত্যা। দেখে খুবই খারাপ লাগে। মন খারাপ হয়। মন খারাপের বিষয়টা নিজের ভিতরেই থাকে। এই পুরুষ শাসিত সমাজে সত্যি মেয়েরা কতটুকু নিরাপদ আমার জানা নেই। সেই নরপশুগুলো ১০ মাসের বাচ্চাকেও ছাড় দেয় না! সত্যিই ধিক্কার আমাদের জন্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ: আমার দেখা একটি বিভৎস ঘটনা

শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ: আমার দেখা একটি বিভৎস ঘটনা

শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ কাজ করাকে পেডোফেলিয়া বলে। আর যাদের এই আকর্ষণ…

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব…

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal…

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থান। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নানা রকম হরমোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর