ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১ ঘন্টা আগে
ডা. শিরীন সাবিহা তন্বী

ডা. শিরীন সাবিহা তন্বী

মেডিকেল অফিসার, রেডিওলোজি এন্ড ইমেজিং ডিপার্টমেন্ট,

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল।


২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ১৩:৫৪

পুরান ঢাকার কেমিক্যালের কারখানা অন্যত্র সরিয়ে নিন

পুরান ঢাকার কেমিক্যালের কারখানা অন্যত্র সরিয়ে নিন

ছেলের বাপ বারবার বলছে,আগুনের নিউজ আর ভিডিওগুলো এড়িয়ে যেতে। এতে অকারণ আতঙ্ক বাড়বে। অনুভব করছিলাম, নিজেও নিতে পারছি না, আর।খুব কষ্ট পাচ্ছি। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে। আগুনের ঘটনার পরবর্তী প্রভাবটা আরো মারাত্মক। রান্নাঘরে ঢুকতে ভয় করে। গ্যাসের চুলাতে হাত রাখতেই বুকটা কেঁপে ওঠে। উঠতে-বসতে সারাক্ষণই মনে হচ্ছে, কিছু একটা ঘটবে এক্ষুণি।

পুরান ঢাকার চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে এই হাল। তবে নিজের এই ভয়-ভীতি একটি বিষয় ভেবে গৌন হয়ে যায়, তখন বরং, পুরান ঢাকাবাসীর ভীতি আর নীতিহীনতা দেখে বিব্রতই হই।

মানুষ কত লোভী! তার অনেক টাকা আছে। তবু আরো টাকা চাই। পিপিলীকা সম মানুষের জীবনের মূল্য কী এখানেই? পুরান ঢাকার মানুষ ধনবান থেকে আরো বেশি ধনবান হতে চাচ্ছেন। তাই ঘরের মধ্যে রাসায়নিকের গোডাউন ভাড়া দিয়ে কাড়ি কাড়ি টাকা কামিয়ে বিলাসী জীবন-যান করছেন তারা। শুনলাম, অনেকেই নাকি গুলশান, বনানী ও উত্তরাতে পরিবার নিয়ে শিফটও করেছেন।

বিতর্কের খাতিরে নিলাম, আপনার জমিতে আপনি বোমা রাখতেই পারেন। কিন্তু আপনার বোমাতে সাধারণ পথচারীর প্রাণ গেলে নিঃসন্দেহে আপনি খুনি হিসেবে চিহ্নিত হবেন।

চকবাজারের আগুন রাত সাড়ে দশটাতে না লেগে সাড়ে সাতটায় লাগলে কি হতো ভেবেছেন? ওই পথ ধরে প্রচণ্ড জ্যাম পাড়ি দিয়ে ৩/৪ ঘণ্টা সময় ক্ষেপণ করে দক্ষিণবঙ্গগামী হাজার হাজার মানুষ রিকসা/সিএনজি/গাড়ি যোগে সদরঘাট এসে লঞ্চে চড়েন? তাদের বড় একটি অংশ সেদিন অনাকাঙ্খিত এক ঘটনার মুখোমুখি হতেন।     

কয়েক ঘণ্টা আগে এ ঘটনা ঘটলে অনেক মানুষ পাড়ি দিতেন না ফেরার দেশে। আর অনেক মানুষের চোখ অশ্রুসিক্ত হতো। অনেক মা-বাবা-ভাই-বোনের বুকে রক্তক্ষরণ হতো।

সেদিন ঢাকায় চাকরির পরীক্ষা দিতে আসা তরুণ, বেড়াতে আসা পরিবার, ডাক্তার দেখাতে আসা রোগী হয়তো হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি হতেন কিংবা পুড়ে ছাই হতেন।

আর স্কুল, কলেজ, মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীর পাহাড়সমান গাদা গাদা স্বপ্ন মুহূর্তেই অঙ্গার হতো।

পুরান ঢাকায় নিমতলীর আগুনের দাগ এখনো শুকায়নি। অথচ সেখানে সেই কেমিক্যালের কারখানা এখনো বহাল তবিয়ে রয়ে গেছে, যা বিবেকবান প্রতিটি মানুষ ভাবাচ্ছে।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা। এ লক্ষ্যে তিনি উন্নয়নমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়ার পাশাপাশি বাস্তবায়নও করেছেন, যা এখন দৃশ্যমান।

আমাদের কথা হলো, একটি উন্নত দেশের নাগরিকদের জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কি আছে? বলতে দ্বিধা নেই, অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা বা অসর্ততার কারণেই সেদিন চকবাজারে এতগুলো মূল্যবান জীবন পুড়ে ছাই হয়ে গেল। এ অবস্থায় উন্নত দেশের সব রকমের পরিকল্পনা বা কর্মসূচিই তো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।  

সেদিন চকবাজারে বাবা-মা ও ভাইয়ের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া দগ্ধ শিশুটি, যার চোখের সামনে বাবা-মা ভাই পুড়ে ছাই হয়েছে। হাতের মেহেদি না শুকাতে নবপরিণীতা লাল টুকটুকে বধূটি, যার স্বামী নিজের দোকানে পুড়ে গিয়ে তার অঙ্গে তুলে দিয়ে গেছে সাদা কাপড়। যে বৃদ্ধ বাবা তার কলিজার টুকরা দুইপুত্রকেই হারিয়েছে, কিংবা ওই মিষ্টি মেয়েটির ওষুধ আনতে গিয়ে যে মা আর ফিরে এলো না।

এই মাতৃহীন, পিতৃহীন, স্বামীহারা, স্ত্রী সন্তান হারা হৃদয়ের কান্না চকবাজারের লোভী ব্যবসায়ীদের এতটুকু ও বিচলিত করছে না।

এ ঘটনায় সারাদেশ ভীত সন্ত্রস্ত। সেদিনের অগ্নিকাণ্ডের পর গ্যাস সিলিন্ডারসহ গাড়ি বা ভ্যান দেখলে হাত-পা কাঁপে। অথচ এই মৃত্যুপুরীর ব্যবসায়ীরা মেয়রকে ঘিরে ধরেছে, কেমিক্যাল সরাতে দিবে না।

সাধারণ মানুষের দাবি, পুরান ঢাকার সরু অলি-গলি থেকে কেমিক্যাল সরাতে হবে। রাস্তা প্রশস্ত করতে হবে। দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের স্বার্থে এই উদ্যোগ নিতেই হবে।

মৃত্যু অমোঘ। একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে। কিন্তু প্রাণ-চঞ্চল উচ্ছ্বল মানুষেরা চলার পথে পুড়ে মুহূর্তেই কয়লা হবে, এই বর্বরতা মেনে নেয়া যায় না। প্রিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মেয়র সাঈদ খোকন! আপনাদের কাছে দেশবাসীর আকুতি, এই কেমিক্যালের ভয়ঙ্কর ফাঁদ থেকে ঢাকাবাসী তথা দেশবাসীকে মুক্তি দিন। কেমিক্যাল গোডাউন এবং কসমেটিকস কারখানা লোকালয় থেকে দূরে কোথাও সরিয়ে নিন। আর সেটা করুন আজই।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত