ঢাকা      মঙ্গলবার ২১, মে ২০১৯ - ৬, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ - হিজরী

মেডিভয়েসকে একান্ত সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ

মেডিকেল কলেজ চালানোর মতো দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে

ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে ২০১৭ সালের ১২ জুন থেকে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ। দেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মেডিভয়েসের মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষক ও চিকিৎসক। আলাপচারিতায় শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার পাশাপাশি উঠে উঠে এসেছে নিজের বর্ণিল জীবনের নেপথ্য কথা। সাক্ষাৎকারে উপযুক্তভাবে গড়ে তোলা ও স্বাস্থ্যসেবায় নিজেদের একনিষ্ঠভাবে নিয়োজিত করতে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের প্রাণখোলা পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। 

মেডিভয়েস: স্যার কেমন আছেন?

ডা. খান আবুল কালাম আজাদ: খুব ভালো আছি।

মেডিভয়েস: আপনার শৈশব ও কৈশোরের গল্প জানতে চাই

ডা. খান আবুল কালাম আজাদ: আমরা পুরান ঢাকার মানুষ। বড় হয়েছি আজিমপুর সংলগ্ন ললিতমোহন দাস লেন এলাকায়। এখানেই আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। শৈশবে আমি যুদ্ধ বুঝি না, মানুষ বুঝি না, শান্তি বুঝি না; কিন্তু শৈশবের যে কৌতূহল, তা থেকে এতটুকু মনে পড়ে পাক-ভারত যুদ্ধ হয়। সিক্সটি ফাইভের কথা। পুরো দেশজুড়ে অরাজকতা। ধরুন, কোন একজন ভারতীয় সৈন্য ধরা পড়েছে, সে খবর শুনে পাকিস্তানিদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস-উল্লাস। চারিদিকে সাইরেন বেজে চলছে, রাতের বেলা হঠাৎ লোডশেডিং হচ্ছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে চারিদিক। আমার কেন যেন মনে হতো যে, মানুষ কেন এমন করছে? বাবা-মাকেও আলোচনা করতে শুনেছি যুদ্ধের কথা। আমাদের বাসাটা ছিল বিডিআর ১ নম্বর গেটের কাছে। বিডিআরের একটা বড় ভূমিকা ছিলো যুদ্ধে। যুদ্ধের পরের বছর আমি স্কুলে ভর্তি হতে যাই। সেটাই ছিল আমার শুরু।

মেডিভয়েস: স্যার, তারপর?

ডা. খান আবুল কালাম আজাদ: আজিমপুর ওয়েস্টার্ন হাইস্কুলে আমি প্রথম ভর্তি হই ক্লাস টুতে, পরবর্তীতে সেখান থেকেই এসএসসি পাস করি। তখন তো জিপিএর প্রচলন ছিল না, প্লেস করার ব্যাপার ছিল। আমি ছোটবেলা থেকেই শিক্ষকদের আদর পেতাম, স্কুলে ফার্স্ট হতাম। স্কুলে চারটা সেকশান ছিল, ৪টাতেই আমি ফার্স্ট হতাম; এবং বোর্ডে প্লেসও করি। আমরা যারা প্লেস করি, সবাই ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। ঢাকা কলেজ থেকে পাস করি ১৯৭৬ সালে। পাস করার পরে যুদ্ধপরবর্তী সে সময়ে সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। ভার্সিটিতে ছাত্ররা ভর্তি হয়ে পরীক্ষা দিতে পারছিল না, সেশনজট ছিল চরমে। আমাদেরকে বলা হলো ৭৬ সালে তোমরা কোথাও ভর্তি হতে পারবে না, তোমাদেরকে ১ বছর পিছিয়ে যেতে হবে। আবুল ফজল তখন জিয়াউর রহমান সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা। বঙ্গবন্ধু তখন মারা গেছেন। আমরা বেকার। ঢাকা শহরের পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়াই। নাটক দেখতে যাই বিকেলে, স্টেডিয়ামে খেলা দেখি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে বই পড়ি, বন্ধুদের নিয়ে তুমুল আড্ডা দেই। তখন থেকেই আস্তে আস্তে সব কিছু চিন্তা করার শুরু।

কিশোর থেকে তরুণ, তরুণ থেকে যুবক হচ্ছি। তখন পুরো ১ বছর কোন লেখাপড়া নেই, কিচ্ছু নেই। একটা ছেলে একেবারে নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। তারপর ’৭৭ সালের ব্যাচ যখন ইন্টারমিডিয়েট পাস করলো, সে বছরের নভেম্বরে আমরা ৭৬ ও ৭৭ দুটো ব্যাচ ভর্তিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হলাম। ডিসেম্বরের শেষের দিকে ভর্তিপরীক্ষা হলো। সেবারই প্রথম ১০০ নম্বরের এমসিকিউ পরীক্ষাপদ্ধতি আসে। প্রচণ্ড কম্পিটিশনের সে পরীক্ষায় দেখা গেলো। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি ঢাকা মেডিকেলে সুযোগ পেয়ে গেলাম। আমি কিন্তু ১ বছর কোন লেখাপড়া করিনি, একটা বইও ছুঁইনি। এখনকার সময়ে যারা কোচিং করে আসে, আমাদের শিক্ষাজীবনের কথা শুনলে হয়তো বলবে, এরা তো কোন মানুষের মধ্যেই পড়ে না, অপদার্থ!

তো, ১৯৭৮ এর ৪ জানুয়ারি ক্লাস শুরু করার পর ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বরে এসে ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষা দিতে পারলাম। নভেম্বরের ২৬ তারিখ আমাদের রেজাল্ট বের হলো। ২৬ তারিখ রেজাল্ট নিয়েই ডিজি অফিসে দিই। পর দিন আমি ইন্টার্নি ডাক্তার হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজে যোগদান করি।

এই যে সময়টা, সবারই একটা ব্যাখ্যা থাকে এটা নিয়ে। কিন্তু আমি বাস্তবতার নিরিখে বলবো, আমাদের যে মেডিকেলের শিক্ষাব্যবস্থা, কারিকুলাম সবকিছুই তখন শিশু অবস্থা থেকে বেড়ে ওঠছে। তখন শিক্ষকরাও জানতেন না যে, কারিকুলাম কিভাবে তৈরি করতে হয়, কারিকুলাম কাকে বলে। বিএমডিসি’র রেগুলেশন এতো স্ট্রং ছিল না। ইউনিভার্সিটির কন্ট্রোল এতো স্ট্রং ছিল না। ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে বিস্তর ফারাক ছিল। আমরা তখন অতি নগণ্য টাকায় সরকারি টাকায় ডাক্তার হয়েছি। বাবা-মায়ের পকেট থেকে টাকা খরচ হয়েছে, সেটা বাবা-মা বুঝতেই পারেননি। এখানে এসে স্কলারশিপ পেতাম। হোস্টেলে আমার জন্য একটি কক্ষ বরাদ্দ ছিল। ফাইনাল প্রফের আগে দেখলাম, আমার হোস্টেল ২৫ টাকার একটা বিল দিয়েছে। ৫ বছরের বিল হলো ২৫ টাকা। তখন যিনি আমাকে এটা দেখান, তাকে বললাম, আমার যখন পরবর্তীতে স্কলারশিপ আসবে, সেটা থেকে ২৫ টাকা কেটে নিবেন। তার মানে আমি সেই টাকাটাও পকেট থেকে দিলাম না। ওই সময়ে আমাদের লেখাপড়াটা এ রকমই ছিল। কিন্তু একটা জিনিস সত্য, আমাদের চোখে স্বপ্ন ছিল প্রচণ্ড রকম।

মেডিভয়েস: স্যার, ডিএমসির স্টুডেন্ট থেকে আজ আপনি ডিএমসির সর্বোচ্চ পদে। এ বিষয়টা আপনার কেমন লাগে?

ডা. খান আবুল কালাম আজাদ: আমি সবসময় একটা দোয়া পড়তাম, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন, যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন।  যখন আমি মেডিকেল কলেজে পড়ি, আমার স্বপ্ন তো ছিল শুধু প্রফেসর হওয়ার। প্রিন্সিপাল হওয়ার কোন স্বপ্ন ছিল না।

আস্তে আস্তে মেডিকেল অফিসার, রেজিস্ট্রার, কনসালট্যান্ট ও প্রফেসরসহ অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে এখানে উঠেছি। এ সিঁড়িতে আসতে আমাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে, অবর্ণনীয় যাতনা ভোগ করতে হয়েছে, একটি পদ থেকে আরেকটি পদে যাওয়ার জন্য। আমার জন্য সেটা ব্যাখ্যা করা অনেক কঠিন।

যেদিন আমি প্রফেসর হলাম, সারা পৃথিবী থেকে আমার জন্য অভিনন্দন বাণী এসেছিল। সেই সময়ে আমাদের পিএসসি দিয়ে আমাদের প্রফেসর হতে হয়েছিল। পিএসসির পরীক্ষায় ৫০ জন পরীক্ষা দেবেন, তার মধ্যে ২/৩ জনকে নেওয়া হয়। অথচ সবাই কিন্তু সমান, সবার ভালো রেজাল্ট, সবার ব্যাকগ্রাউন্ড অনেক ভালো। তাদের মধ্যে থেকে এই কয়জনকে এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে উঠানো হয়। এখন অবশ্য প্রফেসর হওয়া অনেক সহজ হয়ে গেছে।

আমি প্রফেসর হওয়ার পরেও আমার স্বপ্ন ছিল না যে ডিএমসির প্রিন্সিপাল হবো। পরবর্তীতে কিছুদিন বগুড়া মেডিকেলেও কাজ করি। একসময় আমাকে বলা হয়, তোমাকে ঢাকা মেডিকেলের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব নিতে হবে। আমার আগের যে প্রিন্সিপালরা ছিলেন, তারাও আমাকে বললেন যে, আপনি আমাদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ে চলেন, মন্ত্রী সাহেবের সঙ্গে দেখা করেন। আমি বললাম, না। আমি কোথাও যাবো না, আমি এখানেই থাকবো। তাঁরা যদি আমাকে যোগ্য মনে করেন, তাহলে আমাকে দিবেন। তারপর হঠাৎ একদিন মন্ত্রণালয় থেকে আমাকে ফোন করা হলো যে,  আপনি আসেন, তারপর গিয়ে প্রিন্সিপাল হিসাবে জয়েন করলাম। সেদিন আমার চাইতে আমার ছাত্রদের, ডাক্তারদের ও আমার চারপাশের মানুষদেরকে বেশি খুশি মনে হয়েছে। তাদের যে আনন্দ দেখেছি, সেদিন আমি বুঝেছিলাম, আমাকে ঢাকা মেডিকেলের অধ্যক্ষ হিসেবে পেয়ে তারা কতটা আনন্দিত! সেই দিনগুলোর কথা আমি চিরদিন মনে রাখবো। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন, যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন।

মেডিভয়েস: মেডিকেলে এবছর নতুন যে ব্যাচ আসছে, তাদের ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী? তারা কীভাবে পড়াশুনা করবে? সময়টা কিভাবে কাজে লাগানো উচিত?

ডা. খান আবুল কালাম আজাদ: আমি যখন ভর্তি হলাম, তখন আমার স্বপ্ন ছিলো, শিক্ষক হবো, প্রফেসর হবো। যেদিন আমি আমাদের মিলন চত্বর থেকে ঢুকি, বামে বয়েজ হোস্টেল, ডানে প্রিন্সিপাল স্যারের রুম। সিঁড়ি বেয়ে যখন উঠছি, চারদিকটা চকিতে একবার দেখে নিলাম। অসংখ্য বিখ্যাত মানুষের পদধূলিমাখা ও জায়গা থেকে পদধূলি এক হাতে মেখে আমার বুকের মধ্যে লাগিয়েছিলাম। আমি অত্যন্ত সৌখিন মানুষ হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা মেডিকেলের সমস্ত মানুষের পদধূলি বুকে লাগিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আজকে আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাটিকে বুকে ধারণ করলাম। আমি বলি, প্রথম মা আমার ধরিত্রি, দ্বিতীয় মা আমার গর্ভধারিনী মা, আর তৃতীয় মা হলো আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই যে এই মাটিটা ধরে আমি শপথ নিয়েছিলাম যে, ঢাকা মেডিকেলের সম্মান আমি রাখবো, আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছাতে আমার শেষ জীবনটা ঢাকা মেডিকেলে কাটিয়ে দিতে পারছি। আমি চেষ্টা করি এই ধূলোর সম্মান রাখার জন্য।

এখন নবীনরা যারা আসবে, তাদের হয়তো আমার চেয়ে কঠিন জীবনের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। যুদ্ধ করতে হবে। এখানে যুদ্ধ না করলে হবে না। নিজেকে আস্তে আস্তে যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। নতুনরা অবশ্যই অসাধারণ মেধাবী। মেধার স্বাক্ষর রেখেই তারা ঢাকা মেডিকেলে স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু এই ভর্তি হওয়াই বড় কথা নয়। আপনি যখন একে একে ৫টি বছর পার করে ফাইনাল এমবিবিএস সার্টিফিকেটটা নেবেন, সেদিন মনে করবেন আপনি একটি গেইট দিয়ে প্রবেশ করলেন। সেই গেইটটা কিসের? সেই গেইট হচ্ছে শিক্ষার গেইট, জ্ঞানের গেইট, আলোর গেইট, সেবার গেইট, সবশেষে আল্লাহ আমাদের যেটা বলেছেন মানুষের সেবা করার জন্য, এটা সেই সেবার গেইট। অর্থাৎ, তিনি এই গেইট দিয়ে ঢুকবেন, একেকটি করে বাধা পার হবেন, এবং তার জ্ঞানের দরজাগুলো খুলে যাবে। তার ভেতরটা আরও আলোকিত হবে, তার মধ্যে সে প্রশান্তির বাতাস বইবে, যেটা দিয়ে সে সত্যি সত্যি অন্য মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করতে পারবে। আমার একজন ডাক্তার এমন হবেন, তিনি যখন শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের পড়াবেন, তখন এতখানি মমতা দিয়ে পড়াবেন যে আমি যখন ছাত্র ছিলাম, আমি শেখার জন্য চেষ্টা করেছি। হয়তো অনেক প্রশ্ন করতে পারিনি, আমার স্যারকে জিজ্ঞাসা করতে পারিনি লজ্জায়, কিন্তু আমি সেই লজ্জা রাখবো না। আমি আমার ছাত্রদের সেই মমতা দিয়ে পড়াবো। আমার ছাত্র যেন শিখতে পারে। আমি যেন বলতে পারি যে, আমি আমার ছাত্রদের ভালো কিছু শিখাতে পারি। এটাই হলো পার্থক্য।
এজন্য আমি বলবো, আজকের তরুণদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি শুধু একটা সার্টিফিকেট অর্জন করে জীবিকা নির্বাহ করবো, অর্থ উপার্জন করে দামি গাড়ি কিনবো, ১০টা বাড়ি করবো, বিদেশে ঘুরে বেড়াবো, যা ইচ্ছা তাই করবো? নাকি সত্যিকারার্থে আমার নামটা ইতিহাসে থাকবে?

'আমি একজন ভালো ডাক্তার হবো, আমি একজন ভালো শিক্ষক হবো, সর্বোপরি ভাল একজন মানুষ হবো' -এই কথাটা যদি কেউ নিজের ভিতর থেকে প্রতিদিন একবার করে বলতে পারে, তাহলে সেই সত্যিকারের একজন ভালো মানুষ হয়ে আমাদের সমাজের জন্য সেবা করতে পারবে এবং সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে পারবে।

মেডিভয়েস: স্যার, তরুণ ডাক্তারদের কি কাজের ক্ষেত্র  কমে আসছে? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তাদের অল্প বেতনে চাকরি করতে হচ্ছে। সেটা কেন?

ডা. খান আবুল কালাম আজাদ: আমি বলবো যে, একটা সময়ে আমাদের চাকরির জায়গাগুলো খুব সংকুচিত ছিল। সরকারি লেভেলে এতো চাকরি ছিল না। কিন্তু, বিগত ৮/১০ বছরের তুলনায় বিসিএস এখন রেগুলার। এখন ৩৯তম বিসিএসের কার্যক্রম চলছে। সেখানে প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার ডাক্তার জয়েন করবে। প্রায় ১০ হাজার ডাক্তার আমাদের পাইপলাইনে রয়েছে। তাহলে এই কর্মক্ষেত্রের সংস্থান কিন্তু হচ্ছে।

১৯৮৩ সালে আমি যখন ডাক্তার হই, সে সময়ে প্রাইভেট হাসপাতাল, মেডিকেল এসব খুব বেশি ছিল না। এখন বাংলাদেশে মেডিকেল কলেজে সংখ্যা অনেক বেড়েছে। সেখানে ডাক্তারদের চাকরির সুযোগ রয়েছে। এখন দেশে হাজার হাজার ক্লিনিক, সেখানে চিকিৎসকদের জয়েন করার সুযোগ রয়েছে। আমি বলবো, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আমরা অনেক এগিয়ে। আমাদের তরুণরা যদি যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে, তাহলে কর্মসংস্থানের অভাব হবে না। সরকার এখন বেশ ভালোই বেতন দিচ্ছেন। একইভাবে প্রাইভেট সেক্টরেও এখন ভালো বেতন দিচ্ছে। সেই জন্যে আমার মনে হয়, নতুনদের খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

মেডিভয়েস: রোগীরা অভিযোগ করেন যে, ডাক্তাররা তাদের সঙ্গে ভালভাবে কথা বলেন না, বা বুঝিয়ে বলেন না, এ বিষয়টিকে কিভাবে দেখেন?

ডা. খান আবুল কালাম আজাদ: আমাদের স্কিল ডেভেলপমেন্টের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে, কমিউনিকেশন। আপনি রোগীর সঙ্গে যখন কথা বলা শুরু করবেন, আপনাকে কতগুলো কাজ করতে হবে। রোগীর ইতিহাস নেবেন, রোগীকে ইনভেস্টিগেশন সাজেস্ট করবেন। ইনভেস্টিগেশন করে ইন্টারপ্রিটেশন করবেন, রোগীর আগামী চিকিৎসাপন্থা নির্ধারণ করবেন, রোগীর জীবন কিভাবে চলবে, সেগুলো বলবেন। এইসব কথা না বললে তারা জানবে কী করে?

ডাক্তারের সেবাটা একটা মূল্য তালিকার মতো নয়। আপনি হোটেলে গেলেন, মুরগির মাংস এইরকম, খাসির মাংস... এইরকম, নাহ! আপনাকে বুঝিয়ে বলতে হবে, তার সঙ্গে অনুভূতির আদান-প্রদান করতে হবে। ধরুন, কোন রোগীকে আপনি বলছেন, 'আহ! আপনি তো দেখছি আজকে বেশ ভাল, সমস্ত রিপোর্টও ভালো, আপনি আল্লাহর রহমতে খুব ভাল আছেন', দেখবেন রোগী খুব খুশি হচ্ছে। এটা হলো একটা এক্সপ্রেশন। আরেকটা হলো, আপনি একটা খারাপ লোক, আপনার কোন রিপোর্ট ভালো না। এগুলো আপনার কিভাবে বলা উচিৎ? এই যে 'ব্রেকিং দ্য ব্যাড নিউজ', সেটা চর্চা করাটাও একধরনের আর্ট। এটাই আমাদের কমিউনিকেশন স্কিল।

অনেক সময় রোগী এসে বলেন, 'আমি আপনার কাছে আসলে এমনিতেই ভাল হয়ে যাই কোন ঔষধ লাগে না। আপনি ঔষধ লিখলে লেখেন, না হয়, না লেখেন, কিছু আসে যায় না'। সেই ডাক্তার আমরা কোথায় পাই? এমন ডাক্তারই তো আমার দরকার।

মেডিভয়েস: কখনো দেখা যায় যে, অনেক শিক্ষার্থী হতাশায় আত্মহত্যা করে। এটা নিয়ে আপনাদের বিশেষ কোন পরিকল্পনা আছে কিনা?
ডা. খান আবুল কালাম আজাদ: একটা ছাত্র যখন উচ্চশিক্ষায় আসে তার মধ্যে অনেক রকম চিন্তা ধ্যান-ধারণা কাজ করে। প্রযুক্তির লাগামহীন ব্যবহারটাও এখন নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে। অনেকেই পরীক্ষাকে কঠিন মনে করে, নিয়মিত লেখাপড়া কঠিন মনে করে, হতাশায় ডুবে যায়, কখনো কখনো মাদকাসক্তও হয়ে পড়ে।
সেজন্য প্রত্যেক ইনস্টিটিউশনে, এমনকি ঢাকা মেডিকেলে আমরা একটি মানসিক কাউন্সেলিং বডি করেছি। এখানে প্রায় ১৫ জন শিক্ষক কাজ করেন। কোন স্টুডেন্টের যদি মেন্টাল ডেভিয়েশন দেখা হয়, তাকে সেখানে কাউন্সিলিং করবে। এটা আমরা করছি।

মেডিভয়েস: স্যার, পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরে আমাদের মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বাড়ছে। আসলেই এতগুলো মেডিকেল কলেজের মান নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব?

ডা. খান আবুল কালাম আজাদ: আমার দেশে ডাক্তার কম বলে সবাই হাহাকার করতো।  আমাদের প্রাইমারি হেলথ কেয়ার বা বেসিক হেলথ রাইটই একসময় ছিল না। মানুষ খোলা মাঠে টয়লেট করতো। এখন আমার হাসপাতালগুলো চালাবার মতো চিকিৎসক দরকার। সেজন্যই তো মেডিকেল কলেজ করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, মেডিকেল কলেজ চালানোর মতো দক্ষ শিক্ষক আমরা তৈরি করতে পারিনি। আমার মনে হয়,আমরা যদি দক্ষ শিক্ষক তৈরি করতে পারি, তাহলে আমরা আগামীতে আরো ভাল করতে পারবো।

মেডিভয়েস: স্যার, মেডিভয়েস সম্পর্কে আপনার প্রত্যাশা কী?

ডা. খান আবুল কালাম আজাদ: এই যে এতোক্ষণ বসে সময় (সাক্ষাৎকার) দিলাম, সেটা যদি মেডিভয়েস পত্রিকায় প্রকাশ করে সাধারণ ছাত্রদের নিকট আমার কথাগুলো তুলে ধরে, তাহলেই সময়টা সার্থক।

মেডিভয়েস: স্যার, মেডিভয়েসকে সময় দেবার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

ডা. খান আবুল কালাম আজাদ:   আপনাদেরও অসংখ্য ধন্যবাদ।

(সাক্ষাৎকারটি মেডিভয়েসের জানুয়ারি ২০১৯ প্রিন্ট সংখ্যায় প্রকাশিত)

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর