ঢাকা      শুক্রবার ২০, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৪, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী

লেখালেখি আমার পেশাকে সমৃদ্ধ করেছে: ডা. তাজুল ইসলাম

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম গত শতকের শেষ দশক থেকে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ‘মানসিক স্বাস্থ্যের’ ওপর অবিরাম লিখে চলেছেন। প্রকাশিত সেসব লেখা নিয়ে ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম বই ‘মনের সুখ মনের অসুখ’। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। একটি ভ্রমণকাহিনীসহ একে একে লিখেছেন ১৬টি বই। এবারের বইমেলায় ‘মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পরিচর্যা’ ও ‘আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা সাফল্যের মূল চাবিকাঠি’ শিরোনামে দুটি বই এসেছে তাঁর। সম্প্রতি মেডিভয়েস মুখোমুখি হয়েছিল এ চিকিৎসকের। আলাপচারিতায় উঠে এসেছে তার জীবনের বিভিন্ন দিক। পাঠকদের কাছে তা তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানভীর তনয়।  

মেডিভয়েস: লেখালেখির শুরুটা কিভাবে?
অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: ছোটবেলায় যখন স্কুলে পড়তাম, তখনই আমার লেখালেখিটা শুরু। একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবসসহ বিভিন্ন দিবস কেন্দ্রীক কবিতা লিখতাম। পরবর্তী সময়ে মেডিকেল কলেজে এসেও লেখালেখি অব্যাহত ছিল। সে সময় মাসিক ‘কলম’ পত্রিকায় ‘বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ গল্প’ শিরোনামে একটা সংকলন বের করেছিল। ওই সংকলনে আমার একটা গল্প স্থান পেয়েছিল। সেটা ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে। এরপরও বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করতাম।

পেশাগত জীবনে একজন সাইক্রিয়াটিস্ট হওয়ার সুবাদে  জাতীয় দৈনিকে দেশের প্রথম চিকিৎসক হিসেবে ‘মানসিক স্বাস্থ্যের’ ওপরে আমি লেখালেখি শুরু করি। এক্ষেত্রে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন বোধ করছি, বাংলাদেশে এর আগে খবরের কাগজগুলোতে ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ নামে কোনো বিভাগই ছিল না। তখন বিভিন্ন ম্যাগাজিন, সাময়িকীতেও এ বিষয়ের ওপর নিয়মিত লিখতাম। তারপর ১৯৯০-৯১ এর দিকে পত্রিকাতে ‘মানসিক স্বাস্থ্যের’ উপর লেখা শুরু করি। আমার প্রথম বই ‘মনের সুখ মনের অসুখ’ (১৯৯৫) এবং দ্বিতীয় বই ‘মানসিক সমস্যার ধরন, কারণ ও প্রতিকার’ (২০০১)। বই দুটি বিগত সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলো নিয়ে ছাপানো।

মেডিভয়েস: এ পর্যন্ত আপনার লেখা কী কী বই প্রকাশিত হল?
অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: আমার লেখা ১৬টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্যে একটা হলো ‘গ্রেট পিরামিড টু গ্রেট ওয়াল’। এটি ভ্রমণ কাহিনী। বাকি সবগুলোই স্বাস্থ্য বিষয়ক। এবারের বইমেলায়ও ‘মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পরিচর্যা’ ও ‘আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা সাফল্যের মূল চাবিকাঠি’ শিরোনামে দুটি বই এসেছে। এর আগে শিশু স্বাস্থ্য বিকাশে ৩টা বই আমি লিখেছি, যা সিরিজ আকারে তিন খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যেমন, ব্যক্তিত্বের উন্নয়ন, আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি, আত্ম নির্মাণসহ এ জাতীয় বই-ই বেশি লেথা হয়েছে।

মেডিভয়েস: এবারের বই মেলায় প্রকাশিত ‘আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা সাফল্যের মূল চাবিকাঠি’ নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাই, কোথায় পাওয়া যাচ্ছে বইটি।

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম:  বইটিতে সাম্প্রতিক নানা ইস্যু যেমন: আত্মহত্যা, পরকীয়া, সহিংসতা ও পারিবারিক বিরোধসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে। এ বইয়ের লেখাগুলো একটি জাতীয় দৈনিকে বিভিন্ন সময় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এতে আত্মহত্যার কারণ হিসেবে আমাদের প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থায়, আইকিউ-নির্ভর মেধা যাচাইয়ের পদ্ধতির ত্রুটিকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছি। বর্তমানে শিক্ষার্থীরা শুধু জিপি-এ ফাইভ, গোল্ডেন ‘এ প্লাসের’ চিন্তা করে পড়াশুনা করছে। কিন্তু এর বাহিরেও আরও অনেক বুদ্ধিমত্তার বিষয় আছে। মনোজাগতিক চিকিৎসক হিসেবে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ একটা স্টাডি আছে, জীবন সফলতার জন্য মাত্র ২০%  একাডেমিক বুদ্ধিমত্তা কাজ করে আর বাকি ৮০%  হচ্ছে অন্যান্য ফ্যাক্টর, বিশেষ করে আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা।

আত্মোপলব্ধির পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রকে বোঝার জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলা, সকল আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং যথাযথভাবে কাজে লাগানো জরুরি। অর্থাৎ সব জায়গায় নিজেকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত করার যে আবেগীয় সক্ষমতা এটাই হলো ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স। এটার বিশাল একটা ব্যাপ্তি আছে। গুরুত্ব ও ব্যাপকতার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে এ বিষয়টির ওপর আরও  ২/৩টা বই লেখার আশা রাখি। আমাদের সকল ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের এটা জানা দরকার।

নতুন দুটিসহ আমার সবগুলো বই-ই এশিয়া পাবলিকেশন্সে পাওয়া যাবে। এর স্টল নাম্বার হচ্ছে- ৫৮৩, ৫৮৩, ৫৮৪।

মেডিভয়েস: আপনার প্রথম বই সম্পর্কে কিছু বলুন?
অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: আমার প্রথম বই ‘মনের সুখ মনের অসুখ’। আগেই বলেছি, আমিই প্রথম মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করি। আমি তখন ঢাকা মেডিকেল থেকে সদ্য পাস করা সাইক্রিয়াটিস্ট এবং রেজিস্টার হিসাবে কাজ করি। সে সময় পত্রিকায় অনেকগুলো লেখা ছাপা হওয়ার পর আমার কয়েকজন শুভাকাঙ্খী পরামর্শ দিলেন, এটাকে যেন বই হিসেবে প্রকাশ করি। তারপর আমিও ভাবলাম বিষয়টি গঠনমূলক। এভাবেই বইটা বের করে ফেললাম। বইটা মূলত আমাদের হীনমন্যতা, সন্তান লালন-পালন ও ব্যক্তিত্বের উন্নয়নসহ বিভিন্ন মানসিক সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে লেখা।

মেডিভয়েস: পেশাগত দায়িত্ব পালন ও লেখালেখি, কিভাবে সমন্বয় করেন?
অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: আমি আসলে পেশাগত জীবন থেকে লিখি। আমি তো আর উপন্যাস বা গল্প কবিতা লিখি না। এখন যা লিখছি, এটা আমার পেশারই অংশ। এখান থেকে আমার অনেক শিক্ষা হয়েছে। কারণ, একটা বই লিখতে গেলে দশটা বই পড়তে হয়, একশোটা জার্নাল দেখতে হয়। অতএব আমার অভিজ্ঞতা হলো, আমার অন্য বন্ধুরা সাইক্রিয়াটিস্ট হতে গিয়ে যেভাবে শিখছে, বই লিখতে গিয়ে শেখার মাত্রাটা আমার বেশি মজবুত হচ্ছে। আমি মনে করি, আমি লিখতে গিয়েই অনেক বেশি সমৃদ্ধ হতে পেরেছি। লেখালেখিই আমাকে একজন ভালো সাইক্রিয়াটিস্ট হিসেবে গড়ে তুলেছে। অতএব লেখালেখিটাকে আমার পেশারই অংশ। আসলে যারা জানতে চায়, যারা শিখতে চায়, তাদের পেশা কোন সমস্যা না। আমার দেখা মতে, যারা জ্ঞানান্বেষী, তাদের এটা কোন সমস্যা না। তারা চেম্বার, চাকরির মধ্যে দিয়েই পৃথিবীর খবরাখবর রাখে, সবকিছুই করতে পারে।

মেডিভয়েস: যারা নতুন লিখিয়ে, বিশেষ করে মেডিকেল শিক্ষার্থী তাদের জন্য কী পরামর্শ দেবেন?
অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: তাদের ব্যাপারে আমার মন্তব্য একটাই, লিখতে হবে। একজন বড় লেখকের একটা কথা আছে, তুমি যদি কোন বিষয়ে খুব ভালোভাবে জানতে চাও, তাহলে সে বিষয়ে তুমি লেখালেখি শুরু করো। কারণ, লিখতে গেলেই তোমাকে সে বিষয়ে ভালো জানতে হবে। দশটা বই একত্র করে তার নির্যাসটা নিয়েই তোমাকে লিখতে হবে। যারা নতুন লেখক, তাদেরকে বলবো, তোমার নিজের শিক্ষার জন্যই তোমাকে লিখতে হবে এবং পড়তে হবে। নিজের বিদ্যার প্রসার ঘটানোর জন্যই তোমাকে লেখালেখির জগতে আসতে হবে। দুই নম্বর বিষয় হলো, তুমি এতো দিন যে শিক্ষাটা অর্জন করেছো, সেটা যদি লিখে প্রকাশ করতে পারো, তাহলে অনেক সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই উপকৃত হবে। যেটা চেম্বারে বসে সম্ভব নয়।

মেডিভয়েস: আপনার জন্ম, শৈশব, পড়ালেখা?
অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: আমার জন্ম হলো চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলায়। আমরা ৫ ভাই, ১ বোন। আমার বাবা মারা গেছেন। মা খুবই অসুস্থ অবস্থায় আছেন। আমি মতলব হাই-স্কুলে পড়েছি। এরপর ঢাকা কলেজে। আমি সরাসরি আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের ছাত্র। তারপর আমি বুয়েটে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। তারপর আমি চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি হই। সেখান থেকে ১৯৮৪ সালে আমি এমবিবিএস করি। তারপর ১৯৯২ সালে এফসিপিএস পাস করেছি। ২৬ বছর হয়েছে আমি সাইক্রিয়াটিস্ট হয়েছি।

মেডিভয়েস:পছন্দ করেন কী কী?
অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: আমি পড়তে এবং লিখতে খুবই পছন্দ করি।

মেডিভয়েস: আপনার জীবনে স্বপ্ন?
অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: এখন আর স্বপ্ন দেখি না। আল্লাহর রহমতে আমার সব স্বপ্নই পূরণ হয়েছে।

মেডিভয়েস: স্যার, মেডিভয়েস সম্পর্কে কোনো পরামর্শ?
অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: মেডিভয়েস অনেক ইতিবাচক কাজ করে যাচ্ছে। শত প্রতিবাদী স্বরকে একতাবদ্ধ করে একই সুরে গাইতে মেডিভয়েস কাজ করে যাবে বলেই আমি আশাবাদী। চিকিৎসক সমাজের ন্যায়সঙ্গত বিষয়গুলোতে সবসময় পাশে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর