ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৪, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


আমাদের দায়বদ্ধতা আসলে কোথায়?

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের ডাস্টবিনে মৃত ভ্রুন এবং ভ্রুনের অংশবিশেষ পাওয়া সংক্রান্ত গতকালের নিউজটা দেখে প্রথমে নিজেই একটু আতংকিত হয়ে পড়লাম। এটা কী বলে, একসাথে এতগুলো ভ্রুণ! কতগুলো ফ্যাক্ট মাথায় স্ট্রাইক করতে লাগল। কেউ কেউ আবার আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো বৈধ-অবৈধ কাজকর্মের আভাস ইঙ্গিতও দিয়ে ফেলেছেন ইতোমধ্যে। আর মেডিকেল সংশ্লিষ্টরা ভাবছেন, আরেহ, এমনটা হয় নাকি! কোথাও একটা বড় রকমের গড়বড় নিশ্চয় হয়েছে।

প্রাকটিক্যাল ল্যাবের স্পেসিমেন মানে নমুনা ডাস্টবিনে আসল ক্যামনে? এগুলো তো প্রপার ওয়েতে ডিসপোজাল হওয়ার কথা। আয়া বুয়া মাসি যারা বিনে ফেলছেন, তারা ভাবছে ফেলার জিনিস ফেলে দিয়েছি, এত হাউকাউ এর কী আছে, বুঝিনা বাপু। এদিকে মিডিয়ার ঘন্টায় ঘন্টায় ব্রেকিং নিউজে আমরা ম্যাঙ্গোপিপল আতংক আর উৎকন্ঠায় চিড়ে চ্যাপ্টা। অবশ্য নিউজের নাকি টিআরপি বাড়ানোই শেষকথা, যত পারো আতংকিত করো।

প্রকৃত ঘটনার ব্যাখ্যা পেলে কেউ তো খবর খাবে না। হোক জনমনে অশান্তি, হোক ভুলবোঝাবুঝি, আমার কি? আমি তো আমার কাজ করেছি। তারপরও কমনসেন্সে বলে কিছু একটা ব্যাপার থাকে বলে জানতাম।

একটা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী ডেলিভারির জন্য ভর্তি হন। এরমধ্যে অনেকেই অপরিনত, অপূর্ণ, জন্মগত ত্রুটিপূর্ণ, মৃত সন্তান জন্মদানও করেন। অনেকে আবার মৃত বাচ্চা নিতেও চায়না। এসব ক্ষেত্রে সেসব বাচ্চা বা ভ্রুণ স্টুডেন্টদের প্রাকটিক্যাল ক্লাশে, গবেষণার কাজে লাগে সেগুলোকে যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে ফরমালিনের জারে করে ল্যাবে সংগ্রহ করা হয়, বিশ পঁচিশ এমনকি ত্রিশ বছরের জন্যও। যখন ফরমালিনের গুনাগুন নষ্ট হয়ে যায়, তখন সংরক্ষিত ভ্রুন কিংবা স্পেসিমেনগুলো পঁচতে শুরু করে। ফলে সেগুলো ডিসপোজাল করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

গলদটা হয়েছে ওই ডিসপোজালে। যেকোনো ওয়েস্ট প্রডাক্ট ডিসপোজালের দায়িত্বে থাকে নির্দিষ্ট কিছু কর্মচারী। এরা ঠিকঠাক জানে কোথায় কী ডিসপোজ করতে হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ওনারা কোনো কমান্ড আমি আবারো বলছি, কমান্ড ঠিকঠাক শুনতে চায়না। জ্বি ঠিক শুনেছেন। এদের ভয়ংকর ইউনিয়ন আছে। হাসপাতালের ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার থেকে শুরু করে সকল বর্জ্য ব্যাবস্থাপনায় এরা জড়িত। তারা তাদের কোন কাজ ঠিকমতো না করলেও বকশিসের ধান্ধায় ঠিকই থাকে। রোগীর ট্রলি ধরতে টাকা, ক্যাথেটার করালে টাকা, ক্যাথেটার খোললে টাকা, বাচ্চার মুখ দেখালে টাকা, মিষ্টি খাইতে টাকা। 

সারারাত জেগে বাচ্চা ডেলিভারি করালাম, দেখা গেলো বাচ্চাকে কোলে দিতে দিতে ডাক্তারদের নাম করে নিলো টাকা। আমাদের কষ্টের বিনিময়ে এদের পেটমোটা হয়, রোগীদের ভোগান্তি বাড়ে, বাড়ে খরচও। এরা প্রয়োজনে ডাক্তার বেঁচে দিয়ে হলেও রোগীর টাকা নিবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে এরা বছরের পর বছর একই জায়গায় পোস্টেড থাকে। কোনো বদলি বা পানিশমেন্ট এদের উপর দিয়ে যায়না। একটু কিছু বললে, ধোয়ামোছা ঝাড়ু দেয়া সব বন্ধ। যেকোনো ডিপার্টমেন্ট অচল করে দিতে এদের একদিনের বেশি দুইদিন লাগে না। এদের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষও বড়ই উদার।

সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টাল হেড বলেছেন এগুলোকে ডিসপোজ করতে। তাহারা নিয়ে গিয়ে জারসহ বিনে ফেলে দিয়ে আসল, হলো কিছু!

কেন রে ভাই! তুমি বা তোমরা কী জানো না, মেডিকেলের কোন বর্জ্য কোথায় ফেলতে হয়? জুতা সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ যদি ডাক্তারকেই করতে হয় তাহলে তোমাদের কাজটা কী শুনি? আসলে তোমরা খুব ভালো করেই জানো কিন্তু ওই যে প্রফেশনাল ন্যাগলেজেন্সি। তোমাদের কে কি বলবে? হোক অপ্রয়োজনীয়, হোক পঁচাগলা, মানুষের ভ্রুণ তো, নাকি? যথাযথ প্রক্রিয়ায় সম্মানের সহিত মাটিচাপা দেয়া উচিত ছিলো অথচ ফেলে দিলা ডাস্টবিনে! এটা যে কারো পক্ষেই মেনে নেওয়া কষ্টকর এবং আতংকিত হওয়ার মতোই ঘটনা। আর মিডিয়া তো আছেই ঢোলের বাড়ি দিতে।

নিউজ করার আগে একটিবার যদি জেনে নিতো প্রকৃত ঘটনা কী। মানছি ব্যাপারটা সহজ করে দেখার কিছু নাই তারপরও জারে সংরক্ষিত ভ্রুণগুলোকে লাশ বলে প্যানিক সৃষ্টি করতে তাদের একটুও বাধেনি। বাঁধেনা, আগেও এমন দেখেছি। আরো দেখব আশা রাখি।

একটা বিষয় লক্ষনীয় যে, যেই ঘটনা ঘটাক না কেনো, পানিশমেন্ট কিন্তু গেছে একেবারে জায়গামতো। এমনি যায় যুগে যুগে। তিনি অবশ্য দায় এড়াতে পারেন না। আর ডাক্তার হিসাবে দায় আমরাও এড়াতে পারিনা। ওইদিকে অঘটনঘটনপটিয়সীরা আছেন দিব্যি বহাল তবিয়তে। এদেশে ডাক্তার হওয়া পাপ। আরো বড় পাপ সহ্য করা। সহ্য করতে করতে একসময় রোবট হয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। সমস্যা হচ্ছে রোবটের কাছে মানবিকতা আশা করা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছি না। আপনারা কী পারছেন সুহৃদ?

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর