ডা. শামসুল আলম

ডা. শামসুল আলম

অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী চিকিৎসক,

সাবেক শিক্ষার্থী, ওসমানী মেডিকেল কলেজ, সিলেট। 


২০ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ১২:৪১ পিএম
আমার বন্ধু "ক" এর জীবন থেকে নেয়া

আত্মহত্যার আত্মকাহিনী

আত্মহত্যার আত্মকাহিনী

যে রাতে আমি প্রথম আত্মহত্যার সিদ্বান্ত নিয়েছিলাম, সেদিন সন্ধ্যা থেকেই খুব বৃষ্টি ছিল, এতো অভিমানী আর কষ্টের বৃষ্টি আমি আগে কখনো দেখিনি। সে সময় আমাদের কোন মোবাইল ছিল না, কি মনে করে আমি বিকেলে রিপনদের বাসায় গল্প করতে গেলাম এবং সেখানেই শুনলাম নাদিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে। খবরটা শুনা মাত্র আমার মনে হলো আমি যেন আমার সমস্ত ভর হারিয়ে ফেলেছি। বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা অনুভব করলাম। এক মুহূর্তে আমার জীবনটা কেমন অর্থহীন হয়ে গেলো।

মালিবাগ থেকে হেঁটে হেঁটে আমি যখন আমাদের শাহজাহানপুরের বাসায় আসছিলাম, মনে মনে শুধু একটা কথাই ভাবছিলাম, আমি কেন নাদিয়াকে এতটা ভালোবেসেছিলাম? কেন?

বাসায় এসে কিছু না খেয়ে চুপ করে শুয়ে পড়লাম, কিন্তু কোনো ঘুম নেই। সারা রাত জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখলাম, আকাশ দেখলাম, তারপর ভোর রাতের দিকে সিদ্বান্ত নিয়ে নিলাম, মৃত্যুই আমার একমাত্র পথ। আমি আসলে আর পারছিলাম না। প্রায় এক বছর ধরে আমাকে এক গভীর বিষন্নতা আঁকড়ে ছিল, কোনো ভাবেই মুক্তি খুঁজে পাচ্ছিলাম না, নাদিয়ার উপর নির্ভর করে একটু বাঁচতে চেয়েছিলাম কিন্তু সেটা আর হলোনা। বিষন্নতার শুরুটা আমার বড় বোনটাকে নিয়ে, আমার এই বোনটাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি, আমি তাঁকে রবীন্দ্রনাথের মত ভালোবাসি।

সেই প্রথম যেদিন আপুর টেবিল থেকে চুরি করে রবীন্দ্রনাথের “শেষের কবিতা” পড়েছিলাম। সেদিন আমি লাবন্যকে আমি আমার বড় আপুর মত কল্পনা করেছি। হৈমন্তীও যেন ঠিক আপুর মত তাকায় আর গোরা উপনাস্যের নায়িকা সুচরিতা আর কেউ না, স্রেফ আমার আপু। মনে হতো সবগুলো চরিত্র যেন আমার বোনটাই ধারণ করে আছে। কিন্তু আমার সেই বোনের ঘর হয়নি, মা নীরবে কাঁদতেন। শশুর বাড়িতে মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে। তারপর একদিন আমার অভিমানী বাবা আপুকে এক কাপড়ে আমাদের বাসায় নিয়ে আসেন, বাবার কথা একটাই, "যে ছেলে আমার মেয়ের গায়ে হাত তুলেছে সে পশু আর আমার মেয়েকে স্পর্শ করতে পারবে না "।

আপু যেদিন ফিরে আসলো, সেদিন থেকে আমার ছোট বোন সহ আমাদের পাঁচজনের জীবনটা কেমন বদলে গেলো। একমাত্র ভাই হয়ে আমি কিছুই করতে পারছিনা এই কষ্ট আমি কারো সাথে শেয়ার করতে পারিনি। বিষন্নতার শুরুটা আসলে সেখান থেকেই। প্রথমে ভেবেছি ট্রেনের নীচে ঝাঁপিয়ে পড়বো, সবাই মনে করবে এক্সিডেন্টে মারা গেছি, কিন্তু পরে চিন্তা করলাম যদি না মরি আর হাত -পা কাটা পড়ে তাহলে পরবর্তী জীবন পঙ্গু হয়ে থাকতে হবে। ভয়াবহ আরেক জীবন, গলায় রশি না দিয়ে ঘুমের বড়ি সবচেয়ে সহজ ও ব্যথা মুক্ত মনো হলো, একবার চিরনিদ্রায় শুয়ে পড়া।

দুই.

ভোর হলো কিন্তু আমার আর কোনো আলো দেখার ইচ্ছে হলো না। চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকার চেষ্টা করলাম। মনে মনে ভাবতে থাকলাম কখন ঘুমের ঔষধ কিনতে বের হবো! কখন খাবো! কোথায় খাবো! এমন সময় মা আমার রুমে আসলেন। বিছানার পাশে এসে বসে বললেন,

-বাবা, আমাকে একটু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবি?

-কেন মা? কি হয়েছে?

-বুকে খুব ব্যথা করছে। কি করবো বুঝতে পারছিনা।

মায়ের শরীরটা অনেকদিন থেকেই ভালো না। প্রায় রোজ বিকেলে জ্বর, রাতে এক ধরণের শুকনো কাশি, প্যারাসিটামল খেয়ে খেয়ে আছেন। মাকে বললাম,

-যাও রেডি হয়ে আসো।

মনে মনে চিন্তা করলাম একটা দিন পরে মরলে এমন কিছু আসে যাবে না। মাকে অন্ততঃ ডাক্তার দেখিয়ে যাই। ডাক্তারের কাছে গেলাম। তিনি ভালো করে মাকে দেখে বললেন,

-খারাপ কিছু হতে পারে, আপনি কিছু রক্ত পরীক্ষা আর বুকের এক্সরে করে আজকেই আবার দেখা করবেন।

সবকয়টি রিপোর্ট নিয়ে যখন আবার ডাক্তারের কাছে গেলাম, তিনি বললেন, 

-আপনার মাকে জরুরি হাপাতালে ভর্তি করতে হবে, উনার বুকে অনেক পানি জমেছে, এই পানি বের করতে হবে, তা নাহলে উনার ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট আরো বাড়বে। মনে হচ্ছে উনার অনেক দিন থেকে ফুসফুসে যক্ষা হয়েছে। আমরা চিকিৎসার ব্যবস্থা করছি।

মাকে হাসপাতালে ভর্তি করলাম, বুকের পানি বের করা হলো। যক্ষা রোগের চিকিৎসা শুরু হলো কিন্তু তিন- চার দিন পর মায়ের খুব খারাপ নিউমোনিয়া হলো। মা অজ্ঞান হয়ে গেলেন। ডাক্তারগন বললেন, রক্তে ইনফেকশন ছড়িয়ে গিয়েছে এবং মায়ের কিডনি ভালো কাজ করছে না, উনি বাঁচা-মরার লড়াই করছেন।

আমি হাসপাতালে মায়ের বিছানার পাশে বসে থাকি, মা কষ্ট করে শ্বাস নিচ্ছেন। জ্ঞান ফেরেনি প্রায় পাঁচ দিন। মা এমন অসুস্থ কিন্তু আমি নির্বিকার। আমার কোনো দুঃশ্চিন্তা নেই বরং এক রকমের শান্তি অনুভব করছি, মনে হচ্ছে মা আমার মারা গেলেই ভালো হবে। আমার অকাল মৃত্যুর কষ্টটা মাকে পেতে হবে না। একদিন-দুইদিন করে প্রায় দশদিন, মা এই ভালো -এই খারাপ এমন করে হাসপাতালে পড়ে আছেন। আমার শুধু এখন মায়ের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা। কিন্তু মা আমার মরলেন না। শরীরটা দুর্বল আর শুকিয়ে কাঠি হয়ে গেছেন, কিন্তু মুখের হাসিটা ধরে রাখলেন। মাকে দেখে সত্যি অবাক হলাম। ছোট অফিসের কর্মচারী বাবার এই দুঃখ-কষ্টের সংসারটার মায়া তিনি ত্যাগ করতে পারলেন না।

তারপর মা একদিন বাসায় ফিরে আসলেন। বড় আপু মায়ের পছন্দের ছোট মাছ ভুনা করলো। হাসি মুখে মা খেলেন। এরপর শুরু হলো মায়ের আরেক যুদ্ধ। ছয় মাস টিবি রোগের ঔষধ খাওয়া। প্রায়শঃ বমি করতেন, একবার লিভার খারাপ করলো তবুও সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করে গেলেন। বেঁচে থাকার জন্য মায়ের সেই তীব্র লড়াই আমাকে একধরণের শক্তি দিলো। আমি আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। এক পর্যায়ে আমার মনে হলো, আমাদের একেকটা নতুন দিন আসলে একেকটা নতুন জীবন।

অসুস্থ হওয়ার প্রায় দেড় বছর পর অবশেষে মা মারা গেলেন কিন্তু আমি বেঁচে রইলাম। মা যেদিন মারা গেলেন, ঠিক তার আগের দিন মা আমাকে কাছে ডেকে নিলেন। আমি মায়ের বিছানার পাশে বসলাম, মা আমার হাতটা ধরলেন, তারপর আমার চোখের দিকে গভীর ভাবে তাঁকালেন। মনে হলো মা যেন আমার সবকিছু দেখতে পারছেন। আমার বুকের ভেতর সব জমানো কষ্ট মায়ের কাছে স্পষ্ট, আমার সব গোপন কথা মায়ের জানা। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শুধু বললেন, "বেঁচে থাক বাবা"। এই ছিল মায়ের সাথে আমার শেষ কথা।

তিন.

আজ একটা বিশেষ দিন, পনের বছর আগে মা এই দিনে মারা গিয়েছিলেন। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামাজ শেষে মায়ের জন্য বিশেষ দোয়া করলাম। এখন গাড়িতে করে অফিসে যাচ্ছি। কি মনে করে আমার গাড়ির ড্রাইভার হাসান কে বললাম,

-জীবনটা অনেক সুন্দর তাইনা রে হাসান?

-জ্বি স্যার, অনেক সুন্দর, আমার মেয়েটা সবচেয়ে বেশি সুন্দর।

হাসানের মেয়ের কথা শুনে আমার মেয়ে দুটোর কথা মনে করলাম। বড়োটা হয়েছে ঠিক আমার মায়ের মত, আর ছোটটা মিতা আর আমার মিক্সড। নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। মিতাকে আমি এই জীবনে পেয়েছি। রোজ সকালে যখন অফিসের জন্য রেডি হই। বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখি গেঞ্জিটা ঠিক হাতের কাছে। পরিষ্কার ভাঁজ করা মোজা জুতার পাশে। চা টা ঠিক যেরকম গরম খেতে পছন্দ করি, ঠিক সেরকম। এইসব মিতা আমার জন্য করে, বিনিময়ে মিতাকে আমি ভালোবাসা দেই। যেদিন মিতা ভেজা শাড়িটা বাথরুমে রেখে তাড়াতাড়ি করে বের হয়ে যায়, আমি নিজ হাতে শাড়িটা ধুয়ে শুকাতে দেই, কাজের মেয়ের জন্য রেখে দেই না। রাতের বেলা যত্ন করে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেই, মিতা আমার বুকে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমায়। মিতাকে প্রায়ই বলি, 

-ধন্যবাদ

মিতা হেসে জিজ্ঞেস করে কেন?

-আমাকে মেয়ে দুটো উপহার দেয়ার জন্য।

হাসান গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে আর আমি ভাবছি মিতার কথা। আমার মেয়ে দুটোর কথা। হাসানের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলাম,

-হাসান, তোমার মেয়ের বয়স কত হলো?

-স্যার এই বুধবার তিন বছর হবে।

-তাই নাকি, আজকে তাহলো অফিস থেকে বের হয়ে আগে তোমার মেয়ের জন্য একটা খেলনা কিনবো।

-ইনশাল্লাহ স্যার।

আমিও মনে মনে বললাম, "ইনশাআল্লাহ "। শব্দটার অর্থটাও ভাবলাম, "যদি আল্লাহ চাহেন"। জীবনটা বোধ হয় এমনিই, সব কিছু সৃষ্টিকর্তার উপর ছেড়ে দিতে হয়। সব কিছু। এমনকি আজ বিকেলের এই খেলনা কেনাটাও। জীবনে কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়, এখানে শেষ দৃশ্যের জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হয়। অপেক্ষাই জীবন।

Add
একজন এফসিপিএস পরীক্ষা উত্তীর্ণ চিকিৎসকের অনুভুতি

পরীক্ষা প্রস্তুতির শেষের কয়েকদিন মেয়ের সাথে দেখা করতে পারিনি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা

চীনে রহস্যজনক ‘করোনা ভাইরাসে’ দ্বিতীয় মৃত্যু

একজন এফসিপিএস পরীক্ষা উত্তীর্ণ চিকিৎসকের অনুভুতি

পরীক্ষা প্রস্তুতির শেষের কয়েকদিন মেয়ের সাথে দেখা করতে পারিনি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা

চীনে রহস্যজনক ‘করোনা ভাইরাসে’ দ্বিতীয় মৃত্যু

একজন এফসিপিএস পরীক্ষা উত্তীর্ণ চিকিৎসকের অনুভুতি

পরীক্ষা প্রস্তুতির শেষের কয়েকদিন মেয়ের সাথে দেখা করতে পারিনি

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না