ঢাকা      বৃহস্পতিবার ২১, মার্চ ২০১৯ - ৬, চৈত্র, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. শিরীন সাবিহা তন্বী

মেডিকেল অফিসার, রেডিওলোজি এন্ড ইমেজিং ডিপার্টমেন্ট,

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল।


একটি ভুল, একটি গুজব আর বিনা অপরাধের শাস্তি

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের (শেবাচিম) একটি বিভাগে ডিপ্লোমা কোর্স আনার প্রক্রিয়া চলছিল। উৎসাহী হয়ে তাড়াহুড়ো করে শেবাচিম গাইনি প্রধান, অধ্যক্ষ স্যারের শরণাপন্ন হলেন। গাইনিতেও ডিপ্লোমা কোর্স আনার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে প্রক্রিয়া শুরু করলেন।

হাতে সময় কম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) থেকে কোর্সের আবেদনপত্র আনলেন। দ্রুততার সঙ্গে করছিলেন পেপার ওয়ার্কও। আর সেই সঙ্গে ক্রাইটেরিয়া অনুযায়ী পরিত্যক্ত ক্লাসরুমে তৈরি করা স্টোর রুমটাকে খালি করতে দায়িত্বরত স্টাফ নার্সকে নির্দেশ দিলেন।

নার্স বস্তাবন্দি অপ্রয়োজনীয় সবকিছু সরিয়ে রুম পরিষ্কারের দায়িত্ব দিলো আউট সোর্সিংয়ের মালেকাকে। অবশ্য ওদের আচরণে বোঝা যায়, পান চিবানো আর রুগীর আত্মীয়দের থেকে টাকা আদায় করাই যেন তাদের চাকরি। বারবার গাইনি থেকে বের করে দেয়ার পরেও অদৃশ্য শক্তির বলে বহাল তবিয়তে ওইখানেই থাকছেন মালেকা।

কাজের কথা শুনেই বিরক্ত মালেকা খাটুনি এড়াতে পঁচিশ-ত্রিশ বছরের পুরনো জারে সংরক্ষিত মৃত ভ্রুণগুলোকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে এসেছে।

এটা সবাই স্বীকার করবেন, স্বনামধন্য গাইনি প্রধান ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য কাচের জারে মৃত সংগৃহীত ভ্রুণ, টিউমার ও গর্ভফুল শতভাগ নিয়ম মেনেই রেখেছিলেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, সংরক্ষিত ভ্রুণগুলো দেখে হাতে-কলমে শিক্ষা নিয়ে হাজার হাজার ডাক্তার তৈরি হয়েছেন। কোর্স কারিকুলাম পরিবর্তন হওয়াতে এখন আর স্পেসিমেন ব্যবহৃত হয় না।

বহুদিন ব্যবহৃত না হওয়া শেবাচিমের এসব স্পেসিমেন নিয়ম মেনে ডিজপোজ করলেই এই অনাকাঙ্খিত কোনো ঘটনা ঘটতো না। অথবা সাংবাদিকগণ একটু সময় নিয়ে সত্য এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করলে ডাক্তারগণ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের রোষানলে পরতেন না।

যেসব স্পেসিমেন চিকিৎসকদের শিক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, তাদের জন্য আমার কিছু বলার আছে। এইসব স্পেসিমেন আর দশটা স্বাভাবিক শিশুর মতো পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয়নি। এই প্রাণহীনরাই চিকিৎসক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ প্রয়োজন শেষে তাদের অপমান করা হয়েছে, যা অনভিপ্রেত। তাদের পোস্টমর্টেম হয়েছে। নিয়ম মেনেই ডিজপোজ করার কথা ছিল।

যারা বিভ্রান্তি ও ভীতি ছড়াচ্ছেন, তারা দয়া করে মিথ্যাচার বন্ধ করুন। স্পেসিমেনগুলোর আদ্যোপান্ত না জেনে এ নিয়ে কথা বলবেন না। বাস্তবতা হলো, স্পেসিমেনগুলোর কারো মাথার খুলি নাই। বুক পিঠ লাগানো জমজ বা দুই মাথা শিশু। পরিবার ফেলে গেছে বলেই, তারা জারবন্দি হয়েছে।

সবাইকে জানাতে চাই, শেবাচিম হাসপাতালের আয়া-মাসীদের দৌরাত্ম্য, অভদ্রতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাদের কাছে গাইনি বিভাগের অনেকেই অসহায়। সর্বশেষ তাদের ভুলের কারণে সারাদেশের সামনে এবার শেবাচিম অপদস্ত হলো। তাদের দোষ আড়াল করে লাভ কী?

আউট সোর্সিংয়ের মালেকার কর্তব্যে অবহেলার কারণে স্বাস্থ্য মহাপরিচালক স্যারের আদেশক্রমে আজ  অধ্যক্ষ স্যার গাইনি প্রধানকে বরখাস্তের সুপারিশ পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন। অবশ্য একই কারণে স্টাফ নার্সকেও বরখাস্ত করেছেন পরিচালক মহোদয়।

মিটিংয়ে স্যারদের বিরক্ত মুখ/সাক্ষাৎকার দিতে দিতে ক্লান্ত শেবাচিমের পরিচালক স্যার। আপনি এজন্য কাকে দায়ী করেন।

একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মেয়ের ফেসবুক পোস্টকে আবেগ আপ্লুত নিউজ বানিয়ে সাংবাদিকরা প্রধানমন্ত্রীর কানে পৌঁছে দেন। জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মেয়ে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হলে প্রশংসার মাতম তোলেন সাংবাদিকরা।

আর একজন সহযোগী অধ্যাপক চিকিৎসক তার বিভাগের উন্নতির চেষ্টা করতে গিয়ে অধঃস্তনদের দায়িত্বে অবহেলার নির্মম শিকার হয়ে তাঁর দীর্ঘ কেরিয়ারটা হারাবেন, এটা কী কারও কাম্য হতে পারে?

সাংবাদিকরা যখন ম্যাডামকে প্রশ্ন করলেন, আপনাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে, এতে আপনার প্রতিক্রিয়া কি? জবাব দেয়ার সময় আমার বারবার মনে হচ্ছিল, ধরনী দ্বিধা হও। ম্যাডাম আমার হাত চেপে পাশে থাকতে বলছিলেন। আমি বাক্যহারা হয়ে করুন মুখে এক মেধাবী, পরিশ্রমী চিকিৎসকের মুখমণ্ডলে কষ্ট আর অপমানের রেখা দেখছিলাম।

শেবাচিমে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত অমানবিক। কিন্তু এ ঘটনায় যাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তাদের কারোর-ই ইচ্ছাকৃত অপরাধ ছিল না। তাই তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি সুষ্ঠু তদন্ত করার পরই পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে, এটাই সকলের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নিজ দেশের দেবী শেঠিদের ক’জন চেনেন!

নিজ দেশের দেবী শেঠিদের ক’জন চেনেন!

আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষই ভারতের প্রখ্যাত হার্ট সার্জন ডা. দেবীপ্রসাদ শেঠি…

বিবেক স্খলনের বলি যখন দেবশিশু

বিবেক স্খলনের বলি যখন দেবশিশু

বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে দূর্ঘটনাবশতঃ সন্তানের আগমন অতঃপর তাকে সবার অলক্ষ্যে জন্মদান এবং…

ডাক্তারদের নিয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো বাণিজ্য ফাঁদ

ডাক্তারদের নিয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো বাণিজ্য ফাঁদ

মাইজদীর এক ক্লিনিকে সিজারের বিল ৪৮ হাজার টাকা। এইবার জনগনের বিষোদগার ডাক্তাদের…

ঘুম সমন্ধে যে তথ্যগুলো আপনি জানেন না!

ঘুম সমন্ধে যে তথ্যগুলো আপনি জানেন না!

গতকাল পালিত হয়ে গেলো বিশ্ব ঘুম দিবস। এই দিবসে যারা আমার মতো…

গরিবের হার্ট অ্যাটাক এবং তার চিকিৎসা

গরিবের হার্ট অ্যাটাক এবং তার চিকিৎসা

পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত মৃত্যুর এক নম্বর কারণ হলো হার্ট এ্যাটাক। এর ভয়াবহতা…

সরকারি হাসপাতালের নিত্যদিনের গল্প

সরকারি হাসপাতালের নিত্যদিনের গল্প

দিন শেষে রোগী চরম বিরক্ত। কারণ সিট না পাওয়ায় তার স্থান হয়েছে…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর