ডা. তারিক রেজা আলী

ডা. তারিক রেজা আলী

সহকারী অধ্যাপক, রেটিনা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়


১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ১০:০১ এএম

নতুন চেম্বারে অশরীরী আত্মা

নতুন চেম্বারে অশরীরী আত্মা

নতুন একটা চেম্বার পেয়েছি আমি। দামী হাসপাতালের চালু চেম্বার। আজ থেকে একমাস আগেও এরকম চেম্বারের কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। কিভাবে কি হয়ে গেল। ব্যস্ত প্র্যাকটিশনার এক বড় ভাই হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই পরপারে যাত্রা করলেন। তাঁর সাথে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা ছিল আমার। মেডিকেল কলেজে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের অনিশ্চিত উত্তাল দিন গুলোতে আমরা একসাথে অনেক পথ হেঁটেছি। বলা চলে সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ যুবক থেকে পূর্ণ যৌবন এবং তার পরে যৌবনোত্তর প্রৌঢ়ত্ব সবই একসাথে লাভ করার সৌভাগ্য হয়েছে। তাই তাঁর হঠাৎ মৃত্যু আমাকে বিষন্ন করেছে, বিহবল করেছে।

কর্মজীবনে আমার থেকে তার সাফল্য অনেক বেশী। চেম্বারে রোগীর উপচে পড়া ভীড়। ছাত্র-ছাত্রী, শুভানুধ্যায়ী সবই অনেক ছিল তাঁর। সব ছেড়ে এক নিমিষেই চলে গেলেন অজানায়, হয়ে গেলেন ডেড বডি। ডেড বডির সৎকারের তিনদিনের মাথায় প্রস্তাব পাই আমি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাকে তার চেম্বারে বসার আমন্ত্রণ জানায়। প্রস্তাব লুফে নিতে একটুও দেরী হয় না আমার। বডি ল্যাঙ্গুয়েজে প্রকাশ করি, বড় ভাই এর এই চেম্বারে বসার সব চেয়ে যোগ্য দাবীদার আমিই।

বেশ সাজানো ছিমছাম চেম্বার। বড় সেক্রেটারিয়েট টেবিল, রিভলভিং চেয়ার, পাশে বই এর র‍্যাকে দামী মেডিকেল বই, নামকরা সব জার্ণাল থরে থরে সাজানো। ইদানীং যে সব সাহিত্য বিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় তার কপিও বেশ কয়েকটা দেখতে পেলাম। সব ঝকঝকে পরিস্কার, কোথাও একবিন্দু ধুলো নেই। মূল চেম্বারের পিছনে ছোট্ট একটা রেস্ট রুম, আরাম কেদারা পাতা। বুঝা যায়, খুব একটা রেস্ট নিতেন না। চেয়ারে ধুলো, নীচে পড়ে আছে অপরিস্কার কাপড়ের টুকরো, দেয়ালের র‍্যাকে অনেক দিন আগের পত্রিকা, রোগীদের ইনভেস্টিগেশনের কপি, পুরনো এক্স রে ফিল্ম ইত্যাদি। সব চেয়ে আশ্চর্য হোলাম, এসির পাশে দেওয়ালে মাকড়সার ঝুল! মনে হয় মাকড়সার জন্য একটা অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় ছিল তাঁর, ঘুরে বেড়াচ্ছে বেশ বড় সাইজের দুটো মাকড়সা।

নতুন চেম্বারে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। একেকজনের রোগী দেখার স্টাইল একেকরকম। প্রথম প্রথম অসুবিধা হবে আমি জানতাম। এত হবে বুঝিনি৷ রুমের পিওন, রোগীদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়ার স্টাফ, দায়িত্বরত নার্স কেউ আমাকে সহজ ভাবে নিতে পারছে না। আমি বলি একরকম, তারা মনে হয় চুক্তি করেছে নিজেদের মধ্যে, সবাই মিলে কাজ করে একেবারে অন্যরকম। আমাকে অপদস্থ করার চেষ্টায় তারা মশগুল সবাই। প্রমাদ গুনলাম। আমি অভিজ্ঞ চিকিৎসক, যথেষ্ট বয়স্ক, মানুষ চড়িয়ে খাই। মানব চরিত্রের অনেক গোপন রহস্য আমি বুঝতে পারি, আর সাধারণ মানুষ আমাকে বুদ্ধিমান বলেই জানে। বুঝতে পারলাম, বিভাজন করতে হবে এদের মাঝে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট যে দেয় তাকে টার্গেট করলাম। কিছু বখশিশ নগদে দেওয়া শুরু করলাম। দুদিনেই কিছুটা সোজা হয়ে গেল। রোগীরা ফোন করলে এখন আর বলে না, না ডাক্তার সাহেব এখানে আর বসেন না। বরং বলে আমাদের নতুন স্যার আগের স্যারের অন্তরঙ্গ বন্ধু, একসাথে পড়া-লেখা করেছেন, অনেক ভাল ডাক্তার।

নতুন চেম্বারের নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানো সহজ নয়। এর মাঝে উপদ্রব হিসাবে আছে বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা। তাদের কোম্পানির ওষুধ লেখার জন্য দিতে লাগলো নানা রকম প্রলোভন। কেউ বিদেশে যাবার টিকেট দিতে চায়, কেউ চায় সপরিবারে কক্সবাজার -বান্দরবন-সুন্দরবন ভ্রমণের ব্যবস্থা করতে। সাথে এলো বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল এবং রেডিওলজিক্যাল ল্যাবরেটরির পার্সেন্টেজ নেওয়ার প্রলোভন।

মানুষ আমি, কিছুদিন পর বুঝতে পারলাম, আমি পরিবর্তিত হচ্ছি। যে পরীক্ষাটা না করালেও হয়তো হতো, আমি করতে দিচ্ছি। নিজেকে বুঝাতাম, এটা রোগীর স্বার্থেই করা হচ্ছে। কিন্তু অস্বীকার করব না, একটা অপরাধবোধ কাজ করতো। মনে হতো বড়ভাই বেঁচে থাকলে আর আমি এরকম করলে হয়তো তিনি ভাল ভাবে দেখতেন না, হয়তো বলেই বসতেন, ক্লিনিক্যাল আই শার্প করতে হবে তোমার আরো।

রোগী দেখার ফাঁকে ফাঁকে কেমন আনমনা হয়ে যেতাম। এই চেয়ারে কিছুদিন আগেও বসেছেন আমার প্রিয় একজন মানুষ। হাত রেখেছেন ঠিক এখানেই, এই হাতলে। চাবি ঘুরিয়ে খুলেছেন ড্রয়ার, ঝূড়িতে ফেলেছেন অপ্রয়োজনীয় কাগজ। তাঁর সব কিছু এখন আমি ব্যবহার করছি, এমন কি ফোনের চার্জারটিও তাঁর! এসির বাতাস যখন বয়ে যায়, সেই বাতাসে যেন শুনতে পেতাম কারো দীর্ঘশ্বাস। টেবিলের নীচে রাখা পাদানীতে পা রাখতে অস্বস্তি লাগতো, মনে হতো যেন এটা ঠিক হচ্ছে না, যেন তাঁর গায়ে লেগে যাবে আমার পা।

তাই নিশ্চিন্ত হওয়া আর হলো না। নতুন বিপদ শুরু হলো। না, এবার অন্য কোন স্টাফ নিয়ে নয়, ঝামেলা শুরু করলাম আমি নিজেই। কেন যেন মনে হতে লাগলো এই চেম্বারে আর কেউ আছে। সে আমাকে প্রতিনিয়ত ফলো করছে৷ তাকিয়ে আছে আমার দিকে, তীক্ষ্ণ ভাবে খেয়াল করছে আমি কি ওষুধ লিখি, কি কথা বলি রোগীদের সাথে। সবচেয়ে অবাক হোলাম একদিন, ব্লাড প্রেসার মেশিন টা বাঁধার পর নিজেই বুঝলাম ঠিক মত এঁটে লাগানো হয়নি। আমি খুলে আবার বাঁধার আগেই কিভাবে যেন সঠিক ভাবে বাঁধা হয়ে গেল। নিজের চোখের ভুল ভেবে অন্য কাজে মন দিলাম, কিন্তু একটা চাপা অস্বস্তি রয়েই গেল। পরের দিন চেম্বারে ঢুকতেই কোন এক অপরিচিত লোকের উপস্থিতি টের পেলাম। তার গায়ের গন্ধ পাচ্ছি। চেয়ারে বসতে গিয়ে দেখলাম কারো দেহের উষ্ণতায় চেয়ারটি গরম হয়ে আছে। অস্বস্তি ভাব তীব্র হতে লাগলো। কি করা উচিত আমার বুঝে উঠার আগেই ব্যস্ত হয়ে গেলাম রোগী দেখায়। ভুলে গেলাম প্রাথমিক অস্বস্তি।

রোগী দেখা যখন প্রায় শেষ, আর দু-একজন বাকী, কানে স্টেথোস্কোপ ঢুকাতেই শুনতে পেলাম পরিষ্কার বাংলায় আমাকে কেউ বললো, আরেকটু বামে ধর স্টেথোস্কোপ। হাতটা আমার আরেকটু বাম দিকে চলে গেল নিজের অজান্তেই। সত্যি সত্যিই আরো ভাল ভাবে শুনতে পেলাম হার্টের লাব ডাব শব্দ। বুঝতে পারলাম, রোগী ভালবের জটিল রোগে ভুগছে। কানে ফিস ফিস করে কেউ বললো, এখনই ইকোকার্ডিওগ্রাম করে দেখে নাও। না, এবার আর ভুল হলো না। এই কন্ঠস্বর আর কারোনা, আমার ঐ প্রয়াত বড় ভাইয়ের! হিম শীতল স্রোত বয়ে গেল সারা শরীর জুড়ে। কোন মতে রোগীটা দেখা শেষ করলাম। এর পরের যে কয়জন ছিলেন, সবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যানসেল করে দিলাম। কারো কোন অজুহাতই শুনলাম না। দ্রুত চেম্বার ছেড়ে বের হোলাম। কোথায় যেতে হবে, তাও যেন কেউ একজন নিয়ন্ত্রণ করছে। এলোমেলো পায়ে দেয়াল ধরে এগিয়ে চললাম। দুর্বল অবসন্ন নিজেকে আবিষ্কার করলাম ঐ হাসপাতালেরই ইমারজেন্সী বিভাগে!

Add
নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মশা আপনাদের ভোট খেয়ে ফেলবে
শপথ পাঠ অনুষ্ঠানে দুই মেয়রকে প্রধানমন্ত্রী

নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মশা আপনাদের ভোট খেয়ে ফেলবে

শপথ পাঠ অনুষ্ঠানে দুই মেয়রকে প্রধানমন্ত্রী

নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মশা আপনাদের ভোট খেয়ে ফেলবে

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না