ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৪, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


যে কথা হয় না বলা

এক লোক পশ্চাৎদেশে ফোঁড়া নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে চিকিৎসা করাতে গেছে। ফোঁড়া কাটতে কাটতে সে দেশের ডাক্তার মিষ্টি করে বলে দিয়েছেন, দাদা, আপনার পশ্চাৎদেশ তো একেবারে গেছে। আহা…! এখানে না এলেতো একেবারেই পঁচে যেতো। আসন্ন পঁচার হাত থেকে রক্ষা পেতে মহামান্য রোগী তো বটেই সাথের দুজনও হোল বডি চেক আপ করিয়ে এসেছেন, মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা দরে। বাকীরা ও যাবেন কথা দিয়ে এসেছেন।

দাদারা মিষ্টি মিষ্টি কথা দিয়ে চামড়া ছিলছেন, লবন লাগিয়েছেন, সে লবন আবার চিনির মতো মিষ্টি। বিজ্ঞ রোগী দেশে এসে তার পশ্চাৎদেশে সূচ রাখার অভিযোগে মামলা করলেন। সে মামলায় একজন প্রফেসরকে থানা হাজত করতে হলো। আরো কত কী..!!

মূল ঘটনা হলো, ওই রোগীর পায়খানার রাস্তার পাশে এবসেস মানে ফোঁড়া হয়েছিলো। সেই ফোঁড়া ড্রেইন করে সম্ভাব্য জায়গায় সেলাই করে চিকিৎসা করা হলো। সেলাই করার সুতাকে বলে সুচার ম্যাটেরিয়াল। এই ফোঁড়া আবারও হতে পারে, এবং হলো। এবার রোগী গেলো পাশের দাদাদের দেশে। দাদারা দেখলেন, ফোঁড়া কাটলেন। পুর্বোবর্তী সেলাইয়ের সুতোও নাকি পেলেন, যা পাওয়া স্বাভাবিক। সেটাই সুন্দর করে বলে দিলেন। রোগী মনে করল এই সূচার ম্যাটেরিয়ালই সূচ! অবশেষে কেল্লাফতে। আহা সাপও মরল, লাঠিও ভাঙ্গল না। তবে কে জানত, এই লোকের পশ্চাৎদেশ আবারো ফোঁড়ায় টনটন করে ওঠবে।

এবার কিন্তু সে দাদাদের বকতে বকতে আবার দেশের হাসপাতালেই ভর্তি হলো। বেচারা আমরা যেনো কিছুই হয়নি, এমন ভাব করে তাকে চিকিৎসা দিতে লাগলাম। এবং দিব যতবার লাগুক।

দুই.

সম্প্রতি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন লাগে। কর্তব্যরত ডাক্তার, শিক্ষানবিশ ইন্টার্ন চিকিৎসক, স্টুডেন্ট যে যেভাবে পেরেছে নিজের জীবনের পরোয়া না করে অসহায় রোগীদের রেসকিউ করে নিয়ে এসেছে। শিশু ওয়ার্ডের এক নারী চিকিৎসক তো প্রতিটি রোগীকে নিরাপদে না সরানো পর্যন্ত নিজে সরেনি। এই রোগীরা তো কোনো ডাক্তারের আত্মীয় নয়। কেউ তাদের দিব্যি ও দেয়নি তারপরও কেনো তারা জীবন বাজি রাখল? এত এত রোগী, সব রোগীকে নিরাপদে সরিয়ে, এম্বুলেন্স জোগার করে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা চাট্টিখানি কথা নয়।

স্থানান্তরিত হাসপাতালের ডাক্তাররাও রোগীর অসহায়ত্বের কথা চিন্তা করে সরাসরি ওয়ার্ডে জায়গা করে দিয়েছে, ভর্তির ফর্মালিটি করতে সময় নষ্ট হবে চিন্তা করে। পাশাপাশি এম্বুলেন্স চালকরা, পার্শ্ববর্তী কৃষি ইউনিভার্সিটির ছেলেরা এবং অন্যান্যরা যথাসম্ভব এগিয়ে এসেছে। এটাই বাংলাদেশের আসল চিত্র, যা আমরা আগেও দেখেছি রানা প্লাজা দুর্ঘটনায়।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় কী জানেন, অন্যদেরটা হলেও চিকিৎসকদের অবদানটা তেমন করে কখনো হাইলাইট হয়না। প্রথম সারির এক পত্রিকা নিউজ করেছে, এই অবদান নাকি সবার। ওকে সবার। সবচেয়ে দুঃখ জনক, এক অনলাইন পোর্টালের কমেন্ট সেকশনের কমেন্ট। একজন লিখেছে কসাইরা পুড়ে মরলে নাকি সে শান্তি পেত। আরো কয়েকজন দেখি তাকে সমর্থনও করেছে। আহা, আমরা এদেরই চিকিৎসা দেই। ব্যাপার না, ডাক্তারদের কোনো ব্যাপার থাকতে পারে না। ওহ্, লেইট হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন ডে।

তিন.

আমি শুক্রবারে একটা চেম্বারে বসি। নিজের জেলায়। তেমন স্পেশাল কিছু না, আউটডোর চেম্বার। লোকজন কম বেশি আসে, গল্প করে। নানাধরণের রোগী। একজন এসেই কায়দা করে সিরিয়াল আগে নিবে। উঁকি দিয়েই সালাম দিয়ে এমন করে কথা বলবে যে, অন্যরা মনে করবে আমি তার মায়ের পেটের খালাতো আপা লাগি। একফাঁকে তাদের কী কী আছে, তা জাহির করবে। একই প্রেসক্রিপশনে তার সাথে আগত এটেন্ডেন্সের জন্য ঔষধ লেখাবে। অবশেষে ভিজিট দেবে অর্ধেক।

যেহেতু খালাতো আপা লাগি, কী আর করা!! চেম্বারের ম্যাক্সিমামই গরীব রোগী। কেউ মাচার লাউটা, শাকটা, কেউ লিটার দুই তিনেক দুধ, কেউ ডজন খানেক পাটিসাপটা পিঠা দেয়। আমি খুশি মনে নেই। এটাই তাদের ডাক্তারের জন্য ভিজিট। একজন দেখি কেজি খানেক দেশি বরই নিয়ে এসেছে। আগিয়ে পিছিয়ে দেওয়ার খালা বলল, ভিজিট না দেওয়ার নাকি ধান্দা। ত্রিশ টাকার বরইয়ে ভিজিট ডিসমিস। খালা বিরক্ত। তাকেও যে হাত খরচ দিতে হয় ডাক্তারের ভিজিট থেকে। এমন সময় হাতে চকচকে রুপোর মতো টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে এক রোগীর আগমন। খুব আস্তে করে বলল, ম্যাডাম আমার খুব ইচ্ছা আপনাকে একটু রান্না করে খাওয়াই। তেমন কিছু রান্না করতে পারিনি, আপনি যদি একটু খেতেন…।

রাগ করতে গিয়েও রাগটা কপ করে গিলে ফেল্লাম, খেতে বসলাম। চিংড়ি মাছ দিয়ে করল্লা ভাজি, লাউ শাক ভাজা, পুকুরের কইমাছ পেঁয়াজ কাঁচামরিচ ধনে পাতা দিয়ে ভুনা করা। লাল চালের ভাত, একটু বেগুন ভর্তা আর ডিম ভুনা। এত অমৃত সদৃশ খাবার আমি বহুদিন খাইনি। ওহ, এক বাটিতে একটু পায়েসও কিন্তু ছিলো। খাবার শেষে বেসিনে হাত ধুতে যেয়ে আয়নায় চোখ পড়ল। চোখ কেনো লাল আর ভেজা ভেজা বুঝলাম না। মনেহয় কিছু একটা পড়েছিলো।

যাহোক, আগেই বলে দিয়েছিলাম, এই রোগীর ভিজিট যেনো না রাখে। কিন্তু অবাক কান্ড হচ্ছে, সে ফুল ভিজিট দিয়ে গেছে জোর করে। চোখ মুছতে মুছতে নাকি বলে গেছে, সে খুব খুশি হয়েছে আমি একটুও ইতস্তত না করে তার রান্না খাবার খেয়েছি বলে!

অবিবেচক লোকজনের অসংবেদনশীল আচরণ মনে রাখার জায়গা কই ডাক্তারদের? তাদের ছোট্ট হৃদয়ের অলিন্দ নীলয় তো ভরে থাকে এমনি সাদামাটা হাজারো ভালোবাসার গল্পে। যে গল্প তাকে পরজন্মেও ডাক্তার হতে উদ্বুদ্ধ করে। আমি হ্যাপি যে আমি ডাক্তার। আমি আমার প্রফেশনে খুশি। আমি হাসি মুখে মানুষের অন্তীম মুহূর্তে পাশে থাকতে পারি। আমি মরতে বসা রোগীকেও বেঁচে থাকার মন্ত্র শোনাতে পারি, মৃত্যুযন্ত্রণা সহ্য করার সাহস যোগাতে পারি। আলহামদুলিল্লাহ। আমার সাথে বৈষয়িক হিসাব কষতে এসো না, হলফ করে বলতে পারি, সে হিসাব মিলবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর