ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ১০:২৫ এএম

রেইপ কেইস ও ধর্ষণ সার্টিফিকেট

রেইপ কেইস ও ধর্ষণ সার্টিফিকেট

কেবল মাত্র ভোরে হয়েছে। পাখির ডাক শুনা যাচ্ছে। আমাদের ইমার্জেন্সী ডাক্তার রুম থেকে বেশ শুনা যায় সে কলকাক। আমি মশারীর ভিতর থেকে জানালার গ্লাস দিয়ে গাছের ডগার সবুজ পাতায় উপর ভোরের সোনালী রোদের খেলা দেখার চেষ্টা করছি আর পাখিদের কিচিরমিচির ডাক শুনছি। এমন সময় হঠাৎ হাসপাতালের ইমার্জেন্সী মোবাইল ফোন বেজে উঠলো। ইমার্জেন্সী মোবাইলটি ডিউটি ডক্টরের বুক পকেটে থাকে ডিউটির দিন বা রাতে।

'স্যার জরুরী', মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট দিজেন্দ্র পাল ডাকলেন। অত্যন্ত ধৈর্যশীল, গুনী, অভিজ্ঞ চিকিৎসাকর্মী। সবার খুবই প্রিয়। আমি আদর করে তাকে দ্বীজু ডাকি। কি আর করা..। উঠেই ছুটলাম ইমার্জেন্সীতে। একটা আট-দশ বছরের বাচ্চা মেয়ে ইমার্জেন্সী বেডে শোয়ানো। সারা গায়ে ছোপ ছোপ কাদা মাটি। 

'কি হয়েছে' জিগ্যেস করায় মা বললেন, 'আমার মেয়েকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে সন্ত্রাসীরা মেরেছে আর খারাপ কাজ করেছে'। যেহেতু রেইপ কেইস, পুলিশ কেইস। সিরিয়াসও বটে। তাছাড়া সাক্ষী প্রমান মামলা মোকদ্দমা অনেক কিছু অনেক বড় বিষয়, তাই জরুরী ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সদর হাসপাতালে রেফার্ড দিলাম। বিদায়ের আগে গাইনোকোলজিস্ট বা লেডি ডক্টর না থাকায় সিনিয়র সিস্টার কে বললাম যতদূর পারা যায় প্রাইভেট পার্ট এর একটা এক্সটারনাল ইঞ্জুরী নোট রাখতে। যদিও মেডিকেল হিস্ট্রিতে বাচ্ছা মেয়েটি তেমন পজেটিভ কিছু বলেনি। তারপরও এসবে এক্সপার্ট অপিনিওনের জন্যে রেফার্ড করতেই হয়।

চলে যাবার একটু পরেই চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র নিয়ে হাজির এক নেতা। ডাক পড়লে, আবার গেলাম ইমার্জেন্সীতে। 'কি ব্যাপার?'। নেতাজী ইরশাদ করলেন, "এই নাবালিকা মেয়েটা রেইপ হলো। গ্রামের মকবুল মাতব্বর এর সাংগো পাংগো সবাই মিলে রেইপ করলো, আর আপনি কিনা ধর্ষণের সার্টিফিকেট না দিয়ে রোগী ভর্তি না করে সদরে পাঠিয়ে দিলেন"!

আমি বললাম, "যেভাবে নিয়ম সেভাবেই সব করা হয়েছে। বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া রেইপ বা ধর্ষণ লিখে দেবার নিয়ম নেই। তাছাড়া আমরা তেমন কোন আলামত পাইনি। তারপরও যেহেতু যারা নিয়ে এসেছেন তারা সে রকম কিছু একটার ইঙ্গিত পাচ্ছেন তাই, হিস্ট্রি অব রেইপ লিখে পাঠিয়ে দিলাম সদরে। সেখানে গাইনী ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বোর্ড বসিয়ে সাফ সাফ সার্টিফিকেট দেবেন। ওটাই যুক্তিযুক্ত, আপনারা দ্রুত সেটাই করেন। সদরে যান। আলামত কিন্তু বেশিক্ষণ কিন্তু থাকেনা। পরে প্যাচে পড়বেন"।

তিনি বাদ সাধলেন। তিনি শতভাগ নিশ্চিত। তাই ক্লিনকাট ধর্ষণের সার্টিফিকেট দিতেই হবে। তিনি মকবুলের কয়েকজন সাংগো পাংগোদের বিরুদ্ধে মামলা করবেন, এক্ষুনি এরেস্টের ব্যবস্থা করবেন। একেবারে নাছোড়বান্দা টাইপের নেতা। 

কি করবো বুঝিতে পারলাম না। এসবে খুব সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। কারন শব্দ ব্যবহারে সামান্য হেরফের হলেই অনেক সময় নিরীহ ডাক্তার ফেঁসে যান!! আমি দ্বিজেন্দ বাবুর দিকে চেয়ে তাকে বললাম, "বাবু এক কাজ করো, নেতাজী যেহেতু নিশ্চিত করে বলছেন, রেইপ কেইস তাহলে উনাকে রাজ স্বাক্ষী করে একটা বন্ড সই রেডি করো। রেইপ লিখে দেই"।

"জ্বী স্যার" বলে তিনি তাৎক্ষণিক লাল কালিতে বন্ড সই লিখে আনলেন, 'আমি অমুক নিশ্চিত করে বলিতেছি যে ইহা রেইপ কেইস এবং আমার সম্মুখেই হইয়াছে....'। সাদা পাতায় ঝকঝকে লাল লেখা গুলো নেতার সামনে মেলে ধরলেন, স্বাক্ষর দেবার জন্য।

দুই.

নেতাজী'তো এখন আর নড়েন চড়েন না। মুখে কোন কথা নেই। আমতা আমতা করে অস্পষ্ট স্বরে বললেন, "না মানে আমি কেন স্বাক্ষর দেবো? আমি কেনো রাজ সাক্ষী হবো? আমার সামনেতো রেইপ হয়নি..। আমিও সবার মতো শুনেছি রেইপ কেইস স্যার.....'। (অনেক ক্ষন পর তার মুখে 'স্যার' শব্দ বের হলো)

আমি বললাম, এইনা আপনি একশত ভাগ নিশ্চিত হয়ে বললেন? তিনি আবার বললেন, "না স্যার.... বলেছিলাম কি, মানে... আমি শুনেছি রেইপ তাই বলেছিলাম। আচ্ছা ঠিক আছে বন্ড সই লাগবেনা। আমরা সদরে যাই। কইরে তোরা আয়। আসি স্যার। আসসালামু আলাইকুম...."।  

আমি বললাম, "ওয়ালাইকুম"।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না