ঢাকা      মঙ্গলবার ১৬, জুলাই ২০১৯ - ৩১, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. নাজমুল ইসলাম

অনারারি মেডিকেল অফিসার

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ, বগুড়া।


একজন চিকিৎসকের উদ্যোক্তা হয়ে উঠার গল্প

নোয়াখালীর সম্ভ্রান্ত চৌধুরী বংশে জন্ম মনজুরের। ছোটবেলায় পাইলট হতে চাওয়া ছেলেটা দাদীর মুখে শুনতো গ্রামের মনসুর ডাক্তারের কথা। কিভাবে মনসুর ডাক্তার বিনা টাকায় চিকিৎসা দিতেন, মানুষকে সাহায্য করতেন। মূলত দাদীর অনুপ্রেরণা থেকেই ডাক্তারি পড়তে আগ্রহী হয়ে উঠেন মনজুর। এভাবে ডাক্তার হওয়ার বীজটা সেই ছোটবেলা থেকেই মনের গহীনে সুপ্ত ছিল তার। ২০০৮-০৯ সেশনে দেশের নামকরা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও দাদীর স্বপ্ন পূরণ করতে ভর্তি হন আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজে।

পড়ার ফাঁকে ২০১৪ সালে পরিচয় হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমআইএসে পড়া বন্ধু জিসানের সঙ্গে। দুজন মিলে অসহায় মানুষদের জন্য কিছু করার চিন্তা করতে থাকেন। টিএসসির মোড়ে আড্ডা দিতে দিতে দুই বন্ধুর মাথায় বুদ্ধি আসে, তারা অসহায় মানুষের কল্যাণে কিছু করবেন। সেই উপকারের ক্ষেত্র কি হতে পারে তা নিয়ে বিস্তর চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলেন দুইজন। চিন্তা করে তারা দেখলেন জরুরি প্রয়োজনে অসুস্থ রোগীর জন্য রক্ত জোগাড় করে দেওয়া অনেক বড় একটা মহৎ কাজ।  

অবশেষে ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর পূর্ণতা পায় তাদের স্বপ্ন। ‘ব্লাডম্যান’ নামে এক সংগঠনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাদের স্বপ্নজয়ের পথচলা। মনজুর আর জিসানের সঙ্গে যুক্ত হন সাগর, নিয়াজ, রফিক, ফাহিম, নাইম ও আরজে সালমান।  
মনজুর মনে করেন কেউ চাইলেও সুপারম্যান অথবা স্পাইডারম্যান হতে পারবেন না। কিন্তু চাইলেই যে কেউ এক ব্যাগ রক্তদানের মাধ্যমে ব্লাডম্যান হয়ে একজন মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসতে পারবেন। এটাই ব্লাডম্যানের মূলমন্ত্র। 

বর্তমানে তাদের আছে দক্ষ টিম, সঙ্গে আছে কল সেন্টার নাম্বার, এনড্রয়েড মোবাইল অ্যাপস (Bloodman) এবং ওয়েবসাইট (bloodman.org)। 

জরুরি রক্তের দরকারে যে কেউ ফোন করতে পারবেন ব্লাডম্যানের হেল্পলাইন নাম্বার ০১৬২৭২৬০৯৩৩। আর সেখানে বিশাল ডাটাবেসের ডোনার থেকে ব্লাডম্যান আপনাকে রক্তদাতা খুঁজে দিবে। ব্লাডম্যান করার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশে যেন রক্তের অভাবে কোন প্রসূতি মা অথবা রোগী মারা না যায়। বিগত ৪ বছর ধরে তারা সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছে। 

সক্রিয় জনসেবায়ও 
তবে শুধু রক্তদাতা খুঁজে দেওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি ব্লাডম্যান। দেশের যেকোন প্রতিকূল পরিবেশে এগিয়ে এসেছে ব্লাডম্যান। কখনও বন্যায় ত্রাণ আবার কখনও শীতবস্ত্র নিয়ে ছুটে গিয়েছে দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। এরই ধারাবাহিকতায় রাঙ্গামাটির পাহাড় ধসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ব্লাডম্যান। দেশের অন্য পাঁচজন মানুষের মতো রোহিঙ্গা সংকটে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে তারা। বিগত ৪ বছরে প্রায় ৫ হাজার মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং ঔষধ সরবরাহ করেছে ব্লাডম্যান।

জুটছে স্বীকৃতি-সহযোগিতা 
তাদের জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য এরই মধ্যে দেশে এবং দেশের বাইরে সমানতালে সমাদৃত হয়েছে ব্লাডম্যান। ঝুলিতে ভরেছে নাম দামী অনেক পুরস্কার। সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বেসরকারি সেবাসংস্থা ব্র‍্যাবের পাশাপাশি সরকারি অনেক এজেন্সি।

ব্লাডম্যানের উল্লেখযোগ্য পুরস্কারগুলো হলো: ২০১৬ সালে ব্রাক সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘ব্র‍্যাক আরবান ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ’ নামক কম্পিটিশনে ব্লাডম্যানের সদস্যরা ব্লাডম্যানকে প্রেজেন্ট করে এবং ৬১৫টি আইডিয়ার মধ্যে তাদের আইডিয়া স্বাস্থ্য বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়। 

২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি থাইল্যান্ডে গ্লোবাল লিডারশিপ অ্যাম্বেসেডর হিসেবে অংশগ্রহণ করেন মনজুর ও তার ব্লাডম্যান টিম। ৪ দিনের ট্রেনিংয়ে সাউথইস্ট এশিয়ার প্রায় ১০০ প্রতিযোগী অংশ নেন। 

২০১৬ সালে স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিত হয় ইউথ ইন্টারন্যশনাল বুথ ক্যাম্প। যেখানে ব্লাডম্যানের প্রতিষ্ঠাতা জিসান সোশ্যাল চেঞ্জমেকার হিসেবে ব্লাডম্যানের বিজনেস মডেল উপস্থাপন করেন ও ইন্টারন্যাশনাল বিভাগে প্রথম স্থান অজর্ন করে ব্লাডম্যান। 

২০১৬ সালে হংকং ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত ফিউচার সিটি সামিটেও বিশ্বের অনেক নামী দামী দেশের স্টার্টআপের মধ্যেও ব্লাডম্যান পুরস্কৃত হয়।

মনজুর বর্তমানে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কাজ করছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ‘আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র আইসিডিডিআর,বিতে। ব্লাডম্যান একদিন বড় হবে দেশ পেরিয়ে বিদেশের গন্ডিতে সেবা প্রদান করবে। দেশে রক্ত এবং চিকিৎসার অভাবে কেউ মারা যাবে না—এই স্বপ্নই দেখেন মনজুর। মানবসেবায় বিলিয়ে দিতে চান নিজের জীবন এবং সোনার বাংলাদেশ গড়ায় রাখতে চান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ: আমার দেখা একটি বিভৎস ঘটনা

শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ: আমার দেখা একটি বিভৎস ঘটনা

শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ কাজ করাকে পেডোফেলিয়া বলে। আর যাদের এই আকর্ষণ…

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব…

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal…

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থান। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নানা রকম হরমোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর