ঢাকা      শনিবার ২৩, ফেব্রুয়ারী ২০১৯ - ১১, ফাল্গুন, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. কাওসার আলম

মেডিকেল অফিসার ও রেসিডেন্ট, কার্ডিওলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়


স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও প্রশাসন ক্যাডারে পদোন্নতিতে সীমাহীন বৈষম্য

একজন প্রশাসন ক্যাডার সরকারি চাকুরিতে যোগ দেন সহকারী কমিশনার হিসেবে।  তার দুই তিন বছরের মধ্যে অ্যাসিল্যান্ড হিসেবে পদোন্নতি পান।  আর ছয় বছরের মধ্যে উপজেলা নিবাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হন। একজন ইউএনওকে একটা উপজেলার রাজা বলা যায়। একটা আলিশান বাংলো, সরকারি গাড়ি আর উপজেলার সকল সভা সমাবেশের অঘোষিত প্রধান অতিথি তিনি। একজন সরকারি কর্মকর্তার কাছে একটা উপজেলা শহরে এরচেয়ে বেশি কি চাওয়ার আছে?

আর একজন চিকিৎসক চাকরিতে যোগ দেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে।  এর দুই থেকে তিন বছর পরেও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, এমনকি ছয় বছর পরেও একই পদে বহাল থাকেন তিনি।  এত দীর্ঘ সময় চাকরি করার পরও স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কোনো পদোন্নতি হয় না। 

একজন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তার চাকুরিতে প্রবেশ করার সময় যে ডিগ্রি ছিল, ইউএনও হওয়ার সময়ও একই ডিগ্রি। মানে ২-৩টা পদোন্নতি পেতে বেসিক গ্রাজুয়েশন ছাড়া অন্য কোনো ডিগ্রির প্রয়োজন হচ্ছে না তাঁর।  বলার অপেক্ষা রাখে না একজন চিকিৎসকেরও বেসিক ডিগ্রি গ্রাজুয়েশন।  অথছ ছয় বছরে তার কোনো পদোন্নতি হয় না। 

সরকারের হয়ে দুইজন কর্মকর্তাই জনগণের সেবা দিয়ে গেলেও একজন তরতর করে পদোন্নতি পাচ্ছেন।  আর আরেকজন একই পদে ছয় বছর কাজ করে যাচ্ছেন। তার কোন উন্নতি নাই।  যিনি নয় বছর পর্যন্ত একই পদে কাজ করেন, তার কাজে কি গতিশীলতা থাকবে? অথবা তার কাছ থেকে কি শতভাগ দায়িত্বশীলতা বা নৈতিকতা আশা করা যায়?

এবার আসি আরও রূঢ় বাস্তবতায়, একজন প্রশাসন ক্যাডার তার চাকরির দশ বছরের মাথায় উপ-সচিব পদে পদোন্নতি পান। এজন্য তার গ্রাজুয়েশন ছাড়া অন্য কোন উচ্চতর ডিগ্রির প্রয়োজন হয় না। আর চাকরির দশ বছর পরেও একজন চিকিৎসকের কোন উচ্চতর ডিগ্রি অর্জিত না হলে, তার মাত্র একটা প্রমোশন হবে।  সেটা হলো, চাকুরিতে যে গ্রেডে যোগ দিয়েছিলেন, তার চেয়ে মাত্র এক ধাপ উপরে উন্নীত হবেন। মানে একজন ডাক্তার নবম গ্রেড থেকে অষ্টম গ্রেডে উন্নীত হবেন দশ বছর পর।  আর একজন প্রশাসন ক্যাডার তখন উপ-সচিব এবং তার গ্রেড পঞ্চম।  
এত বৈষম্য কি মেনে নেওয়া যায়? কেউ যদি তার কাজের সঠিক মূল্যায়ন না পায়, তাহলে সে স্বাভাবিকভাবেই কাজ করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। 

এজন্য একজন চিকিৎসক সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তার একমাত্র লক্ষ্য থাকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করা।  যথাসময়ে তা সম্পন্ন না করলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কোন পদোন্নতি হবে না। 

আর এ কারণেই একজন ডাক্তার উপজেলায় থাকতে চান না।  চান ঢাকায় গিয়ে একটা পোস্ট গ্রাজুয়েশন করতে। কিন্তু তিনি যদি তার বেসিক এমবিবিএস ডিগ্রি দিয়ে দশ বছরে উপ-সচিবের সমমর্যাদার পোস্টে পদোন্নতি পেতেন। তারপর সরকারি স্কলারশিপ নিয়ে দেশের বাইরে থেকে পিএইচডি নিয়ে পরবর্তীতে সচিব পদমর্যাদার পোস্টে অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পেতেন, তাহলে কি চিকিৎসকরা উচ্চশিক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে পড়তেন?

যদি এমনটি হতো, তাহলে চিকিৎসকদের একটা বড় অংশ উপজেলা ও জেলা শহরে থাকতে অনিহা প্রকাশ করতে না। 

শুধু তাই না, চিকিৎসকদের মধ্যে দুইটা ভাগ হতো, একভাগ চিকিৎসক গ্রামে, উপজেলায়, জেলায় চিকিৎসা দিতেন এবং নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পর, অভিজ্ঞতা অর্জন সাপেক্ষে পদোন্নতি পেয়ে পেয়ে সচিব পর্যায়ে উন্নীত হতেন। 

আর একদল চিকিৎসক উচ্চশিক্ষা নিয়ে প্রচলিত নিয়মে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, অধ্যাপক পদে উন্নীত হয়ে দেশে মেডিকেল শিক্ষার মান উন্নয়ন তথা দক্ষ চিকিৎসক তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতেন। 

এভাবে গ্রাম ও শহরের চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটা ভারসাম্য তৈরি হতো। তাহলে আর চিকিৎসকদের জোর জবরদস্তি করে হুমকি-ধামকি দিয়ে গ্রামে রাখতে হতো না।  স্বেচ্ছাঃপ্রণোদিত হয়েই তারা গ্রামে চিকিৎসা সেবা দিতেন। 

মাননীয় সরকারপ্রধান আপনি জানেন, যেখানে আলো আছে সেখানে অন্ধকার নাই। আর যেখানে অন্ধকার, সেখানে আলো প্রবেশ করতে পারে না বলেই সেই জায়গাটা অন্ধকার। সরকারের একই জায়গায় একপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার আর অন্যপাশে ফকফকা আলো অবস্থান করতে পারে না। 

আপনার কাছে বিনীত অনুরোধ, সকল জায়গা সমানভাবে আলোকিত হওয়ার সুযোগ দিন। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা চেয়েছিলেন, সাম্যবাদী ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত করতে।  যে বাংলায় মানুষ তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না, যেখানে একই যোগ্যতা ও সামাজিক মর্যাদার মানুষের মধ্যে বৈষম্য থাকবে না। যে যেই ক্ষেত্রে জ্ঞানী ও গুণী তারা সেই ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিবে। এক পেশার লোক অন্যপেশার লোকজনকে শাসন বা শোষণ করার সুযোগ থাকবে না।

আমরা কি এমন একটি সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারি না?
 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

একটি ভুল, একটি গুজব আর বিনা অপরাধের শাস্তি

একটি ভুল, একটি গুজব আর বিনা অপরাধের শাস্তি

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের (শেবাচিম) একটি বিভাগে ডিপ্লোমা কোর্স আনার প্রক্রিয়া চলছিল। উৎসাহী…

সৌদি অপারেশন থিয়েটার বনাম আমাদের অপারেশন থিয়েটার

সৌদি অপারেশন থিয়েটার বনাম আমাদের অপারেশন থিয়েটার

সৌদি আরবে প্রথম অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার দিনটা আমার কাছে মনে রাখার মত…

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে অগ্নিকান্ড ও ডাক্তারদের অর্জন

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে অগ্নিকান্ড ও ডাক্তারদের অর্জন

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকালকে সংঘটিত অগ্নিকান্ডে সমাজের সব স্তরের মানুষের…

মানুষের ভালবাসায় আমি ঋণী

মানুষের ভালবাসায় আমি ঋণী

আমি ময়মনসিংহ শহরে ৩ বছর ৪ মাস কাটাচ্ছি। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের…

রেইপ কেইস ও ধর্ষণ সার্টিফিকেট

রেইপ কেইস ও ধর্ষণ সার্টিফিকেট

কেবল মাত্র ভোরে হয়েছে। পাখির ডাক শুনা যাচ্ছে। আমাদের ইমার্জেন্সী ডাক্তার রুম…

নতুন চেম্বারে অশরীরী আত্মা

নতুন চেম্বারে অশরীরী আত্মা

নতুন একটা চেম্বার পেয়েছি আমি। দামী হাসপাতালের চালু চেম্বার। আজ থেকে একমাস…













জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর