ঢাকা      মঙ্গলবার ২৩, এপ্রিল ২০১৯ - ৯, বৈশাখ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. বাহারুল আলম

প্রখ্যাত পেশাজীবী নেতা


প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধ হলে চিকিৎসা সংকট তীব্র হবে

সরকার নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধ করলে বর্তমান অবস্থার কোন হেরফের তো হবেই না, উপরন্তু তীব্র চিকিৎসা সংকট সৃষ্টি হবে। সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধের ‘উকিল নোটিশ’ না দিয়ে নোটিশটি রাষ্ট্র ও তার সরকারকে দেওয়া প্রয়োজন ছিল। কেন সকল নাগরিক সরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা পাবে না? সেটিই বেশি কার্যকর হত।

জনগণের আনুপাতিক হারে সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন না করে বিভিন্ন সংস্থা দিয়ে চিকিৎসকদের হেয় প্রতিপন্ন করার পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে।

এটি স্পষ্ট যে, সরকারি ব্যবস্থাপনা চিকিৎসা চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে যদি সক্ষম হত তাহলে বেসরকারি চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হত না। কর্তাব্যক্তিরা যে কোন অসুস্থতায় দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে চলে যান। সঙ্গত কারণেই ‘কোন নাগরিক চিকিৎসা নিতে দেশের বাইরে যেতে পারবে না, বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতাল থেকেই চিকিৎসা নিতে হবে’–এরূপ সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ আগামীতে জোরালোভাবে উঠবে। যদি সরকারের ব্যবস্থাপনা সকল নাগরিকদের চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণভাবে সক্ষম ও আস্থাশীল করে গড়ে তোলা হয়। তাহলে ব্যক্তিগত চেম্বারে সরকারি চিকিৎসকদের পরামর্শ দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।

নাগরিকদের চিকিৎসা দেওয়ার সাংবিধানিক দায় রাষ্ট্র ও তার সরকার দুর্বল চিকিৎসক সমাজকে নানাভাবে হেয় প্রতিপন্ন করে এড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। কারণ, নাগরিকরা এখনও বিভ্রান্ত তার বঞ্চনার জন্য সরকার দায়ী না চিকিৎসক দায়ী?
 
সরকারি হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা না পাওয়ার যন্ত্রণা লাঘবের তাগিদে বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের কোন নির্বাহী আদেশে বা ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে নি। ব্রিটিশ আমল বা তার পূর্ব থেকে বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়। তখনও রাষ্ট্র নাগরিকদের চিকিৎসা দেওয়ার দায়িত্ব বহন করত না। তারপর থেকে শহরে-বন্দরে ডাক্তার, কবিরাজের পরামর্শেই মানুষ সুস্থ হয়ে উঠত।

পরবর্তীতে যতবারই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে, কখনও বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যবস্থা কেবল বাংলাদেশ কেন উপমহাদেশেই বন্ধ হয় নি। বিশ্বে কিছু সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছাড়া অন্যান্য রাষ্ট্রে বিভিন্ন পদ্ধতিতে বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা বিদ্যমান আছে। জনগণের চাহিদার তাগিদে ও অতিরিক্ত অর্থ রোজগারের মানসে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা অবসরে ব্যক্তিগত চেম্বারে নির্দিষ্ট ফীর বিনিময়ে পরামর্শ দিয়ে থাকে। বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা দেওয়া ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অদ্যাবধি কোন আপত্তি তোলা হয় নি। 
অতীতে বিভিন্ন সরকার বিশেষ করে এরশাদ স্বাস্থ্য-নীতির নামে বেসরকারি চিকিৎসা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিল। সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে জনগণের প্রয়োজনের চাপে। যারা সরকার নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধে মাঠে গরম বক্তৃতা দেন, তারাই আবার নরম হয়ে ঐ সকল চিকিৎসকদের মতামত গ্রহণের জন্য তার ব্যক্তিগত চেম্বারে সিরিয়াল পাওয়ার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ান।

সরকারের উচিত প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধ না করে তার নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। জনগণের চাহিদার তুলনায় সরকারের চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা যদি কম থাকে, তাহলে এ সকল সস্তা বুলি আউড়িয়ে বা আদালতের আশ্রয় নিয়ে কোন ফল হবে না। অসুস্থ বা মুমূর্ষু রোগী কেবল চিকিৎসা চায়, বাঁচতে চায়, তারা সরকারি বা বেসরকারি নিয়মের সে তোয়াক্কা করে না। 

চিকিৎসককে প্রাইভেট চেম্বারে না পেলে তার বাসায় ঢুকে যেতে দ্বিধা করবে না। আইন দেখিয়ে রোগী দেখতে অস্বীকৃতি জানালে তাৎক্ষনিক শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হবে, বাসভবন ভাংচুর হবে, সরকার বা তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা বাহিনী খুঁজেও পাওয়া যাবে না এবং কোন ভূমিকাও রাখবে না।

মানুষের কাছে তার বেঁচে থাকার প্রয়োজন তীব্র, সে প্রয়োজনে কেউ বাঁধা দিলে হিংস্র হয়ে ওঠে। কোন আইন বা ন্যায় অন্যায়ের ভ্রূক্ষেপ করে না। বহু ঘটনা সাক্ষ্য দেবে– চিকিৎসককে তার বাসভবন ও সরকারি হাসপাতাল থেকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে চিকিৎসা পাওয়ার প্রয়োজনে। বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর রোগী সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসককে আটকে রাখার ঘটনাও একেবারে কম নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

হিমোফিলিয়ার চিকিৎসায় সরকারি উদ্যোগ জরুরি

হিমোফিলিয়ার চিকিৎসায় সরকারি উদ্যোগ জরুরি

রাত ১১টা। মোবাইলে অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে। ভয়-সংশয়ে ফোন ধরতেই ওপাশ…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর