ঢাকা      সোমবার ২৩, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৭, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী

আধুনিক ব্যাক্টেরিয়োলোজির জনক

রবার্ট কচ

আজ থেকে ৪০-৫০ বছর আগেও যক্ষ্মাকে মরণব্যাধি বলে গণ্য করা হত। আজ যেমন এইডস রোগ নিয়ে বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক, অর্ধশতাব্দী কাল আগে যক্ষ্মা নিয়েও ছিল এমনি আতঙ্ক। যার আবিষ্কারের ফলে এই মরণব্যাধি যক্ষ্মা আজ মানুষের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে তিনি হলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানী রবার্ট কচ। তিনিই প্রথম যক্ষ্মার জীবাণু (Mycobacterium Tuberculosis) শনাক্ত করেন এবং পরে তা ধ্বংস করার ওষুধ আবিষ্কৃত হয়। বিশ্বের মানুষ মুক্তি লাভ করে যক্ষ্মার হাত থেকে। 
রবার্ট কচের পুরো নাম হল হেইনরিখ হারম্যান রবার্ট কচ (Heinrich Hermann Robert Koch)।

তিনি ছিলেন জার্মানীর প্রখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী এবং জীবাণুতত্ত্ব বিজ্ঞানের অন্যতম জনক। তার জন্ম জার্মানীর ক্লাউস্থাল (Clausthal) নামক শহরে ১৮৪৩ সালের ১১ ডিসেম্বর। নিজ শহরে স্কুলের পড়া শেষ করে চিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে পড়াশুনা করার জন্য তিনি ১৮৬৬ সালে ভর্তি হলেন গটিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ে (University of Gottingen)।
এই সময়ে তিনি জেলা শহর হাসপাতালে নিজের চেষ্টায় একটি ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করেন। এই ল্যাবরেটরিতেই তিনি অষমধব এবং রোগ জীবাণু নিয়ে গবেষণা করতেন। এরপর ফ্রান্সের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরজীবীবিদ্যার অধ্যাপক ক্যাসিমির জোসেফ ড্যাভাইন (Casimir Joseph Davaine) ১৮৫০ সালে অ্যানথ্রাক্স এর সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষ ও গবাদি পশুর রক্তে একধরনের জীবাণুর সন্ধান পেলেন। কচ তখন এটি নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত একটি ভেড়ার রক্ত নিয়ে ইনজেকশন দিলেন একটি সুস্থ সবল ভেড়ার শরীরে। দেখা গেল কয়েকদিনের মধ্যে সেই সুস্থ ভেড়াটিও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। 
রোগাক্রান্ত ভেড়াটির রক্ত পরীক্ষা করে দেখা গেল তার রক্তেও রডের (Rod) এর মত এক ধরনের অণুজীবী রয়েছে, যেগুলো সুস্থ অবস্থায় এর শরীরে ছিল না। তাহলে রক্তে এই অণুজীবের উপস্থিতির কারণেই ভেড়াটি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। সত্যি সত্যি ভেড়াটি দিন কয়েক রোগ ভোগ শেষে মারা গেল। অর্থাৎ বোঝা গেল, কোনো প্রাণীর দেহে এই ধরনের অণুজীবের অনুপ্রবেশ ঘটলেই সে রোগাক্রান্ত হয় এবং এর পরিণাম হয় মৃত্যু। 
যদিও Davaine, Rayer এবং Pollender অণুজীবটির উপস্থিতি আগে শনাক্ত করেন, তারপরও তখন এর সম্পর্কে সার্বিক ধারণা কারো হয়নি। এসব জীবাণুর জন্ম, বংশ বিস্তার, আচার আচরণ সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি। সে কাজটি প্রথম করলেন রবার্ট কচ।

তিনিই প্রথম এই রডের মত আকৃতি বিশিষ্ট জীবাণুগুলোকে তুলে এনে কাঁচ পাত্রে রাখলেন এবং অনুকূল পরবেশে সেগুলোকে বাড়তে দিলেন, বংশ বিস্তার করতে দিলেন এবং লক্ষ করলেন ওদের জীবনচক্র। দেখলেন জীবাণুগুলো কেমন বিস্ময়কর ভাবে নিজেদের দেহ খন্ডিত করে বংশ বিস্তার করছে। তিনি আরো লক্ষ করলেন এদের জীবন অত্যন্ত শক্ত। এরা শুকনো অবস্থায়ও দীর্ঘদিন, এমনকি বছরের পর বছর সুস্থ থাকতে পারে। পরে অনুকূল পরিবেশ পেলে আবার জীবনীশক্তি ফিরে পায়। শুরু করে বংশ বিস্তার। এই জীবাণুর বংশ বিস্তার এবং জীবন প্রণালী আগে কেউ দেখাতে পারেনি। অ্যানথ্রাক্স রোগ সৃষ্টিকারী এই জীবাণুর নাম হল Bacillus anthracis। এভাবে রবার্ট কচ রোগাক্রান্ত পশু থেকে Bacillus anthracis পৃথক করার মাধ্যমে তখনকার সময়ে রোগ সৃষ্টির জন্য প্রচলিত Spontaneous Generation Theory কে ভুল প্রমাণ করে এবৎ Germ Theory  (রোগ সৃষ্টির জন্যে জীবাণু দায়ী) প্রতিষ্ঠা করেন।

পরবর্তীতে লুই পাস্তুর দেখান যে, অ্যানথ্রাক্স রোগের জীবাণুকে তাপ প্রয়োগে দুর্বল করে ফেলা যায়। এসব দুর্বল জীবাণুকে যদি সুস্থ গরুর দেহে প্রবিষ্ট করা যায়, তবে ওই সব গরু অ্যানথ্রাক্স রোগে মারা যায় না। তাদের দেহে এমন কিছু উৎপন্ন হয়, যা অ্যানথ্রাক্স রোগের জীবাণুকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়। যেসব গরুর দেহে তাপ প্রয়োগে দুর্বল করে ফেলা অ্যানথ্রাক্স রোগের জীবাণু প্রয়োগ করা হয়, পরে তাদের দেহে অ্যানথ্রাক্স রোগের সবল জীবাণু প্রয়োগ করলেও অ্যানথ্রাক্স রোগ হয় না। এভাবে আবিষ্কৃত হয় অ্যানথ্রাক্স রোগের টিকা।
একজন সেরা জীবাণুতত্ত্ববিদ হিসেবে সারা দেশে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। এবার সরকারের দৃষ্টি পড়ল তার উপর। সরকার নিজেই তাকে ডেকে এনে বার্লিনে জার্মান হেলথ অফিসে স্থান করে দিল। সেখানে গবেষণার জন্য তাকে দেয়া হল সব রকমের আর্থিক সহযোগিতা ও অনুদান। সরকারি সহযোগিতা পেয়ে এখানে তিনি স্থাপন করলেন একটি উন্নত মানের গবেষণাগার। তিনি প্রাণিদেহের বাইরে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে জীবাণুর বংশবৃদ্ধির এক নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। তিনি গলিত শিরিসের (gelatin) মধ্যে জীবানুকে মিশ্রিত করলেন, তারপর শিরিস যখন শুকিয়ে শক্ত হয়ে এল তখন তিনি এর একটি অংশকে অন্য মাধ্যমে স্থানান্তরিত করলেন।

দেখা গেল সেখানে গিয়েও জীবাণু সমানভাবেই বংশবৃদ্ধি করছে। কচ বিশেষ করে যক্ষ্মার জীবাণু নিয়ে গবেষনা করতে লাগলেন। তার লক্ষ্য ছিল যক্ষ্মার জীবাণু গুলোকে শনাক্ত করা এবং তাদেরকে আলাদা করে ফেলা। তিনি জানতেন যক্ষ্মা সংক্রামক ব্যাধি এবং এক ধরনের জীবাণু দ্বারা এর রোগের সৃষ্টি হয়। তিনি আসলে যক্ষ্মার এই জীবাণু গুলোকেই খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। তখন পর্যন্ত কেউ এই যক্ষ্মার জীবাণুর সন্ধান পাননি বা তাদের আলাদাও করতে পারেননি। এবার সে চেষ্টাই করতে লাগলেন তিনি। তিনি তার পরীক্ষা পদ্ধতিতে আবার পরিবর্তন ও সংস্কার সাধন করলেন। অবশেষে তিনি সত্যি সত্যি সাক্ষাৎ পেলেন লুকানো সেই ক্ষুদে শয়তানদের। তিনি আলাদাভাবে শনাক্ত করতে পারলেন যক্ষ্মার জীবাণু। যক্ষ্মার জীবাণু আবিষ্কার করলেন বটে কিন্তু আরেকটি সমস্যা দেখা দিল। জীবাণুগুলোকে দিয়ে অন্য জীবাণুর মত প্রাণিদেহের বাইরে বংশ বিস্তার ঘটানো যাচ্ছে না। কিন্তু এই দুরূহ কাজটি তিনি করতে পারলেন আরও দীর্ঘ সাধনার পর।  
এই আবিষ্কারের পরপরই সহসা আরেকটি বড় কাজ এসে পড়ল তার হাতে। মিশরে দেখা দিয়েছিল কলেরা মহামারী। মিশরের কলেরা মহামারী ইউরোপের জন্যও ছিল ভয়ের ব্যাপার। কারণ এই সংক্রামক ব্যাধি ইউরোপেও বিস্তার ঘটতে পারে। তাই এর প্রতিরোধ তখনি করা প্রয়োজন ছিল। অবশেষে জার্মান সরকার রবার্ট কচের নেতৃত্বে একটি মেডিকেল টিম পাঠালো মিশরে। কলেরা নিয়ে গবেষণা করা এবং এর বিস্তার রোধ করা যায় কিনা তার উপায় উদ্ভাবন করাই ছিল এই প্রতিনিধিদলের কাজ। তিনি এর জীবাণু পরীক্ষা করে দেখলেন কমার (,) মত দেখতে এক জাতের জীবাণুই হল এই রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী। কিন্তু এই রোগ মহামারী আকারে বিস্তার লাভ করে কেমন করে, তা তিনি বুঝতে পারলেন না প্রথমে। এ জীবাণুগুলো এত দ্রুত ছড়ায় কেমন করে? আবার চলল তার গবেষণা। অবশেষে তিনি এরও সমাধান করতে সক্ষম হলেন। তিনি দেখলেন পানীয় জল, খাদ্য ও পরিধেয় বস্ত্রের মাধ্যমেই এই মারাত্মক জীবাণুগুলো দ্রুত এক দেহ থেকে অন্য দেহে ছড়িয়ে পড়ে। তাই পানীয় খাদ্য গ্রহণ ও বস্ত্র পরিধান সম্পর্কে যদি জনগণকে সাবধান করে দেয়া যায়, তবে এই রোগের বিস্তার রোধ করা সম্ভব। কলেরা সৃষ্টিকারী এই জীবাণুর নাম হল Vibrio cholerae।
তিনি কলেরা মহামারী নিয়ে গবেষণা করার জন্য ভারত তথা কলকাতা পর্যন্ত এসেছিলেন। এরপর তিনি আবার নতুন করে যক্ষ্মার জীবাণু নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। তিনি এবার পরীক্ষা করে দেখলেন একই দেহে জীবিত যক্ষ্মার জীবাণু ও মৃত জীবাণু একসাথে প্রবিষ্ট করালে কি প্রতিক্রিয়া হয়। মৃত জীবাণু সেখানে কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে কিনা।

তিনি তার গবেষণায় আংশিক সফল হলেন। তিনি এই মর্মে সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে, প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে রোগীকে ভালো করে তোলা সম্ভব। 
ব্যাক্তিজীবনে রবার্ট কচ ১৮৬৭ সালে Emma Adolfine Josephine Fraat কে বিয়ে করেন। তাদের একটি কন্যা সন্তান ছিল। ১৮৯৩ সালে এই দম্পতির বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায় এবং ওই বছরই কচ অভিনেত্রী Hedwig Freiberg কে বিয়ে করেন। Berlin Academy of Sciences এ টিউবারকিউলোসিস গবেষণার উপর লেকচার প্রদানের ৩ দিনের মাথায় ১৯১০ সালের ২৭শে মে Baden-Baden এ ৬৬ বছর বয়সে এই কৃতি বিজ্ঞানীর মৃত্যু হয়। 
যক্ষ্মার জীবাণু আবিষ্কারের জন্য ১৯০৫ সালে তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। যতদিন সভ্যতার অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে, ততোদিন মানুষ শ্রদ্ধাভরে রবার্ট কচের অবদানকে স্মরণ করবে। যুগে যুগে তিনি মানুষকে অনুপ্রেরণা যুগিয়ে যাবেন।
(দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত)

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


রিভিউ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

প্রকাশ হলো ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদারের ‘স্মৃতির পাতা থেকে’

প্রকাশ হলো ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদারের ‘স্মৃতির পাতা থেকে’

মেডিভয়েস রিপোর্ট: কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা.…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস