ঢাকা      মঙ্গলবার ১৭, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ২, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. নাজিরুম মুবিন

মেডিকেল অফিসার, মিনিস্ট্রি অব হেলথ অ্যান্ড ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার


কেমো

কেমো এখনো শুরু না হলেও বাবার বমি শুরু হয়ে গেছে। আশে পাশের মানুষদের বমি করতে দেখলে উনিও বমি করা শুরু করেন। অনেক ভালো মানুষেরও এই সমস্যাটা আছে। বাবার দ্বিতীয় দফা কেমোথেরাপির সময় যখন ছোট ফুফু দেখতে আসলেন তখন বাবাকে বমি করতে দেখে উনিও বমি করে ফেললেন।

অনেকে আবার বাসে উঠলে বমি করে। এটার নাম মোশন সিকনেস। আমার মায়ের এই সমস্যাটা আছে। ঔষধ না খাইয়ে উনাকে কখনোই আমরা বাসে তুলি না। ছেলে হিসেবে মা-বাবার অনেক দোষ-গুণ আমি পেলেও বমি সংক্রান্ত কোন বৈশিষ্ট্য আমি পাইনি।

এইমাত্র বাবা পঞ্চমবারের মতো বমি করলেন।

সিস্টার, ছয় নাম্বার বেডের রোগী আবার বমি করছে। ফাইল হাতে নিয়ে নার্সিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। নার্সদের বয়স বোনের মতো হোক কিংবা নানির মতো হোক সব বয়সের মানুষ তাদের সিস্টার নয়তো দিদি বলে ডাকে। সামনের মহিলাকে আমি সাদা শাড়ি আর মাথায় সাদা কাগজের ক্যাপ ছাড়া দেখলে আন্টি বা চাচী কিছু একটা বলে ডাকতাম।

হাসপাতালের সাপ্লাই ইঞ্জেকশন তো দুইটা দিলাম। আপনি বরং ফাইল নিয়ে ডক্টর রুমে যান। বলেই নার্স আমাকে পাশের রুমটা দেখিয়ে দিল।

 

এই ইঞ্জেকশনটা বাইরে থেকে কিনে আনেন। এনে নার্সকে দেখাবেন। আমি ফাইলে লিখে দিয়েছি। ডিউটি ডাক্তার ঘুমে ছিলেন। সকাল সকাল ঘুম থেকে ডেকে তোলায় চোখে মুখে কিছুটা বিরক্তির ছাপ। কয়বার বমি করেছে বললেন? চশমার উপর দিক দিয়ে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন ডিউটি ডাক্তার।

স্যার, পাঁচবার।

এই রক্ত পরীক্ষাটাও করিয়ে নিবেন। শরীরের লবণগুলো ঠিক আছে কি না দেখতে হবে। রক্ত পরীক্ষার রিকুইজিশন লিখতে লিখতে বললেন ডিউটি ডাক্তার।

সেরাম ইলেক্ট্রোলাইট দেখতে হবে বললেও আমি বুঝতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে বডি ফ্লুইড ইলেক্ট্রোলাইটের উপর তিন ক্রেডিটের পরীক্ষা দিতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে ডাক্তাররা টেকনিক্যাল টার্ম, একাডেমিক টার্ম কম ব্যবহার করে। সাধারণ মানুষের ভাষায় সবকিছু বুঝিয়ে দিতে চায়।

রক্তের স্যাম্পল আর রিকুইজিশনের কাগজটা নিয়ে প্যাথলজি ল্যাবের দিকে দৌড় শুরু করলাম। আজ আমার একটা পরীক্ষা আছে। তাই এত তাড়াহুড়ো করছি। একটা চাকরির লিখিত পরীক্ষা।

এই হাসপাতালের ক্যান্সার ওয়ার্ডটা পুরাতন বিল্ডিঙয়ের একপাশে। আর প্যাথলজি ল্যাব পুরাতন বিল্ডিঙয়ের অপর পাশে যে নতুন বিল্ডিঙটা হয়েছে তার দোতলায়। হাসপাতাল হওয়ার আগে পুরাতন এই বিল্ডিঙটা সচিবালয় ছিল। সচিবালয় পরে অন্য জায়গায় চলে গেলেও হাসপাতালের সামনের রাস্তাটার নাম সেক্রেটারিয়েট রোডই রয়ে গেছে।

পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় বাসে, রাস্তায় তেমন একটা ভীড় ছিল না। শুক্রবার বলে হয়তো। কিন্তু ফেরার পথে প্রচন্ড ভীড়। বাসের ভিতরে মানুষের ভীড়। বাসের বাইরে গাড়ির ভীড়। এই জন্যই এই শহরটা আমার ভালো লাগে না। হঠাৎ খেয়াল হলো আমার চশমাটা তার জায়গামতো নাই। কোথায় ফেলে আসলাম? পরীক্ষার হলে? নাকি মসজিদে? মনে করতে পারছি না। অনেক খানি পথ চলে এসেছি। এখন ফিরে যাওয়াও সম্ভব না।

আমার মায়োপিয়ার সমস্যা। চশমার পাওয়ার খুব বেশি না। মাইনাস ওয়ান পয়েন্ট ফাইভ। কাছের কিছু দেখতে খুব একটা সমস্যা হয় না। দূরের কোন কিছু দেখতে গেলেই দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়। ঘোলা হয়ে যায়। চশমা হারিয়ে গেছে এটা এখন বড় কোন বিষয় নয়। বড় বিষয় হলো কেমোর ঔষধ কেনার টাকাটা এখনো হাতে পাইনি।

বাস থেকে নেমে হাসপাতালের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। দুই-তিন বছর আগে হলে হয়তো রিকশা নিতাম। কিন্তু এখন আমি ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করেছি। আজ কোন কিছুই ভালো লাগছে না। পরীক্ষাটাও ভালো হয়নি। অনার্স পাশ করার পর থেকে বিভিন্ন জায়গায় শুধু পরীক্ষাই দিয়ে যাচ্ছি। প্রিলি, রিটেন, ভাইভা। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এখন আর প্রস্তুতি নেই না। পরীক্ষার দিন গিয়ে জাস্ট বসে পড়ি। আগে টিউশনির টাকা দিয়ে কত কিছু করতাম। এখন শুধু দুটো কাজ করি। চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় অ্যাপ্লাই করি আর শুক্রবার ঢাকা এসে পরীক্ষায় অ্যাটেন্ড করি।

পরীক্ষার চিন্তা ছাপিয়ে আবার কেমোর টাকার চিন্তা মাথায় জেঁকে বসলো। প্রত্যেকবার কেমোথেরাপির ঔষধ কিনতে আঠার হাজার টাকা লাগে। এগুলো দেশি ঔষধ। বিদেশি ঔষধ নিতে গেলে খরচ ত্রিশ পার হয়ে যেতো। কিন্তু এবার আমরা একেবারেই খালি হাতে এসেছি। শুধু যাওয়া আসার টাকাটা সাথে আছে।

অপারেশন আর দুই সাইকেল কেমো দিতেই বাবার সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। ছোট ফুফু বলেছেন, বাকি চিকিৎসার খরচ উনি দিবেন। কিন্তু ভয় ছোটফুফাকে নিয়ে। সোজা বাংলায় উনি মানুষ সুবিধার না। ছোটফুফু উনার স্বামীকে রাজি করাতে পারবে কি না এনিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

 

ছোটফুফু কলেজে থাকতেই প্রেম করে পালিয়ে বিয়ে করেন। ছোটফুফা রাজনীতি করেন। বিরোধী দলে থাকার সময় লম্বা সময় জেলেও ছিলেন। এখন উনি সরকারি দলের লোক। রমরমা অবস্থা। কিন্তু উনার কথা, বার্তা, আচার আচরণ খুব খারাপ। উনার সাথে আমাদের পরিবারের কারোরই সম্পর্ক ভালো না। ছোটফুফু কিভাবে যে এই লোকটার সাথে সংসার করছে আমাদের মাথায় ঢোকে না।

 

ছোটফুফু কল করেছেন। কুসংস্কার সত্যি হলে উনি অনেক দিন বাঁচবেন।

হ্যালো, ফুপি।

হ্যালো বাবা, তুমি কোথায়?

এইতো হাসপাতালের সামনে।

আচ্ছা শোনো। তোমার আর বাসায় আসার দরকার নাই। আমি আর তোমার ফুফা হাসপাতালে যাব সন্ধ্যায়। ভাইজানকে দেখতে। তখন টাকাটা দিলে চলবে?

হুম চলবে

বিশ হাজার দিলে চলবে?

হ্যা, ফুপি চলবে।

 

সন্ধ্যা বেলা। বাবা ঘুমিয়ে পড়েছেন। সকালের পর থেকে আর বমি করেননি। বাবার মাথায় আগে অনেক চুল ছিল। দ্বিতীয় সাইকেল কেমো দেয়ার পর চুল পড়া শুরু হয়। চামড়াও কালো হয়ে যায়। বাবাও কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যান। এই ওয়ার্ডের সব রোগীরই কোন না কোন ক্যান্সার। তবে এই সময়টাতে ওয়ার্ডের সবাই খুব হাসি খুশি থাকে। কেমোর স্যলাইন শেষ হয়ে যায়। আত্মীয়-স্বজনরা দেখতে আসে। যাদের কেউ আসে না তারাও পাশের বিছানার মানুষদের সাথে গল্প জুড়ে দেয়।

বাবা। বাবাআ। ছোটফুফু আসছেন।

থাক থাক। ডাকার দরকার নাই। বাবার পাশে বসে বাবার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন ছোটফুফু। উনার গলা কেমন যেন আটকে আটকে যাচ্ছে। চোখ লাল। কোথাও একটা গড়বড় হয়েছে।

ফুফা, বসেন। বসার জন্য হাসপাতালের টুলটা এগিয়ে দিলাম।

এখানে তো বসার মতো কোন অবস্থাই নাই। বিরক্তি নিয়ে চারপাশে শুধু তাকাচ্ছেন ফুফা। আচ্ছা ভাইজানকে কয় সাইকেল কেমো দিবে? এবার আমার দিকে তাকালেন ফুফা।

ছয় সাইকেল। তারপরে রেডিওথেরাপি আমি বলার আগেই বলে উঠলেন ছোটফুফু।

তুমি কথা কম বলো। তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি ফুফার ধমকে আশেপাশের বিছানার মানুষজনও হঠাৎ করে চুপ হয়ে গেল। ক্যান্সারের রোগীরা কিসে মরে জানো?

জ্বি না ফুফা।

ক্যান্সারের রোগীরা ক্যান্সারের কারণে মরে না। মরে কেমোথেরাপির সাইড ইফেক্টের কারণে। এবার গলার স্বর নরম করে আমাকে বুঝালেন ফুফা। মরার আগে লোকটাকে আর কষ্ট দিও না। এই যে দুই সাইকেল দিতে না দিতেই চেহারা ছবি কেমন হয়েছে দেখছো? এই নাও দশ হাজার টাকা। আর কেমো নেয়ার দরকার নাই। বাড়ি গিয়ে আপেল-আঙুর খাওয়াও। টাকাটা আমার হাতে দিতে দিতে বললেন ফুফা।

ছোট ফুফু হুহু করে কাঁদতে শুরু করেছেন। চারপাশে লোক জমে গেছে। বাবা এখনো ঘুমিয়ে। কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। আগামীকাল সকালের মধ্যে আরো আট হাজার কোত্থেকে যোগাড় করব। নাকি ফুফার কথামতো কেমো না দিয়েই বাড়ি চলে যাব।

 

মধ্যরাত। আমাদের বাস এখন যমুনা সেতু পার হচ্ছে। বাবার তৃতীয় সাইকেলের কেমো ঠিকঠাকই দেয়া হয়েছিল। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে পাঁচশ,একহাজার ধার নিয়ে একটা ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু একুশ দিন পর পর আরো তিন সাইকেলের টাকা কিভাবে যোগাড় করব ভেবে আমি কোন কূল-কিনারা পাই না। সামনে অন্ধকার দেখতে থাকি।

ঘুমাইছিস? আমি একটু নড়েচড়ে বসায় জিজ্ঞেস করলেন বাবা।

না। ঘুম আসছে না। বলো

আমি ঠিক করেছি আমি আর কেমো নিবো না। বাবার ভরাট কন্ঠ কেমন যেন ফ্যাসফ্যাসে হয়ে গেছে।

কেন? কী হয়েছে? আমি বেশ অবাক হই।

ক্যান্সারের রোগীরা কিসে মরে জানিস? ক্যান্সারের রোগীরা ক্যান্সারের কারণে মরে না। মরে কেমোথেরাপির সাইড ইফেক্টের কারণে।

এবার আমার মুখ থেকে কথা সরে যায়। বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে।

তোমাকে এসব আজগুবি কথা কে বলল? আমার ঠোঁট, জিহবা কাঁপতে থাকে। কথা জড়িয়ে যায়।

যে কয়দিন বেঁচে আছি আত্মীয়-স্বজনদের সাথে থেকে ভালো মন্দ খেয়ে মরতে চাই। আমাকে আর কেমো নেয়ার কথা বলিস না বাবার কথার পিঠে কোন কথা খুঁজে পাই না।

আমাদের সামনের সিটে নতুন বিয়ে হওয়া এক দম্পতি বসেছে।

দ্যাখো! আজকের জ্যোৎস্নাটা কত্ত সুন্দর! আহ্লাদী গলায় বলল স্ত্রী।

আমি বাসের জানালা দিয়ে আকাশে তাকালাম। দূর আকাশের পূর্ণিমার চাঁদটা কেমন যেন ঝাপসা লাগে আমার চোখে। কেমন যেন ঘোলাটে। আমি ভুলে গিয়েছিলাম, মায়োপিক মানুষেরা খালি চোখে জ্যোৎস্না উপভোগ করতে পারে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এবার ড্রোনেই পৌঁছাবে জরুরি ওষুধ ও রক্ত

এবার ড্রোনেই পৌঁছাবে জরুরি ওষুধ ও রক্ত

মেডিভয়েস ডেস্ক: রোগীদের কাছে জরুরি ওষুধ ও রক্ত পৌঁছে দিতে নতুন পরিষেবা…

আরো সংবাদ
























জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর