ঢাকা      মঙ্গলবার ২৩, এপ্রিল ২০১৯ - ৯, বৈশাখ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. তারিক আলম অনি

রেজিস্ট্রার
ডিপার্টমেন্ট- এক্সিডেন্ট এন্ড ইমার্জেন্সী, 
গ্ল্যাডস্টোন হাসপাতাল। 
সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া।


ডাক্তারদের মধ্যে গ্র্যাজুয়েশন-পোস্টগ্র্যাজুয়েশন দ্বন্ধ

ডান হাত বনাম বাম হাতের যুদ্ধ!

অদ্ভুত সময়ে লিখছি, যখন দেশে বিসিপিএস/ এফসিপিএস বনাম এমডি/ এমএস যুদ্ধ চলছে। খুব অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করছি যে একটি শরীরের ডান হাত বাম হাতের সাথে যুদ্ধ করছে। নানা কারনে ডাক্তারদের মধ্যে পোস্টগ্র্যাজুয়েশন নিয়ে নানা প্রশ্ন এবং সেই সাথে অভিযোগ। কেউ বলছেন - এফসিপিএস ভালো, কেউ বলছেন এমডি/ এমএস। পক্ষে বিপক্ষে নানা যুক্তি । কোনটাকেই সমর্থন বা খারিজ করছি না। কারণ আমার মনে হয়েছে সবার কথাগুলোই সত্য তার তার দৃষ্টিকোণ থেকে। কিন্তু সব ছাপিয়ে একটা হতাশাজনক সত্য প্রকাশ হয়েই পড়ছে যে, আমরা যাই করছি, যে নামেই ডিগ্রী করছি না কেন তা বহির্বিশ্বে কোন রিকগনিশন পাচ্ছে না।

যেমন আমি অস্ট্রেলিয়ায় কাজ করি, আমার এক কনসালটেন্ট বলছিলেন, কানাডায় তার পরিবার থাকেন, তিনি একবছর কানাডায় কাজ করে আসার কথা ভাবছেন। আমার আরেক কনসালটেন্ট গত বছর নিউজিল্যান্ডে এক বছর কাজ করে আবার অস্ট্রেলিয়াতে কাজ শুরু করেছেন। ব্রিটিশ কনসালটেন্টরা প্রায়ই আবহাওয়ার কারণে অস্ট্রেলিয়াতে এসে বছর কাটান, কাজ করেন। আমার নিউরোসার্জন, যিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াতে কনসালটেন্ট, প্রায় তিন বছর আমেরিকায় কাজ করে দেশে ফিরেছেন। যে ব্যাপারটা নিয়ে অবতারণা করতে চাইছি তা হল এদের সবার ডিগ্রীই ফেলোশিপ( তর্কের খাতিরে এমডি/ এমএস পড়তে পারেন)। এদের ডিগ্রীগুলো ভিন্ন FRCP, FRCS, FRACS, FACEM, FRANZCOG, MD, FACS. কোনটার সাথে কোনটার মডিউলের মিল নেই, নামে মিল নেই কিন্তু একদেশের ডিগ্রী আরেক দেশের ডিগ্রীকে রিকগনাইজ করছে, স্বীকৃতি দিচ্ছে। কেন দিচ্ছে? উত্তরটা হলে তাদের স্ট্যান্ডার্ড ট্রেনিং স্ট্রাকচারের কারণে, সুন্দর একটা ট্রেনিং সিস্টেমের কারণে, যেটা আমাদের দেশে অনুপস্থিত।

আমি আমার ক্ষুদ্র তিন বছরের বিদেশ অভিজ্ঞতায় যা দেখেছি তার নিরিখে আমাদের দেশে কি করতে হবে তা লিখছি -

- ট্রেনিং স্ট্রাকটারড করতে হবে সবার আগে। কারিকুলাম লাগবে। প্রথম বর্ষে কি শিখবে, আর শেষ বর্ষের ট্রেনীর কাছে কি প্রত্যাশা তা ডকুমেন্টেড থাকবে।

- পাশ করার পর দুই বছর রিলেটেড ফিল্ডে কাজ করে, ন্যুনতম ৪ জন কনসালটেন্ট এবং ২জন সিনিয়র নার্সের শতভাগ রেকমেন্ডেশন নিয়ে এপ্লাই করতে হবে। এমবিবিএস শেষ করেই পার্ট-১ পাশ করে ট্রেনিং শুরু এটা হবেনা।

- যারা ট্রেনিং করাবেন তাদের ট্রেনিং করানোর ট্রেনিং মডিউল থাকবে। সাবজেক্ট টপিক অনলাইনে থাকবে পড়ানো হলে ফিডব্যাক থাকবে। শুধু ওয়ার্ড রাউন্ড এ হেটে চলে যাবেন তা হবে না।

-সুপারভিশন এনশিউর করতে হবে। ডেলিগেশন এনশিওর করতে হবে। ট্রেনী যে কাজটা করছে তা সুপারভাইজড এবং রিভিউড হতে হবে সার্বক্ষণিক।

- এক ফেলো বিভিন্ন বর্ষের মিলিয়ে সর্বোচ্চ চারজন কে ট্রেইন করবেন। দীন মোহাম্মদ স্যারের পিছনে রাউন্ডে ৭০ জন, এইসব বন্ধ করতে হবে। কারণ শেষ সারির ব্যক্তিটি হয়তো রাউন্ডে স্যারের এপ্রোনটা দেখতে পাচ্ছেন না! শিখবেন কি !

- ট্রেনিদের ২ বছর ব্যাসিক ট্রেনিং / ৩ বছর এডভান্সড ট্রেনিং এভাবে ভাগ করে ট্রেইন করেন। সাবজেক্ট ভেদে সময়কাল সামান্য ভিন্ন হতে পারে।

- বেসিক এবং এডভান্সড ট্রেনীদের কাজের পরিধিও আলাদা হবে। কি পরিধি তা আমেরিকা/ ইউকে/ অস্ট্রেলিয়ার পাতা থেকে কপি পেস্ট করে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য পার্ট গুলো রাখুন। বেশি গবেষণা করে আবিষ্কার করার দরকার নেই। সব তৈরী করাই আছে।

- তিন বছর ট্রেনিং আর এক বছর কোর্স দরকার নেই। কোর্স মানেই শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি আর স্যারের পছন্দের বই মুখস্থ করা। ৫ বছর ট্রেনিং হোক ঠিকমতো।

- DOPS( Direct Observed Procedure Skills) আনেন। ট্রেনিং পিরিয়ডেই হবে মাসে একটা। পুরো ট্রেনিং পিরিয়ডে সুপারভাইজার ৫০ টি প্রসিডিউর প্রত্যক্ষ করে মূল্যায়ন করবেন তারপর ক্লিয়ারেন্স দিবেন। এসব দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই হবে।

- মাসে একটা WBA( Workplace Based assessment) করেন। পুরো ট্রেনিং লাইফে ৫০ টা করবে সুপারভাইজারের সাথে। এরপর ক্লিয়ারেন্স।

- MiniCeX ( Mini Clinical examination stations) আনেন। প্রতিমাসে একটা। পুরো ট্রেনিং এ ৫০ টা । কনসালটেন্টরা করাবে। সবগুলো ক্লিয়ার করলে কাজ শেষ। এসব দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই হবে।

- লগ বুক। প্রতি মাসে সাইন করেন, অনলাইন করেন। ৫০ টা প্রসিডিউর হলে তার উপর রিভিউ আর অডিট করতে বলেন। হয়ে গেলে কাজ শেষ।

- বছরে একটা পাবলিকেশন আর দুইটা জার্নাল করতে বলেন। রিসার্চ নিশ্চিত করা হোক। পয়েন্ট সিস্টেম আনা হোক বাইরের মত।

- ট্রেনিং তিন লেভেল এ নিশ্চিত করেন- প্রাইমারী উপজেলায় ১ বছর, জেলা সদরে ১ বছর, অন্তত দুটো টারশিয়ারী হাসপাতালে ৩ বছর। অন্তত ৪ জন কনসালটেন্টের আন্ডারে ট্রেনিং নিশ্চিত করা হোক।

- ট্রেনীং পিরিয়ডগুলো ৬ মাসের স্লট করে এসেসমেন্টের( ডিসকাশন ভাইভা/ রিভিউ/ ওয়ার্ক এসেসমেন্ট) ভিত্তিতে পাশ করান। এক স্লট ট্রেনিং হয়ে গেলে ওটা নিয়ে আর কোন প্রশ্ন নাই। কিতাবী এমসিকিউ করবো আর রিটেন লিখবো ওসব বাদ দেই।

- পার্ট-১ বা প্রাইমারী করেন। যেখানে এমসিকিউ এর সাথে মিনি রিটেন আর ভাইভা থাকবে। এক্সিট এক্সামের দরকার নেই। ভাইভা বোর্ড হতে পারে, ট্রেনিং রিভিউ হতে পারে। খুব বেশি এক্সাম চাইলে রাখেন একটা ফাইনাল এক্সাম। কিন্তু ফোকাস হতে হবে ট্রেনিং। ট্রেনিং শেষ হলে ফেলোশিপ। পাশ করলেই ফেলোশিপ নয়। অস্ট্রেলিয়াতে অনেকে ট্রেনিং শেষ করার আগে পরীক্ষা পাশ করে ফেলেন। কারণ অনেক বিষয়েই পরীক্ষায় বসার জন্য ট্রেনিং শেষ করার দরকার হয়না।

- শ্রীলংকায় নিয়ম আছে, প্রথম বিশ্বে একবছর রিলেটেড ফিল্ডে রেজিস্ট্রার হিসেবে কাজ না করলে শ্রীলংকায় কনসালটেন্ট হওয়া যায় না। এটা আনেন। এজন্য স্যাররা কাজ শুরু করেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এপ্রোচ করেন, কোলাটেরাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম/ এক্সচেন্জ প্রোগ্রাম তৈরী করেন।

- অবৈতনিক কোন ব্যাপার শতভাগ নিষিদ্ধ করেন। ক্ষুধাপেটে ডেভিডসন- বেলি লাভ পড়া যায় না। ট্রেনিং ও হয়না।

- ফেলোশিপ পাশ করার পরও তিন বছর অন্তর অন্তর রিভিউ এর ব্যাবস্থা রাখেন। কনটিনিউয়াস প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট ( CPD) মডিউল তৈরি করেন। পাশ করা ফেলো দুই বছরে একটা নতুন ফেলো ট্রেইন করে তৈরী করতে না পারলে তার ফেলোশিপ স্হগিত করেন।

- ট্রেনি ফেলোশিপ শেষ না করতে পারলে তার সুপারভাইজারদের জবাবদিহিতায় আনেন। তিন বা পাঁচবার ফেল হলে ট্রেইনারের ট্রেনিং লাইসেন্স ক্যানসেল করেন।

- আরও অনেক পয়েন্ট। এগুলোই উন্নত বিশ্বের সাথে প্রধান পার্থক্য। আমরা অনেক বেশি থিওরী মুখস্থ করি। বাইরে ব্যবহারিক জ্ঞান টা অনেক বেশি, ট্রেনিং এর গুরুত্ব সর্বাধিক। আমরা এক্সাম টাকে করে ফেলেছি বটল নেক। একগাদা ট্রেনী, নিজেদের মত অভিভাবকহীন ঘুরে বেড়াচ্ছে, কোর্সে এসে নাক মুখ গুঁজে পিজির লাইব্রেরীতে বসে ম্যাটেরিয়াল মুখস্থ করে হয় পাশ করছে, নাহয় ফেল। যে ফেল করছে সে জানছেও না গ্যাপ টা কোথায় তার। কারণ দুজন একই বই পড়লো, একজন পাশ তো একজন ফেল! কারণ কেউ স্ট্রাকচারড ভাবে কিছু শিখায়নি, একজন কিছু একটা শিখিয়েছে ওটাই চলে আসছে। ভুল হলে ভুলটাই প্রাকটিস এ পরিনত হচ্ছে।

এগুলো করেন। ট্রেনিং একবছর/ দুবছর বাড়ুক কিন্তু এরকম স্ট্রাকটারড ট্রেনিং, বেতন সম্মানী, আর ট্রেনিং শেষে যোগ্য হয়ে ফেলোশিপ অর্জন করার নিশ্চয়তার পেলে জুনিয়র ডাক্তাররা না করবে না। কারণ তারা চায় ট্রেনিং এ কেউ শিখাক, প্রপারলি ট্রেন করুক, কনফিডেন্ট হয়ে গড়ে উঠুক, এবং দিনশেষে নিরাপদ এবং স্ট্যান্ডার্ড একজন কনসালটেন্ট হোক। আমি প্রচুর ফেলোকে দেখেছি, সার্টিফিকেট হয়ে গেছে, পরীক্ষা পাশ করে ফেলেছে অথচ রোগী দেখতে কমফোর্টেবল না, প্রসিডিওর স্কিল ডেভেলপ করেনি। এরকম কেন হবে ?? একজন কে ফেলোশিপ প্রদান করার অর্থ হলো সে পরবর্তী একজনকে ট্রেন করার জন্য সক্ষম।

আমি উপরের ব্যাপারগুলো একটাও ভেবে বের করিনি, সব বাইরে কাজ করতে যেয়ে দেখছি। সিস্টেম কত সুন্দর। আমি এটাও বিশ্বাস করিনা আমাদের স্যাররা এসব জানেন না। তারা অবশ্যই আমার চেয়ে অনেক বেশি জানেন, তাদের অনেকেরই বিদেশের ডিগ্রী, বাইরে প্রাকটিস করেছেন, দেখেছেন এসব। শুধু বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি সুন্দর সিস্টেম তৈরীর অপেক্ষা। আমার মনে হয় সময় এসেছে নির্ধারণ করার, আমরা কি করব তা ভাবার। আমরা কি যা করে যাচ্ছি তাই করবো, নাকি সত্যি নিজেদের উন্নত করার জন্য আগাবো?

একটা ট্রল প্রায়ই দেখি, আমরা পাকিস্তান কে পিছনে ফেলেছি। আমাদের প্রতিযোগিতা কি পাকিস্তান ? আমাদের প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত আমাদের নিজেদের সাথে। নিজেদের এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যেন উন্নত বিশ্ব হিংসা করে এই ছোট্ট দেশটাকে নিয়ে। খুব অলীক কল্পনা লাগছে? কই আমার তো লাগছে না। কারণ দেশ থেকে অস্ট্রেলিয়া যাওয়া আসা করার সময় উড়োজাহাজ টা হয় সিঙ্গাপুর, নয় মালয়েশিয়া নাহয় ব্যাংকক এ দাড়ায়। এই ছোট্ট দেশগুলো এত উন্নত হয়ে যেতে পারলে আমরা কেন না? আমাদের ১৭ কোটি জনশক্তি। আমাদের তো এদের ছাড়িয়ে যাওয়া উচিত। সেই প্রত্যাশায় রইলাম। সেদিন দেখবেন উন্নত বিশ্ব আমাদের চাওয়ার আগে আমাদের ডিগ্রী কে স্বীকৃতি দিচ্ছে, সেটা এমডি/ এমএস বা এফসিপিএস যে নামেই হোক! তখন আমরাও স্বীকৃতির আশায় সমর্থন চাইবো না, কারণ তখন আমরাই এস আই স্ট্যান্ডার্ড!

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 




জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর