ঢাকা      সোমবার ২৩, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৭, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


বয়ঃসন্ধিতে সন্তানের সাথে বাবা মা

বয়ঃসন্ধি জীবনের এমন একটা সময়, যে সময়টা ছেলেবেলাকে বড় বেলার সাথে সংযুক্ত করে। এই সময় শারীরিক এবং মানসিক আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। ছোট থেকে হঠাৎ বড় হয়ে যাওয়া নিয়ে এই বয়সী বাচ্চাগুলোর মধ্যে একটা দিশেহারা ভাব চোখে পড়ে বেশি। মূলত হরমোনের তারতম্যের জন্য এগুলো হয়ে থাকে। ইস্ট্রোজেন, প্রজেস্টোরন, টেস্টোস্টেরন, গ্রোথ হরমোন, আরো কত কী!

মনে হয়, এই সেদিনের বাচ্চা, ধাঁই ধাঁই করে বড় হয়ে যাচ্ছে! মেয়েটার আচমকা পিরিয়ড শুরু হয়। বুকে নারীত্বের বৈশিষ্ট্য প্রচ্ছন্ন থেক প্রকট হতে থাকে। অবয়ব জুড়ে লাবণ্য, পেলবতার ছড়াছড়ি। ছেলেটারও ফিনফিনে গলার স্বর কেমন মেঘ গর্জনের মতো গমগমে। দাড়িগোঁফের সাথে পাল্লা দিতে হিমসিম। ওদিকে এক্সিলারী এবং পিউবিক হেয়ারও জানান দেয়, তুমি বড় হয়ে গেছো গো। কৈশোরের কোমলতা খুশিমনে পরাজিত হয় তারুণ্যের টগবগে স্রোতের কাছে। মুখে ব্রন, কন্ঠে অন্যের স্বর আর শরীরে অন্যের শরীর (পড়ুন, বড়র শরীর) নিয়ে দিশেহারা এই বয়সী বাচ্চার। তার উপর আছে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আগ্রহ, অপবাদ। ওই ছেলেটা যেনো কেমন করে তাকায়! বুক ধড়ফড় করে! তারপরও না তাকালে যেনো রাজ্যের অভিমান লাগে! আরেহ, এই মেয়েটা তো অদ্ভূত! এর মনোযোগ পেতে ওর বাসার সামনে দিনে দুইবেলা চক্কর দেয়া এমন কোন ব্যাপার! এদিকে পাড়াপ্রতিবেশি ছে ছে করে, হায় হায় গেলো গেলো। পোলাপান এমন ক্যান! বাপু আমরা বড় হয়নি?

হয়েছেন জনাব/জনাবা, কিন্তু ভুলে গেছেন যে, আপনারও এই দিন গেছে। আমারও গেছে, সবারই যায়। দিনমান পড়াশোনা করা ছেলেটা, মেয়েটা, যে পৃথিবীর তাবৎ আজাইরা কাজ থেকে মুক্ত, সেও দেখি একদিন ফুল হাতে নিয়ে ঢুলুঢুলু মনে অনুভব করে অন্যআলো, অন্যঘ্রাণ! বড় কাউকে দেখলে চট করে বইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে ফেলে! কারো নীল খামে কুলকুল করে ঘামে আবার কী এক অজানা অচেনা ভালোলাগায় ফেলে দিতে মন চায় না, ভুল বানানে লেখা তারই মতো হরমোনের তোরে কাঁপতে থাকা অচেনা বালকের চিঠি! কলকাঠি নাড়ছে হরমোন আর দোষ দিচ্ছেন ওদের। ওদের আর কী দোষ বলুন? বেচারা ওরা! বড়দের মতো আচরণ করলে বলেন ইঁচড়ে পাকা, ছোটোদের মতো করলে ন্যাকা! ভারী জ্বালা তো! আমি বলি কি, এই দোষারোপ কাজের কথা না। বরং আসেন ওদের পাশে থাকি, পরিবর্তনটাকে মেনে নেই আর মানিয়ে নিতে সাহায্য করি। দিশেহারা অবস্থাটাকে সহজভাবে মোকাবেলা করতে শেখালে কোন প্রলোভনের সাধ্য নেই, ওদেরকে ভুল করাতে পারে।

এই সময় মেয়েটাকে শারীরিক পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে পারে ঢিলেঢালা পোশাক। পিরিয়ডে একটু মনোযোগ। ওর সাহায্য লাগবে কিনা, জানতে চান। নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন, দেখুন মেয়ে কেমন নির্ভার বোধ করে। ছেলেটাকে বলুন, বেটা আমি তোর বাবা। আমারো এই দিন গেছে রে বাপ। আহা, কী যে সইসব দিন! প্রথম শেইভের কথা এখনো মনে আছে। কেটেকুটে একেবারে রক্তারক্তি কান্ড। আবেগ আর আতংক। এখনো মনে পড়লে কেমন যে লাগে! আপনার অভিজ্ঞতা শুনতে শুনতে ছেলে ভাববে, আরেহ আমি তো একা নই। আমার বাবাও এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। তবে আমার আর ভয় কি!

আমার ছেলেরা এখনো ছোট। শারীরিক পরিবর্তন তেমন হয়নি। সেদিন ভালো আদর, মন্দ আদর নিয়ে কথা বলছিলাম। তারা জানে সাঁতারের পোশাক পরলে শরীরের যে যে অংশ ঢেকে থাকে, তাকে প্রাইভেট পার্টস বলে। প্রয়োজনে যেমন, গোসলে বাবা, মা এবং অসুখ হলে বাবা মায়ের উপস্থিতিতে ডাক্তার আংকেল আন্টি ছাড়া এসব জায়গায় কেউ পঁচা করে হাত দিতে পারবেনা। কেউ দিলে, তোমার অস্বস্তি হলে বাবা মাকে বলবে। বাবা মা তোমাদেরকে খুব ভালোবাসি, তোমাদের সব কথা বিশ্বাস করি। আমার নিজের একটা মেয়ে না থাকাতে, একটা কল্পিত মেয়ে সবসময়ই আমার মনে মনে থাকে। মনেথাকা মেয়ে বাচ্চাকে আরো সতর্ক হতে শেখাই। বলি,বেটি দুই হাত প্রসারিত কর, সামনে পিছনে, ডানে বামে যতটুকু যায় এর মধ্যে কাউকে ঢুকতে দিবি না, একদম না।

ভাবছি বয়ঃসন্ধির কোন এক মায়াময় মূহুর্তে সন্তানকে নিয়ে বসব। পরিবর্তনগুলো ওকে বুঝিয়ে বলব। আরো বলব, বাবারে, এ সময় তোমার কোন এক পরী মেয়েকে দেখে ভালো লাগবে। এটা স্বাভাবিক বাবা। এই ভালোলাগা ভালোবাসাকে আট দশটা স্বাভাবিক ঘটনার মতোই নিত্য ব্যাপার। নিত্যকে নিত্য হিসাবে নিও। এটা, ওটা আমার চাই। পেতেই হবে, না হলে চলবে না ব্যাপারগুলো এমন নয়। যোগ্য হও, যোগ্যতার পায়ে সবকিছু এমনি এমনি লুটায়। চাইতে হয় না, জোর করে হয় না। জোরের জিনিসে সম্মান থাকে না। অনেকেই আমাকে বলে, আমার নাকি কোন চিন্তা নেই, আমি ছেলের মা। কিন্তু কী জানো, আমার মনেহয়, ছেলের মায়েরা সেদিনই হেরে যায়, যেদিন তার ছেলেদের জন্য, অন্য কোন মেয়ের বুকে কষ্টের হাহাকার লাগে, মেয়ের মায়ের মুখ বেয়ে অভিশাপ নেমে আসে। তোমাদের কাছে আমার একটাই চাওয়া, আর যাই করো মা কে হেরে যেতে দিও না।

বাচ্চাদের বলি, মনেরেখো একজন মানুষ পৃথিবীতে আসেন আল্লাহর ইচ্ছায়, আবার চলেও যান তারই ইচ্ছায়। এই আসা এবং যাওয়ার পথে তার উপর কিছু দায়িত্ব বর্তায়। আমি চাই তুমি তোমার উপর অর্পিত দায়িত্বগুলো ঠিকঠাক পালন করো। তোমাকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারেস্টার হতে হবে এমন নয়। তোমার যা ভালো লাগে তুমি তাই হও। তবে তোমাকে অবশ্যই মানুষ হতে হবে। শুদ্ধ, সুন্দর, সংবেদনশীল মানুষ। মানুষ হলে সব হয়, অমানুষ হলে সব যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

হার্ট ফেইলিউর: পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা

হার্ট ফেইলিউর: পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা

কেরামত মোল্লা সারারাত সোজা হয়ে বসে কাটিয়ে দেন। ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ, ঘুমাতে…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস