২৪ জানুয়ারী, ২০১৯ ০৯:১০ এএম

হাফেজ ডা. ফাহাদের মৃত্যুতে চিকিৎসকদের মাঝে শোকের ছায়া

হাফেজ ডা. ফাহাদের মৃত্যুতে চিকিৎসকদের মাঝে শোকের ছায়া

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট: চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় এক চিকিৎসক নিহত হয়েছেন। বুধবার তিনি রোহিঙ্গাদের সেবা দিয়ে ফেরার পথে এ দুর্ঘটনার শিকার হন। নিহত ডা. জোবাইদুল হক ফাহাদ (২৯) পবিত্র কুরআনের হাফেজ ছিলেন। তার বাড়ি হাটহাজারী উপজেলায়। তিনি নগরীর চান্দগাঁও এলাকায় থাকতেন।

ডা. ফাহাদ চট্টগ্রামের বায়তুশ শরফ আইডিয়াল মাদ্রাসা থেকে দাখিল ও সরকারি হাজী মোহাম্মদ মহসীন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ৫৩তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। এছাড়াও তিনি লাইটার ইয়ূথ ফাউন্ডেশনের কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্বপালনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

হাফেজ ডা. ফাহাদের মৃত্যুতে ভার্চুয়াল জগতে এখন চলছে শোকের ছায়া। তার শিক্ষক, সহপাঠী ও বন্ধুরা সবাই শোকাহত। তাঁর এমন অকাল মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না কেউ।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের থোরাসিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আমিনুল হক তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে লেখেন, ফাহাদের মৃত্যুর খবর শোনে খুব খারাপ লাগছে। সার্জারি ২৫নং ওয়ার্ডের ব্যস্ত ইন্টার্ন ছিল। আমার থোরাসিক সার্জারির রোগীদের ব্যাপারে আলাদা যত্ন নিতো। খুব ভালো ছেলে, এই অল্প বয়সে চলে যাওয়া মেনে নেয়া কষ্টের। সেন্টমার্টিনে একটা প্রোগ্রামে ও একসাথেই ছিল। ওর বাবা-মায়ের জন্য কথা চিন্তা করলে তো আরও খারাপ লাগে।

কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সাইকোলজি বিভাগের লেকচারার ডা. শহীদুল ইসলাম মামুন তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে লেখেন, লাস্ট কবে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে মনে নাই। কিন্তু আজ তোর (মৃত্যুর) কথাটা শুনে৷ চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। বিপদে আপন জন চেনা যায়।

ফাইনাল প্রফের সেই কঠিন মুহূর্তগুলোতে তোর সাথে যে আত্মার বন্ধন তৈরি হইছিল, সেটা এভাবে শেষ হবে কোনদিন চিন্তাও করিনি। সেই ইস্টার্ন লাইফের একসাথে ডিউটি। একসাথে তোর বাইকে করে ঘুরে বেড়ানো। কেমনে ভুলবো রে।

তোর টাইমলাইনের শেষ ছবিটাও যে আমার সাথে। কিছুই ভালো লাগতেছে না। ভালো থাকিস। আমাকেও মাফ করে দিস!ডা. ফাহাদের ফেসবুকে দেয়া শেষ ছবি। গত বছরের ১৩ আগস্ট এ ছবিটি নিজের টাইমলাইনে এ ছবিটি তিনি আপলোড করেছিলেন

চট্টগ্রাম মেডিকেলের চিকিৎসক ডা. রেজাউল করিম শিকদার তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে লেখেন, মেডিকেল ছয় বছর এমবিবিএস লাইফের আমার প্রথম এবং সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল। এত্ত এত্ত সৃতি তার সাথে কিভাবে ভুলব? আমার রক্তের ভাই না হলেও ভাইয়ের চেয়ে কোনও অংশে কম ছিল না সে। সবাই দোয়া করবেন আমার ভাইকে আল্লাহ যেন বেহেস্ত নসিব করেন।

চমেকের ডা. ইমরান হোসেন তার ফেসবুকে ডা. ফাহাদকে স্মৃতিচারণ করে লেখেন, মেডিকেলে যে দিন প্রথম আসি সেদিনই পরিচয়। ভর্তি কার্যক্রম চলছিল, ছাত্রলীগের বড় ভাইরা ঘুরে ঘুরে সবাইকে সাহায্য করছিল। নতুন পরিবেশে অনেকটাই জড়সড় ছিলাম। আমাদের ভর্তির ডেটে একসাথে ৪০-৪৫ জন ভর্তি হতে এসেছিলাম। সিরিয়ালে ও আমার পরেই ছিল।

আমরা যেখানে কিছুটা চিন্তিত ছিলাম সেখানে ও ছিল উৎফুল্ল। ঘুরে ঘুরে সব্বার সাথে কথা বলছিল। মোবাইল নাম্বার নিচ্ছিল। যতদূর মনে পড়ে যখন চলে যাবো তখন ও আমার নাম্বার চাইল। আমরা যেদিন ভর্তি হলাম সেদিন লোকাল অনেক ছেলেই ভর্তি হচ্ছিল। কিন্তু ওর অ্যাপ্রোচটা ছিল অন্যরকম। যেন কত্তোদিনের চেনা।

একই সেকশনে ছিলাম আমরা। পরবর্তীতে সেকশন ভিন্ন হয়ে গেলেও ওয়ার্ড একসাথে ছিল। ওয়ার্ডে ও খুব নিয়মিত ছিল। লোকাল রোগী দেখতে গেলে আমরা সবাই ওকে সাথে নিতাম। চাটগাঁইয়া কথার তরজমা করে দিতো ও।

একসাথে আরএফএসটি করলাম। খুবই মজার মানুষ ছিল। একদিন জানতে পারলাম ও কোরআনে হাফেজ। জিজ্ঞেস করতেই বরাবরের মতো মুখে হাসি দিয়ে বললো, আল্লাহ্ রহম করছে তাই পারছি!

একজন মানুষ কোরআনে হাফেজ, মেডিকেল স্টুডেন্ট, সুন্দর সুদর্শন আর কী লাগে! এতো বন্ধুবৎসল ছেলে খুব কমই দেখেছি। সবাইকে মাতিয়ে রাখতো। নিঃসন্দেহে ছিল আড্ডার মধ্যমণি।

আমাদের মেডিকেলে রাজনীতি ব্যাপারটা দুই বিপরীত মেরুর মতো। কিন্তু শুধু ফাহাদের ক্ষেত্রেই দেখেছি দুই মেরুই এক করতে পারতো। দুই বিরোধীদের ও নির্দ্বিধায় একসাথে দাওয়াত করতো। এক সাথেই খাওয়া দাওয়া। এমনকি একসাথেই মিনি বাংলাদেশ ভ্রমণ, ভাবা যায়!

এতো বড় মিলনের মানুষ তুই তাই হয়তো স্রষ্টার মিলনের ডাকে এতো দ্রুত সাড়া দিলি। কিন্তু এতো তাড়া কেন ছিলরে ফাহাদ! সবে তো শুরু ছিল।

ওপারে ভালো থাকিস ভাই, খুব ভালো। এমন হাসিখুশিই থাকিস। এই হাসিটা তোকে খুব সুট করে!

চট্টগ্রাম মেডিকেলের আরেক চিকিৎসক ডা. ইমরানুল হক তার ফেসবুক টাইমলাইনে লেখেন, শুনেই ভেঙে পড়লাম। আল্লাহ কোরআনে হাফেজ ডা. ফাহাদকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন।

আরও পড়ুন

►রোহিঙ্গাদের সেবা দিয়ে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় চিকিৎসক নিহত

►মেডিকেলে চান্স পাওয়ার পর ডা. ফাহাদের অনুভূতি যেমন ছিল

►আবারো সড়কে প্রাণ গেলো মেডিকেল শিক্ষার্থীর

►মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিহত

►চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় চিকিৎসকের মৃত্যু 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত