ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৪ ঘন্টা আগে
২৪ জানুয়ারী, ২০১৯ ০১:২৭

রোহিঙ্গাদের সেবা দিয়ে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় চিকিৎসক নিহত

রোহিঙ্গাদের সেবা দিয়ে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় চিকিৎসক নিহত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: রোহিঙ্গাদের সেবা দিয়ে ফেরার পথে চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় এক চিকিৎসক নিহত হয়েছেন। নিহত ডা. জোবাইদুল হক ফাহাদ (২৮) পবিত্র কুরআনের হাফেজ ছিলেন। তার বাড়ি চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও এলাকায়।

দোহাজারী হাইওয়ে পুলিশের পরিদশর্ক মিজানুর রহমান জানান, বুধবার রাত পৌনে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে ওই চিকিৎসকের মোটরসাইকেলে হানিফ পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কা দেয়। সাতকানিয়ার হাসমতের দোকান এলাকায় এ দুঘর্টনা ঘটে। বাসটি আটক করা হলেও চালক পালিয়ে গেছে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, নিহত জোবাইদুল হক ফাহাদ কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছিলেন। তিনি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন শেষে মোটরসাইকেলে করে চট্টগ্রামে ফিরছিলেন। 

ডা. জোবাইদুল হক ফাহাদের মৃত্যুতে মেডিভয়েস পরিবার শোকাহত।

ডা. ফাহাদ চট্টগ্রামের বায়তুশ শরফ আইডিয়াল মাদ্রাসা থেকে দাখিল ও সরকারি হাজী মোহাম্মদ মহসীন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ৫৩তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। এছাড়াও তিনি লাইটার ইয়ূথ ফাউন্ডেশনের কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্বপালনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। 

সিএনবি ফায়ার সার্ভিস মাঠে জানাজা

তার চাচাতো ভাই নাছিরুল হক বেলাল মেডিভয়েসকে জানান, হাফেজ ডা. জোবাইদুল হক ফাহাদের নামাজে জানাযা সিএনবি ফায়ার সার্ভিস মাঠে (কাপ্তাই রাস্তার মাথার আগে) বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় অনুষ্ঠিত হয়। এতে চিকিৎসক, মেডিকেল শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ অংশ নেন। 

বিয়ের আসরে বসা হলো না ডা. ফাহাদের

তিন ভাইবোনের মধ্যে হাফেজ ডা. ফাহাদ ছিলেন পরিবারের বড় সন্তান। ডা. ফাহাদেরও আকদ সম্পন্ন হয়েছিল চট্টগ্রাম মেডিকেল থেকে পাস করা ডা. জান্নাতুন নাঈমের সঙ্গে। বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করার প্রস্তুতি ছিল। ঠিক ওই সময়ই আসলো এমন দুঃসংবাদ।

তার জমজ ভাই জিয়াউল হক ফয়সাল আহসান উল্লাহ ইউনিভার্সিটি থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে চট্টগ্রামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। তাঁর একমাত্র ছোট বোন ফারহা আয়েশারও বিয়ে হয়েছে।

শোকে স্তব্ধ আফজল মাঝির পাড়া

ডা. ফাহাদের গ্রামের বাড়ি হাটহাজারী উপজেলার আফজল মাঝির পাড়া এলাকায়। তার বাবা আলহাজ্ব মঞ্জুরুল হক একজন প্রকৌশলী ও ব্যবসায়ী। হাফেজ ডা. ফাহাদের দাদা আলহাজ্ব হযরত শাহ সূফী মাওলানা মাহমুদুল হক মুজাদ্দেদীন ছিলেন জিরিয়া নঈমিয়া মাহমুদিয়া ফাযিল ডিগ্রী মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা।

ডা. ফাহাদকে নিয়ে শিক্ষক ও সহপাঠীদের কথা

হাফেজ ডা. ফাহাদের মৃত্যুতে ভার্চুয়াল জগতে এখন চলছে শোকের ছায়া। তার শিক্ষক, সহপাঠী ও বন্ধুরা সবাই শোকাহত।  তাঁর এমন অকাল মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না কেউ। 

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের থোরাসিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আমিনুল হক তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে লেখেন, ফাহাদের মৃত্যুর খবর শোনে খুব খারাপ লাগছে। সার্জারি ২৫নং ওয়ার্ডের ব্যস্ত ইন্টার্ন ছিল। আমার থোরাসিক সার্জারির রোগীদের ব্যাপারে আলাদা যত্ন নিতো। খুব ভালো ছেলে, এই অল্প বয়সে চলে যাওয়া মেনে নেয়া কষ্টের। সেন্টমার্টিনে একটা প্রোগ্রামে ও একসাথেই ছিল। ওর বাবা-মায়ের জন্য কথা চিন্তা করলে তো আরও খারাপ লাগে।

কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সাইকোলজি বিভাগের লেকচারার ডা. শহীদুল ইসলাম মামুন তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে লেখেন, লাস্ট কবে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে মনে নাই। কিন্তু আজ তোর (মৃত্যুর) কথাটা শুনে৷ চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। বিপদে আপন জন চেনা যায়।

ফাইনাল প্রফের সেই কঠিন মুহূর্তগুলোতে তোর সাথে যে আত্মার বন্ধন তৈরি হইছিল, সেটা এভাবে শেষ হবে কোনদিন চিন্তাও করিনি। সেই ইস্টার্ন লাইফের একসাথে ডিউটি। একসাথে তোর বাইকে করে ঘুরে বেড়ানো। কেমনে ভুলবো রে। তোর টাইমলাইনের শেষ ছবিটাও যে আমার সাথে। কিছুই ভালো লাগতেছে না। ভালো থাকিস। আমাকেও মাফ করে দিস।

চট্টগ্রাম মেডিকেলের চিকিৎসক ডা. রেজাউল করিম শিকদার  তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে লেখেন, ‘মেডিকেল ছয় বছর এমবিবিএস লাইফের আমার প্রথম এবং সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল।  এত্ত এত্ত সৃতি তার সাথে কিভাবে ভুলব? আমার রক্তের ভাই না হলেও ভাইয়ের চেয়ে কোনও অংশে কম ছিল না সে। সবাই দোয়া করবেন আমার ভাইকে আল্লাহ যেন বেহেস্ত নসিব করেন।’

চট্টগ্রাম মেডিকেলের আরেক চিকিৎসক ডা. ইমরানুল হক তার ফেসবুক টাইমলাইনে লেখেন, শুনেই ভেঙে পড়লাম। আল্লাহ কোরআনে হাফেজ ডা. ফাহাদকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন।

চমেকের ডা. ইমরান হোসেন তার ফেসবুকে ডা. ফাহাদকে স্মৃতিচারণ করে লেখেন, মেডিকেলে যে দিন প্রথম আসি সেদিনই পরিচয়। ভর্তি কার্যক্রম চলছিল, ছাত্রলীগের বড় ভাইরা ঘুরে ঘুরে সবাইকে সাহায্য করছিল। নতুন পরিবেশে অনেকটাই জড়সড় ছিলাম। আমাদের ভর্তির ডেটে একসাথে ৪০-৪৫ জন ভর্তি হতে এসেছিলাম। সিরিয়ালে ও আমার পরেই ছিল।

আমরা যেখানে কিছুটা চিন্তিত ছিলাম সেখানে ও ছিল উৎফুল্ল। ঘুরে ঘুরে সব্বার সাথে কথা বলছিল। মোবাইল নাম্বার নিচ্ছিল। যতদূর মনে পড়ে যখন চলে যাবো তখন ও আমার নাম্বার চাইল। আমরা যেদিন ভর্তি হলাম সেদিন লোকাল অনেক ছেলেই ভর্তি হচ্ছিল। কিন্তু ওর অ্যাপ্রোচটা ছিল অন্যরকম। যেন কত্তোদিনের চেনা।

একই সেকশনে ছিলাম আমরা। পরবর্তীতে সেকশন ভিন্ন হয়ে গেলেও ওয়ার্ড একসাথে ছিল। ওয়ার্ডে ও খুব নিয়মিত ছিল। লোকাল রোগী দেখতে গেলে আমরা সবাই ওকে সাথে নিতাম। চাটগাঁইয়া কথার তরজমা করে দিতো ও।

একসাথে আরএফএসটি করলাম। খুবই মজার মানুষ ছিল। একদিন জানতে পারলাম ও কোরআনে হাফেজ। জিজ্ঞেস করতেই বরাবরের মতো মুখে হাসি দিয়ে বললো, ‘আল্লাহ্ রহম করছে তাই পারছি!’

একজন মানুষ কোরআনে হাফেজ, মেডিকেল স্টুডেন্ট, সুন্দর সুদর্শন আর কী লাগে! এতো বন্ধুবৎসল ছেলে খুব কমই দেখেছি। সবাইকে মাতিয়ে রাখতো। নিঃসন্দেহে ছিল আড্ডার মধ্যমণি।

আমাদের মেডিকেলে রাজনীতি ব্যাপারটা দুই বিপরীত মেরুর মতো। কিন্তু শুধু ফাহাদের ক্ষেত্রেই দেখেছি দুই মেরুই এক করতে পারতো। দুই বিরোধীদের ও নির্দ্বিধায় একসাথে দাওয়াত করতো। এক সাথেই খাওয়া দাওয়া। এমনকি একসাথেই মিনি বাংলাদেশ ভ্রমণ, ভাবা যায়!

এতো বড় মিলনের মানুষ তুই তাই হয়তো স্রষ্টার মিলনের ডাকে এতো দ্রুত সাড়া দিলি। কিন্তু এতো তাড়া কেন ছিলরে ফাহাদ! সবে তো শুরু ছিল।

ওপারে ভালো থাকিস ভাই, খুব ভালো। এমন হাসিখুশিই থাকিস। এই হাসিটা তোকে খুব সুট করে!

আরও পড়ুন

►হাফেজ ডা. ফাহাদের মৃত্যুতে চিকিৎসকদের মাঝে শোকের ছায়া

►মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিহত

►আবারো সড়কে প্রাণ গেলো মেডিকেল শিক্ষার্থীর

►চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় চিকিৎসকের মৃত্যু

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত