ঢাকা      বুধবার ১৮, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৩, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



মো. কামরুল ইসলাম

মেডিকেল শিক্ষার্থী,

শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ, জামালপুর।


গল্পটা আমার আব্বা আম্মার জন্য

মেডিকেলে তখন নতুন ভর্তি হয়েছি। গায়ে এপ্রোন, পায়ে সু। দুটো জিনিষই আমি জীবনে প্রথম পড়েছিলাম সেদিন। আয়নায় দাড়িয়ে নিজেকে দেখছিলাম বার বার। কত স্বপ্ন ছিল। স্বপ্নটা আমার একার ছিলো না। বাবা, ভাই, মা, বোনের স্বপ্ন ছিলো আমার থেকে বেশী। হয়তো এজন্যই আজ গায়ে জড়াতে পারছি এই পোশাক।

সকাল ৭.৩০। প্রচন্ড শীত। আমি ব্যাগটাতে মস্ত বড় গাইটন, গ্রেইস এনাটমী, খাতা আর একটা কলম ঢুকিয়ে ক্লাসের পথ ধরলাম। হোস্টেল থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমেছিল। শীতটাও টের পেলাম ভালো মতো। তবে ততটুকু টের পেলাম যতটুকু আমার হুডি আর এপ্রোনকে ভেদ করে ঢুকতে পারে। হঠাৎ আমার মনটা কেমন জানি করে উঠল। আব্বা-আম্মার কথা মনে পড়ে গেল। হাটার গতি কমে এল। ভাবছিলাম আচ্ছা আমি বাড়ি থাকতে এইসময়ে আব্বা আম্মা কি করত?  

বাবার তো নিত্যদিনের রুটিন একই। ফজরের আগে ঘুম থেকে উঠে সবার আগে গোয়াল ঘরে যাবে। গরুগুলোকে বের করবে। খড় বের করে গরুগুলোর সামনে দিয়ে দাতঁ মেজে অযুটা করে সোজা মসজিদের দিকে। নামায পড়ে আবার গোয়াল ঘর থেকে লাঙ্গল, জোয়াল বের করে মাঠের দিকে নামতে থাকবে।

মা তখন ডাকতে থাকবে এই বলে, "কিছু খেয়ে গেলে ভালো হতো না"। বাবা অনেকটা দূরে চলে গেছেন। মায়ের স্বভাব বাবার ভালো করে জানা। কোথাও যাওয়ার আগে মা খাওয়া নিয়েই সব কথা। বাবার সব সময় একটা উত্তর দেয় পরে এসে খাবো।

এখন সাড়ে সাতটা মানে বাবা এখন ঠিক ক্ষেতের মাঝে। প্রচন্ড এই শীতে ঠান্ডা পানিতে কুয়াশার হিমে নিত্যদিন বাবার এ কাজ। কথায় আছে না বাবাদের পরিশ্রম দেখতে যেয়ো না তুমি তা সইতে পারবে না। ওরা বাবা। কারা কারা জগৎ বিখ্যাত হওয়া চাঁদ জয় করা নীল আমস্ট্রং, হিমালয় জয় করা মুসা ইব্রাহিম কে দেখতে যাও। এসো আমার বাবাকে দেখে যাও। তোমরা তাহলে তাদের থেকে বড় কাউকে দেখতে পারবে।

আর মা এখন ঠিক মরিচ আর হলুদ বাটতে বসেছে। কিছুক্ষণ আগে চাল ধুয়ে চুলাতে আগুন দিয়ে এসেছে। বাজারে মরিচ কিংবা হলুদ গুড়া করার মেশিন আছে। গুড়ো করাতেও বেশী টাকা লাগে না। মা তবু নিজ হাতে মশলা বাটে। জিজ্ঞেস করতে হয় না মাকে দেখলেই বুঝা যায় মা আমার প্রশ্নের উত্তর দিবে, "তুই পড়তে বস গিয়ে।নিজ হাতে মশলাগুলো বাটতে যে টাকাগুলো বাচে সেটা দিয়ে তোদের একটা খাতা কেনা যাবে। তোর বাবার কষ্ট একটু কমবে।"

সন্ধ্যে হলেই পড়তে বসতাম আমরা। বিদ্যুৎ ছিলো না তখন গায়ে। হারিকেনের আলোয় পড়তাম আমরা আর আম্মা কুপির আলোতে বেতের কাজ করতেন। যখন ঘুম চলে আসত মা বলতেন, "বাপ আরেকটু পর। আমার এই চালনাটা শেষ হলেই খাওন দিব" মার বুদ্ধি এখন টেরপাই আমাদের পড়া বাড়ানোর জন্যই এইসব করতেন। কখনো কখনো রাতের ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখতাম আম্মা একা একা কুপি জ্বালিয়ে কাজ করছে। আম্মা ফজরের ঘন্টা খানেক আগে উঠে বেতের কাজ শুরু করতেন। আমার মাদার তেরেসা,ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলকে দেখা হয়নি কিন্তু আমি আমার মাকে দেখেছি। আমার মা তাদের থেকে কিছুতেই কম নন।

ক্লাসে ঢুকে বসলাম। জানালার পাশে। স্যার, এলেন ক্লাসে। সবার পরিচিতি নিলেন, পড়াতে শুরু করলেন। আমার মন কিছুতেই ক্লাসে বসছিল না। আব্বা-আম্মা কথা মন থেকে কোন কিছুতেই সরাতে পারছি না। জানালা দিয়ে বাহিরে আনমনে থাকিয়ে আছি। ক্লাসটা শেষ হলো। গত বছরের এই দিনটা।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

প্রশ্ন: স্যার আমি মেডিকেলের ৩য় বর্ষের ছাত্রী। মেডিকেলে ইতিমধ্যেই ১ বছর লস…

ডাক্তাররা রোগের চিকিৎসা করে, মৃত্যুর নয়

ডাক্তাররা রোগের চিকিৎসা করে, মৃত্যুর নয়

: ব্যাটসম্যানদের ভুলে আজ খেলাটা চলে গেল! : ভুল বলছেন কেন? বল…

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সিএমসি, ভেলোরে আমি যে রুমে বসে রোগী দেখছি সেখানে ইন্ডিয়ার অন্যান্য রাজ্যের…

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

রাস্তায় একজনের মুখে সরাসরি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিলো আনিস। আচমকা এ আচরণে…













জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর