ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৩ মিনিট আগে
ডা. শাহ মো. রিমান

ডা. শাহ মো. রিমান

রোগী কল্যাণ ও সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক,

ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদ,

সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, কিশোরগঞ্জ।


১২ জানুয়ারী, ২০১৯ ১০:৫৩

সেই শ্রদ্ধেয় প্রিন্সিপাল স্যার আমাদের মাঝে নেই!

সেই শ্রদ্ধেয় প্রিন্সিপাল স্যার আমাদের মাঝে নেই!

তিনটি বছর মেডিকেলে কাটানোর পর প্রথম বারের মতো সুযোগ হয়েছিলো প্রিন্সিপাল স্যারের বাসায় আসার।  কিন্তু উনার সাথে আর দেখা হলো কই!  উনি তো চির নিদ্রায় শায়িত।  কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছে না নিজের চোখকে, কোনভাবেই সায় দিচ্ছিল না মন।

বারবার মনে হচ্ছিল, যা দেখছি সবই ভুল। এই বুঝি স্যারের ঘুম ভাঙবে। হয়তো বা সম্ভব হতো যদি সৃষ্টিকর্তা চাইতো। এমন নাইনসাফী তো হওয়ার কথা ছিলো না। এই ক্ষতিপূরণ তো কোনো কিছু দিয়েই সম্ভব না। আমরা আজকে কি হারালাম, সেটা হয়তো আমরা আন্দাজ ও করতে পারবো না।

এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, যে মানুষটা গত কয়েক বছর যাবৎ আমাদেরকে তার শাসন আর নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ রেখেছিলো, যার নখদর্পণে ছিলো প্রতিটা স্টুডেন্ট এর A to Z history, যার দেখানো পথে এই মেডিকেল লাইফ শুরু হয়েছিলো, সবার সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানই যার একমাত্র চিন্তা ছিলো, এতোটা ডেডিকেশন যার মনে স্থান নিয়েছিল, সেই শ্রদ্ধেয় প্রিন্সিপাল স্যার আর আমাদের মাঝে নেই। উনার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

এখন তো আর কেউ খোঁজ নিবে না, কে সময় মতো ক্লাসে এলো, আর কে আসে নি, কার এতো ঠেকা! কেউ হয়তো খবর নিবে না পড়াশোনার ।

তার এই অকাল মৃত্যু কেনো জানি মনে হচ্ছে  আমাদের গতিটাকে কমিয়ে দিবে, সব কিছুই কেমন জানি অনিশ্চিত মনে হচ্ছে, ভবিষ্যৎ টা কেমন জানি ঝাপসা মনে হচ্ছে।

যাকে ভরসা করে এখানে থেকে যাওয়া, তিনিই তো আর রইলেন না।

কোমলতা আর কঠোরতার এক সংমিশ্রণ ছিলেন তিনি। তার শাসনের কাছে সবাই মাথা নত করেছে। অনেক সময় হয়তো রাগের বশে অনেক কেই কঠিন শাস্তি দিয়েছেন, এর  পিছনে কিন্তু উনার বিন্দু মাত্র স্বার্থ ও ছিলো না। যা ছিলো সেটা শুধুই আমাদেরকে নিয়মের আয়ত্তে আনার প্রয়াস।

ভুল ত্রুটি নিয়েই আমাদের জীবন, কেউই এই নিয়মের উর্ধে না। আশা করি আমরা এমন কিছু মনে রাখবো না। তার নিয়ম গুলো মেনে চলার চেষ্টা করবো।

এইতো গত ১৬ ডিসেম্বরে সকাল বেলা স্যার নাম ধরে ডাকলেন। বার বার কানে বাজছে তার কথাগুলো। হঠাৎ এমন একটা শকড নিউজ পাবো, কেউ হয়তো আশাও করি নি।

মনে পড়ছে এইতো সেদিন তার সাথে পুরো ব্যাচের ছেলেরা একত্রে লাঞ্চ করলাম, তার ভাগের মাংস খানা আমার পাতে ঢেলে দিলেন , কতো হাসি ঠাট্টা করেছিলেন সেদিন। স্যারের হাতের প্রথম চর খাবার সৌভাগ্য টা এই মেডিকেলে মনে হয় আমারই ছিলো, দোষটা অবশ্য আমারই ছিলো। এনাটমির মতো কঠিন সাবজেক্ট কে যিনি সহজ করে তুলেছেন, উনার কথা কি আর বলে শেষ করা যাবে? 

আজ বার বার মনে হচ্ছে, কেমন জানি একটা অস্বস্তি! 

খুব কাছের কাউকে হারিয়েছি বলে মনে হচ্ছে, কারণ এই ক্ষণিকের জীবনে মা বাবার পরে কেউ যদি এতো টা কেয়ার নিয়ে থাকে, তবে উনি এই মনছুর খলিল স্যার, আর কেউ নন । তার মরদেহটা দেখে মনে হচ্ছে, যেনো এক  নিষ্পাপ শিশু ঘুমিয়ে আছে মায়ের কোলে। এইবার মনে হয় তার মুক্তি হয়েছে, সব শৃঙ্খল ভেঙে আজ উনি চলে গেলেন।

লেখক ঠিকই বলেছেন, মানুষ মরে গেলে পচে যায়, আর বেঁচে থাকলে বদলায়, কারণে অকারণে বদলায় আর আমরা কতোটা নিষ্ঠুর, যে মানুষ টা আমাদের জন্য এত্তো করলো, তার জীবনের শেষ সময়ে এসেও আমরা কিছুই করতে পারলাম না ।

একটা আফসোস রয়েই গেলো, স্যার কারো প্রতি সন্তুষ্ট হলে তাকে কপালে চুমু দেন। হয়তো আমি এমনটার যোগ্য ছিলাম না। তাই পেলাম না। আশা করি একদিন এমন কিছু করবো, যেন আপনি যেখানেই থাকেন না কেনো আমায় নিয়ে গর্ব করতে পারেন।

চোখ বন্ধ করলেই হাসি মাখা মুখটা ভেসে উঠছে। দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়া আর কিছুই নেই আপাতত। মনটা ভারাক্রান্ত, ভুল ত্রুটির জন্য অনেক গালি গালাজ শুনেছি, তবুও মনের গহীনে এক বিন্দু জমানো ভালোবাসা থেকে বলছি, আল্লাহ যেনো আপনাকে বেহেশত নসীব করেন। এইটুকুই কামনা রইলো স্যারের এক নগণ্য ছাত্রের পক্ষ থেকে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত