ডা. শামীম আফজাল

ডা. শামীম আফজাল

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদ,

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, কিশোরগঞ্জ


১২ জানুয়ারী, ২০১৯ ১২:৫৩ এএম

কত রঙের স্বপ্ন দেখি…

  • কত রঙের স্বপ্ন দেখি…
  • কত রঙের স্বপ্ন দেখি…
  • কত রঙের স্বপ্ন দেখি…

হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে শোরগোল পড়েছে। কয়েকজন মানুষ মিলে হৈচৈ করছে। পুরুষের চাইতে মহিলার সংখ্যা বেশি। দুই মহিলা এক সাথে হলে কথা থামে না, এখানে পাঁচজনের বেশি মহিলা আছে।

মুখ বন্ধ থাকার কোন যুক্তি নেই। চুল সাদা পাকা এক মহিলা পান চিবোচ্ছেন। একটু পরপর হসপিটালের দেওয়ালে পানের পিক ফেলছেন। এত মানুষের ঝটলা দেখে উঁকি দিলাম।

উঁকি দিতেই একজন মহিলা মাটিতে বসে কান্না শুরু করলো,  সুরে সুরে কান্না। ওরে, আমার জাদুরে  ডাকাতগুলো মেরেএএএএএ ফেলেছে,  একটু পরপর সুরে টান দিচ্ছে  কয়েকজন মহিলা ঝাপটে ধরে আছে।

বাচ্চা পেটে নিয়ে এক মহিলা মারা গেছে, কেউ মারা গেলে কান্না করারই কথা। আসলে মহিলাটি মারা যায়নি, ওকে মেরে ফেলা হয়েছে।   

শ্বশুরবাড়ির ও নাদান শ্বাশুড়ি বউকে হসপিটালে আসতে দেয়নি। বেশিরভাগ শাশুড়ি এমন হন। নিজের মেয়ে আর ছেলের বৌকে আলাদা চোখে দেখেন।

দুই.

একবার হসপিটালে ভর্তি হওয়া রোগীর হিস্ট্রি নিতে গিয়ে জানতে পারলাম,বাচ্চা জন্মের পরদিন থেকে তাকে কাজে লেগে যেতে হলো!

কী ভয়ংকর ব্যাপার।  শাশুড়িকে অনেকবার বলেছিলো- ‘মা শরীরটা খারাপ লাগছে’।

শাশুড়ি বললেন, ‘বাচ্চা হলে একটু তো খারাপ লাগবেই। তোমরা আজকালকের মেয়েরা যে কী? আমাদের বয়সে আমরা এসব কত করেছি, ঢং দেখলে বাঁচি না’।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনি কাজ করলেন কেন? মহিলাটি উত্তর দিয়েছিল বাবা, আমরা গ্রামে থাকি, নতুন ধান এসেছে, বসে থাকলে কি আর পেট চলে?

কথায় বলেই একটা হাসি দিলো, সুখের নাকি কষ্টের হাসি আমি বিষয়টা খুঁজতে যাইনি।

তিন.

গ্রামে এখনো কুসংস্কার আছে, বাচ্চা ডেলিভারির মরার আগ মুহূর্তে হসপিটালে আসে, তার আগে শাশুড়িরা আসতে দেয় না। কবিরাজী ফুল পানিতে ভিজানো হয়, ওই ফুল যত বড় হবে জরায়ুর মুখ নাকি তত খুলবে!

ফুল কোথায় আর জরায়ু কোথায়? বিষয়টা মানুষের মাথায় ঢুকে না, এটা হলো অন্ধ বিশ্বাস, এই অন্ধ বিশ্বাসে পড়ে অনেক জীবন খোয়াতে হয়। 

ডেলিভারি কেন হসপিটালে হবে, ছিঃ ছিঃ লজ্জার কথা। ডেলিভারির সময় কেন লাইট জ্বলবে? ডেলিভারী হবে অন্ধকার রুমে, গোয়াল ঘরে!

জন্মের পর বাচ্চার নাভি কেটে গোবর লাগানো হবে,  পরে যখন নিওনেটাল টিটেনাস হবে, বলবে অভিশপ্ত বাচ্চা, বাতাস লেগেছে।

কবিরাজ বাচ্চাকে আধা ঘন্টা উল্টো করে ঝুলিয়ে ১০০০ টাকা হাতিয়ে নেবে, পরে যখন বাচ্চার অবস্থা খারাপ হবে, বলবে যান যান সদরে নিয়ে যান। বাচ্চা হসপিটাল এসে আরো বেশি অসুস্থ হবে, সব দোষ ডাক্তারের।

ধর রে মার রে বলে ডাক্তারের কলার চেপে ধরে নিজের হিরোগিরীর প্রমাণ দেবে।

চার.

হসপিটালে একবার ৭/৮ বছরের এক বাচ্চা এসেছিল। এক লোভনীয় বিজ্ঞাপন  দেখে তার বাবা নিয়ে গিয়েছিলো   এক হুজুর সুন্নাতে খৎনা করায়,  খুব কম টাকায়।

হুজুর সাহেব বাচ্চাটার জীবনটা শেষ করে দিলেন,  টুনটুনির মাথার উপরের চামড়া কাটতে গিয়ে উনি টুনটুনির মাথা কেটে দিলেন। ইশশশশশ কী কষ্ট, রক্ত বন্ধ করতে না পেরে উনি মাটি,  গাছের রস কি ব্যবহার করেননি?

তা-ও হসপিটালে আসতে দেয়নি,  পরে যখন টুনটুনির মাথায় ইনফেকশন দেখা দিলো, তখন সবার মনে হলো  হায় হায়, পোলাতো দেশ স্বাধীন করতে পারবে না,  শেষ মুহূর্তে ডাক্তাররের কাছে এসে সব দোষ ডাক্তারের ঘাড়ে চেপে দেয়। ওই ছেলের হয়তো আর কখনো দেশ স্বাধীন করার সুযোগ হবে না, বিয়ের পর হয়তো বৌয়ের কাছে রাজাকার নয়তো দেশদ্রোহী হয়ে সারা জীবন বেঁচে থাকতে হবে।

পাঁচ

মহিলাটা মারা গেলো বাচ্চা পেটে নিয়ে, একটু পর ডেলিভারি রুম থেকে বাচ্চা কান্নার আওয়াজ শুনলাম। বাইরে কয়েকজন খুশিতে আত্মহারা। তিনটা মেয়ের পর এই প্রথম ছেলে! সংসারের প্রদীপ জ্বলেছে। এক পাশে কান্না, আরেক পাশে হাসি, দুটো ঘটনাই পাশাপাশি।

আমরা তাকিয়ে দেখি,  একবার হেসে উঠি আবার কেঁদে দেই।  এমন অভিনয়ে খেলতে খেলতে আমরা একদিন অনুভূতিহীন হই,  তখন সবাই বলে উঠে ডাক্তাদের সত্যিই কোন মায়া দয়া নেই, অথচ প্রতিটা গল্পের ব্যাকগ্রাউন্ডে পড়ে থাকে আমাদের দীর্ঘ নিঃশ্বাস।

কারো কানে পৌঁছায় না…

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত