ঢাকা      শনিবার ২৩, মার্চ ২০১৯ - ৯, চৈত্র, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. নাজমুল ইসলাম

অনারারি মেডিকেল অফিসার

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ, বগুড়া।


ইয়াবা সেবনের একাল-সেকাল

মাদকাসক্তদের মাঝে নব্বই এর দশকে জনপ্রিয় ড্রাগ ছিল হেরোইন। আর আশির দশকে ছিল ফেনসিডিল, যা নব্বই এর দশকেও বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বাংলাদেশে ইয়াবা নামক একটি ট্যাবলেট নেশার উপকরণ হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ঢাবির একটি গবেষণা সাময়িকীতে এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বর্তমান মাদকাসক্তদের ৫৮ শতাংশ ইয়াবাসেবী। গবেষকরা বলছেন, যার অধিকাংশই অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে।

বিভিন্ন মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে যারা চিকিৎসার জন্য শরণাপন্ন হচ্ছেন তাদের অধিকাংশই ইয়াবাসেবী। হেরোইন এবং ফেনসিডিলের চল এখনও আছে, কিন্তু তা সীমিত পর্যায়ে। ইয়াবা, হেরোইন এবং ফেনসিডিলের জনপ্রিয়তাকে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু ইয়াবার এই জনপ্রিয়তার পিছনের কারণ কী? ইয়াবার জনপ্রিয়তার কারণ হিসেবে দুটি বিষয়কে উল্লেখ করা হয়। একটি হচ্ছে-শরীরের উপর তাৎক্ষনিক প্রভাব। আর অন্য কারণটি হচ্ছে সহজলভ্যতা।

রাসায়নিক দিক থেকে ইয়াবা হচ্ছে এম্ফেটামিন। ১৮৮৭ সালে এম্ফেটামিন কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের উত্তেজক ঔষধ হিসেবে আবিষ্কৃত হয়। ইয়াবার সেবন মানুষকে চাঙ্গা করে তুলে। মুখে ১০-৩০ মি.গ্রা. ইয়াবা সেবনে একজন মানুষ নিজেকে খুব চাঙ্গা বোধ করেন। মানুষ নিজেকে চাঙ্গা দেখতে পছন্দ করে,ভালবাসে। ইয়াবা সেবনে দেহে চাঙ্গা ভাব,অতি সতর্কতা,অতি প্রফুল্লতা বিরাজ করে। অবসাদগ্রস্ততা এবং ঘুমকে প্রতিরোধ করে। যারা কঠোর পরিশ্রম করে তাদের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। এথলেটরা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার জন্য এম্ফেটামিন সেবন করে থাকে। ইয়াবাকে বলা হয় আপার ড্রাগ।

ইয়াবা খেলে ঘুম হয় না। এক নাগাড়ে দুই তিনদিনও না ঘুমিয়ে থাকা যায়। ইয়াবা ব্রেনের ভিতরে ডোপামিন নিঃসরণ বৃদ্ধি করে, তখন মানুষ কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করে।অনেকে আবার মনে করেন ইয়াবা মোটা মানুষকে চিকন করে দেয়। ইয়াবাতে ক্ষুধামন্দা হয়। খিদে পায় না। ইয়াবাসেবী ব্যক্তি কম খায়। তখন মাংশপেশি শুকিয়ে যাওয়া আরম্ভ করে। তাই চিকন হওয়ার তথ্য ভুল। একটা সময় এম্ফেটামিন সৈনিকদের যুদ্ধে কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হত। কিন্তু এর ক্ষতিকর দিক বেশি। যার কারণে চিকিৎসকগণ এটার ব্যবহার বন্ধ করেছেন। এর বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে।

যার মধ্যে:

যৌন ক্ষমতা নষ্ট করে। ইয়াবার যৌন উদ্দীপক হিসেবে ব্যবহার ভয়ংকর ক্ষতি ডেকে আনে। পুরুষের যৌন ক্ষমতা পুরোপুরিভাবে ধ্বংস করে দেয়। শুক্রাণু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সন্তান জন্মদানে অক্ষম হয়ে পড়ে। একজন যুবককে বৃদ্ধ মানুষে পরিণত করে।

মেয়েদের মাসিকে সমস্যা হয়।গর্ভকালীন সময়ে ইয়াবা সেবনে গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়।

উচ্চ রক্তচাপ হয়।

কিডনি নষ্ট হয়।

লিভারে মরণব্যাধি রোগ হয়(লিভার সিরোসিস, ক্যান্সার)।

ফুসফুসে পানি জমে।

মেজাজের ভারসাম্যতা হারায়।

নিদ্রাহীনতা হয়।

আত্নহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

পাগলের মত প্রলাপ বকতে থাকে।

অতিরিক্ত সেবনে (ফ্যাটাল ডোজ) মস্তিস্কে রক্ত ক্ষরণ হয়ে মৃত্য পর্যন্ত ঘটতে পারে। উপরে বর্ণিত সমস্যাগুলো ছাড়া আরও বহু সমস্যা তৈরি হয় ইয়াবা আসক্ত কারীদের। যেমন: অস্থিরতা, হাত-পায়ে কাঁপুনি ধরা, বাচালতা, দ্বিধান্বিত চিন্তা, অতিরিক্ত ঘেমে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে।

আমাদের মস্তিস্কের সম্মুখভাগে বিচার-বিবেচনার মত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার অংশ অবস্থিত, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে ফ্রন্টাল লোব বলা হয়। ইয়াবা সেবনে ফ্রন্টাল লোবের কার্যকারিতা নষ্ট হয়। এ কারণে ইয়াবা আসক্ত ব্যক্তিরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ফলে আসক্ত ব্যক্তি পাষণ্ড হয়, হিংস্র হয়ে যায়। নেশার টাকা জোগাতে যে কোন হীন কাজ করে। এমনকি নিকট আত্নীয়দের বুকে ছুড়ি চালাতে তাদের বুক কাঁপে না। ইয়াবা থেকে মুক্তির পথ কী মনে রাখতে হবে, যে কোন ব্যাধি প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করাই অতি উত্তম। বর্তমানে এটা আমাদের সমাজের জন্য একটা মারাত্নক অভিশাপ। ইয়াবার ছোবলে আমাদের তরুণ প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমাদের চোখের সামনে মেধাবী ছেলেমেয়েগুলো সম্পদ থেকে আবর্জনায় পরিণত হচ্ছে। ফলে দেশ মেধাহীন হয়ে পড়বে।

ধর্মীয় অনুশাসন জোরদার করার পাশাপাশি সরকারি আইনের বাস্তব প্রয়োগ ঘটাতে পারলে এ সমস্যা থেকে সহজেই উত্তরণ সম্ভব। সীমান্তে মাদক বিরোধী বিশেষ টাস্কফোর্স দিয়ে মাদকের আমদানি বন্ধ করতে হবে। মাদকের স্বাস্থ্যের, অর্থের, দেশের, পরিবারের ক্ষতি সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে হবে। আসক্ত ব্যক্তি যদি পুনরায় স্বাভাবিক সুস্থ জীবন ফিরে পেতে চায়,তাদের জন্য নিরাশ হওয়ার কিছুই নেই। স্বাভাবিক জীবনে তারা ফিরতে পারবেন। শুধু প্রয়োজন ধৈর্য সহকারে চিকিৎসা। চিকিৎসা একটু দীর্ঘ মেয়াদী হবে। আসক্ত ব্যক্তির সাথে খারাপ ব্যবহার না করে, বার বার কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে ভালোভাবে বুঝাতে হবে। শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন। এর জন্য মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে-অপরাধী নয়, অপরাধই ঘৃণার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন অধ্যাপক ডা. বুলবুল সরওয়ার

সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন অধ্যাপক ডা. বুলবুল সরওয়ার

মেডিভয়েস রিপোর্ট: আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭-এর জন্য মনোনিত হয়েছেন অধ্যাপক ডা. বুলবুল সরওয়ার।…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর