ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বিভাগীয় প্রধান, প্যাথলজি,

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ।


০৬ জানুয়ারী, ২০১৯ ০২:০৯ পিএম

ফিজিওলজি ও প্যাথলজি

ফিজিওলজি ও প্যাথলজি

আমাদের জানা অজানায় শরীরের ভিতরে ও বাইরে অনেক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। শরীরের প্রয়োজনেই এই সব ঘটনা ঘটছে। এইগুলিকে বলা হয় ফিজিওলজিকাল ঘটনা। কিছু কিছু ঘটনা ঘটে যা শরীরের জন্য মোটেই প্রয়োজন নাই, বরং ক্ষতিকর। এইগুলিকে বলা হয় প্যাথলজিকাল ঘটনা। অল্প কিছু ঘটনা ঘটে যা প্রয়োজনীয় না বা ক্ষতিকরও না। এইগুলি হল ডিসঅর্ডার। যেমন কোন একজনের এক হাতে পাঁচ আঙ্গুলের জায়গায় ছয় আংগুল নিয়ে জন্মগ্রহন হল। তার প্রয়োজন পাঁচ আঙ্গুল। ছয় আঙ্গুল থাকাতে তার কোন ক্ষতি হচ্ছে না। তাই এটা একটা জন্মগত ডিসঅর্ডার।

মানুষ বা যে কোন জীব প্রথম কিভাবে তৈরি হয়েছে তা কোন বিজ্ঞানী সঠিকভাবে বলতে পারেনি। সবাই যার যার থিউরি দিয়েছেন। কোনটিই প্রমাণিত নয়। প্রথম সৃষ্টি নিয়ে সঠিক ধারণা না থাকলেও পরবর্তী জেনারেশন থেকে জেনারেশন জীব সৃষ্টি ও বংশবৃদ্ধি নিয়ে বিজ্ঞানীদের স্পষ্ট ধারণা আছে। প্রথম সৃষ্টি নিয়ে একেক ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে একেক রকম ধারনা বা বিশ্বাস আছে। 

ইসলাম ধর্মের বিশ্বাস মতে প্রথম মানব মাটির তৈরি। সেই মানব থেকেই মানব জন্মের পদ্ধতির মাধ্যমে বংশ বিস্তার করে এখন এতগুলি মানুষে পৃথিবী ভরে গেছে। ফিজিওলজি বিদ্যার মাধ্যমে জানা গেছে যে মানুষের শরীরে যেসব পদার্থ আছে সেসব পদার্থ মাটিতে বিদ্যমান। মানুষ মারা গেলে মাটিতে পুতে রাখলে ধীরে ধীরে এটা মাটির সাথে মিশে যায়। 

এইসব মাটির কনিকা জৈবিক বায়োকেমিক্যাল বস্তু হিসাবে মানুষের শরীরে থাকে শারীরিক কাজকর্ম করার জন্য। বিভিন্ন কেমিকেল সাবস্টেন্স শরীরের কোষ থেকে তৈরি হয়ে শরীরের ভিতরেই প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদন করে। কেন তৈরি হয়, কিভাবে তৈরি হয় এটা চিকিৎসা বিজ্ঞানী দের কাছে পরিষ্কার। কিন্তু কার ইশারায় এই রকম হয় তার ব্যাখ্যা আমি পাই নি। তবে মুসলিম হিসাবে আমি বিশ্বাস করি আল্লাহর ইশারায় এই রকম হয়। উদাহরণসরূপ আমি বলতে পারি একজন মেয়ে মানুষের কথা। একজন মেয়ে জন্মের পর ধীরে ধীরে সে বড় হয়। 

১২/১৩ বছর পর থেকেই তার দেহের অংগে পরিবর্তন হতে থাকে। তার স্তন ও জরায়ু বৃদ্ধি পায়। কেন বৃদ্ধি পায় তার উত্তরে চিকিৎসকগন বলবেন যে হরমোনের কারনে। হরমোনই বা বৃদ্ধি পাবে কেন। উত্তরে চিকিৎসকগন বলবেন এটা জেনিটিকালি ডিটার্মাইন্ড। এই রকম অসংখ্য ব্যাখ্যা আছে চিকিৎসা বিজ্ঞানে। প্রশ্ন হলো কিই বা দরকার আছে টিন এইজে গিয়ে স্তন বৃদ্ধি পেতে। উত্তর হলো শারীরিক সৌন্দর্য ও স্বামীকে আকৃষ্ট করার জন্য। এমনকি স্বামীর সাথে দৈহিক সম্পর্কের জন্য স্তন একটি অপরিহার্য অংগ। কাজেই এই সময় হরমোন বেশী নিস:রন হওয়া এবং তার কারনে স্তন বৃদ্ধি পাওয়া একটা ফিজিওলজিকাল ব্যাপার। 

বিয়ের পর মেয়াটা যখন প্রেগন্যান্ট বা সন্তান ধারন করে তখন স্তন আবার বৃদ্ধি পায়। কেন বৃদ্ধি পায়? উত্তরে চিকিৎসকগন বলবেন এই সময় হরমোন বেশী তৈরি হয়। তাই আবার স্তন বৃদ্ধি পায়। প্রয়োজন কি? মনে হচ্ছে এখন প্রয়োজন নাই। তবে সন্তান জন্মের পর দুধ তৈরির জন্য বেশী পরিমানে দুধের গ্ল্যান্ড প্রয়োজন আছে। তার জন্য স্তন প্রস্তুতি নিচ্ছে। কাজেই এটাও ফিজিওলজিকাল ব্যাপার। 

এরপরের ঘটনা হল সন্তান প্রসবের পর। স্তনের সাইজ আরো বৃদ্ধি পায় সন্তানের জন্য দুধ তৈরি হয়ে। কেন হয়? এটাও বেশী পরিমানে ল্যাক্টেটিং হরমোন বেশী তৈরির কারনে। এটাও ফিজিওলজিকাল ব্যাপার। সন্তান দুই বছরকাল দুধ পান করে যখন শক্ত খাবার খেয়েই জীবন ধারন করতে পারে তখন স্তনের সাইজ কমে গিয়ে সাভাবিক হয়। কাজেই এটাও ফিজিওলজিকাল ব্যাপার। 

পঞ্চাশ বছরের পর থেকে সাধারণত স্তন ও জরায়ুর চাহিদা কমতে থাকে। তাই এদের সাইজও কমতে থাকে। বয়স্ক মহিলাদের স্তন ও জরায়ু শুকিয়ে ছোট হয়ে যেতে পারে। এটা কে বলা হয় সিনাইল এট্রফি। এই সময় বড় জরায়ু ও স্তনের প্রয়োজনীয়তা থাকে না। কাজেই এটা ফিজিওলজিকাল এট্রফি। এটাও হরমোন কমে যাওয়ার জন্য হয়। 

এরকম অসংখ্য ঘটনা ঘটে যাচ্ছে ছেলে মেয়ে সবার শরীরের ভিতর। ব্যাতিক্রম যখন হয় তখন শারীরিক সমস্যা হতে পারে। সমস্যা হলেই বলা হয় প্যাথলজিকাল। তার জন্য যদি কেউ ভোগান্তিতে পড়ে তখন বলা হয় ডিজিজ বা বেআরাম বা রোগ। ভোগান্তি না হলে বলা হয় ডিসঅর্ডার।

আগে যে ঘটনাগুলি বললাম সেগুলি যদি অসাভাবিকভাবে হয় তাহলে সেগুলি প্যাথলজিকাল। হরমোন যদি সাভাবিকের চেয়ে বেশী বা কম তৈরি হয় তাহলে শরীরের অংগপ্রত্যংগও বেশী বা কম কাজ করবে। কোন কোন সময় নির্দিষ্ট কিছু কোষ বৃদ্ধি পেয়ে টিউমার হবে। খারাপ ও মারাত্মক টিউমারকে বলা হয় ক্যান্সার। এই গুলি শুধু অপ্রয়োজনীয় না, জীবন নাশকারী বটে। কাজেই এগুলিও প্যাথলজিকাল।

ফিজিওলজিকাল ঘটনাগুলি কিভাবে প্যাথলজিকাল ঘটনায় রুপান্তরিত হয় তার একটা উদাহরণ দিচ্ছি। মনে করেন, একটা মেয়ের স্তন বৃদ্ধি পাবে এটা ফিজিওলজিকাল। কিন্তু যদি দেখা যায় এর কোন অংশ বৃদ্ধি পেতে পেতে টিউমার হয়ে গেলো। মেয়ের জরায়ুতে সন্তান আসা দুরের কথা বিয়েই হয় নাই। অথচ তার স্তনের বোটা দিয়ে দুধ বের হচ্ছে। কেন হচ্ছে? হয়তো তার মাথায় বা পেটের ডিম্বাধারে কোন টিউমার বা অসাভাবিক কিছু হয়েছে যেখান থেকে দুধ তৈরি করার হরমোন বেশী বেশী তৈরি হচ্ছে। এটা প্যাথলজিকাল। কম বয়সেই স্তন শুকিয়ে ছোট হয়ে গেলো। কেন হলো? স্তন বড় রাখার যে হরমোন তা তৈরি হচ্ছে না কোন কারনে। যেটা হওয়ার কথা ছিল বৃদ্ধ বয়সে। কাজেই এটা প্যাথলজিকাল। 

এখন কথা হল কার ইশারায় বা কার নিয়ন্ত্রনে এসব ঘটনা হচ্ছে? সন্তান জন্ম হবে নয় মাস পরে। কার পরিকল্পনায় স্তনের দুধের গ্লান্ড বৃদ্ধি পেতে শুরু করলো। একটি কুকুরের ৮/১০ টি বাচ্চা হয়। সেই বাচ্চাদের জন্য কার পরিকল্পনায় মা কুকুরের স্তনে ৮/১০ টি বাট থাকে? কার পরিকল্পনায় অন্যান্য পরিবর্তনগুলি ঘটলো, সেটা ফিজিওলজিকাল হউক আর প্যাথলজিকাল হউক, আমি মেডিকেল সাইন্সে খুঁজে পাই নি। শুধু মুসলিম হিসাবে বিশ্বাস করি একমাত্র স্বত্বা আল্লাহর পরিকল্পনায়। চিকিৎসকগন ফিজিওলজি জেনে প্যাথলজিকাল ঘটনার কারন গুলি খুঁজে বের করে রোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন মাত্র।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত