ঢাকা      শনিবার ২৩, মার্চ ২০১৯ - ৯, চৈত্র, ১৪২৫ - হিজরী

৪০ বছর বয়সে ৪৪ সন্তানের জননীর গল্প

মেডিভয়েস ডেস্ক: উগান্ডার মুকোনো জেলার কাবিমবিরি গ্রামের এক নারী ৪০ বছর বয়সে ৪৪ সন্তানের জন্ম দিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রখ্যাত গণমাধ্যম সম্প্রতি ওই নারীকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ৪৪ সন্তানের মধ্যে ছয়জনকে হারালেও বর্তমানে ৩৮ জন এখনো জীবিত আছেন এবং একই বাড়িতে তিনি তার সব বাচ্চাদের সাথে থাকেন।

৩৮ সন্তান নিয়ে দুঃখে কষ্টে দিনাতিপাত করলেও তিনি তার সন্তানদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক হিসেবে দেখতে চান। 

জানা যায়, মারিয়াম নাবাতানজি ছয় বার যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। এর মধ্যে একসঙ্গে তিনটি করে সন্তান জন্ম দিয়েছেন চারবার। এ ছাড়া একসঙ্গে চারটি করে সন্তান জন্ম দিয়েছেন তিনবার। বাকি দুটি সন্তান এককভাবে পৃথিবীর মুখ দেখেছে। সন্তানদের মধ্যে ছেলেই বেশি। তিনি ২৬ জন ছেলে ও ১২ জন মেয়ে সন্তানের জন্ম দেন। সবার বড় সন্তানের বয়স এখন ২৩ বছর। আর সবার ছোটটির বয়স মাত্র ১০ মাস।

স্থানীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, ওই নারী তার এই ফার্টিলিটি (সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা) এত বেশি যে, তার শরীরে কোনো জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কাজ করতো না। যতবার সে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে ততবার তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘটেছে। 

বিয়ে ও পরিবার:

মারিয়াম ছোটবেলায় তার মাকে হারান। তার বাবা অনেকগুলো বিয়ে করেছিলেন। একদিন তার সৎ মা তাকে তার চার ভাইবোনসহ খাবারে বিষ মিশিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করেন। তার ভাইবোনরা ঘটনাস্থলে সবাই মরে গেলেও সে যাত্রায় তিনি সৌভাগ্য ক্রমে বেঁচে যান।

বাবা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমার বাবা অনেকগুলো বিয়ে করেছেন। তার (বাবার) সন্তানের সংখ্যা ৪৫ জন। আমার সৎ মায়েদেরও এক সঙ্গে ৪টি, তিনটি ও দুটি করে সন্তান হয়েছে।
১২ বছর বয়সী মারিয়মের বিয়ে হয় এক চল্লিশ বছরের এক ব্যক্তির সঙ্গে। বিয়ে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যখন আমার বিয়ে হয় তখন বিয়ে সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। মানুষ আমার বাবার কাছে আসা-যাওয়া করত। একদিন আমাদের বাড়িতে মেহমান আসল। চাচী আমাকে একজন পুরুষের (স্বামী) কাছে নিয়ে গেল।

ছেলে মেয়েদের নিয়ে নানা স্বপ্ন:

মরিয়ম জানান, তার এতগুলো সন্তানকে তিনি এক হাতে মানুষ করেছেন। গত কয়েক মাস আগে তার স্বামী তাকে ভুল বুঝে ছেড়ে দিয়েছে। তার সবচেয়ে বড় মেয়ে ইতিমধ্যে নার্সিং ট্রেনিং সম্পন্ন করে চাকরি করছে। সন্তানদের সবার টেবিলে খাবারের সংস্থান তাকেই করতে হয়। প্রায় সময় অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীও এসে খাবার দিয়ে যান। সৌভাগ্যবশত তার কিছু ছেলেমেয়েকে সরকার বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ দিয়েছে।

মারিয়াম বলেন, আমি আমার খাবারের জন্য সংগ্রাম করি। আমার ছেলেমেয়েদের শিশুদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমার চেষ্টার কোনো কমতি রাখি না।' জীবন সংগ্রামী এ নারী ডেইলি মিররকে বলেন, আমি কষ্ট করে আমার ছেলেমেয়েদের মানুষ করছি। তারা স্কুলে যায়। আমার আশা একদিন তারা ডাক্তার, শিক্ষক ও ইঞ্জিনিয়ার হবে। আমি এটা শুধু প্রত্যাশা করি, কিন্তু এটি বাস্তবে হবে কিনা তা জানি না।

যেভাবে দিন কাটে মারিয়ামের:

মরিয়ামের দিনের শুরু হয় কাপড় ধোয়া দিয়ে। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে এতগুলো সন্তানের ময়লা হওয়া কাপড়গুলো ধুতে যান। কাপড়গুলো ধুতে ধুতেই সকালের নাস্তার সময় হয়ে যায় তার। এর মধ্যে গৃহস্থালীর অন্য কাজগুলোও সারেন। নাস্তার সময় সব ছেলেমেয়েদের গোল করে বসান। একবারে কিনে আনা রুটি দিয়ে তাদের হয় না। একাধিকবার দোকানে যেতে হয়।

তারপর বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর কাজ। আবার দুপুরের খাবারের আয়োজন। এসব কিছুতেই সময় চলে যায় মরিয়মের। একটুও বিশ্রামের ফুসরত নেই তার। তার বড় ছেলে চার্লস মুসিসি (২৩) বলেন, আমরা আমাদের বড় হওয়ার ক্ষেত্রে বাবার কোনো আদর পাইনি। সব পেয়েছি মায়ের কাছে। আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, আমার ভাইবোন জানে না বাবা কী জিনিস। আমি তাকে সর্বশেষ ১৩ বছর বয়সে দেখেছিলাম। তিনি শুধু রাতে আসেন।

প্রথম গর্ভবতী হওয়ার গল্প:

তিনি ১৯৯৪ সালে প্রথম অন্তঃস্বত্ত্বা হন। যখন তার বয়স ১৩ বছর, তখন তিনি তার প্রথম সন্তান জন্ম দেন। গ্রামের স্বাভাবিক নিয়মের মতই তিনি সন্তান জন্ম দেন। ওই প্রসবের ধাত্রী ছিলেন তার নিজের দাদি। এর মধ্যে ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা থাকাকালীন ৫ শিশু তার পেটে নষ্টও হয়েছে। যখন তার ১৮টি সন্তান হয়েছিল তখন তিনি গর্ভবতী হওয়া বন্ধ করতে চেয়েছিলেন।

মরিয়াম জানান, তিনি অনেকবার চেষ্টা করেছেন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করার। কিন্তু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে তা করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। বার্তা সংস্থা সিনহুয়াকে তিনি বলেন, আমি যখনই জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির পরিকল্পনা করেছি, তখনই নানা সমস্যা হয়েছে। এজন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা আমাকে বলেছে, আমি যেন তা গ্রহণ না করি। তারা বলেছে, তুমি সন্তান জন্ম দিতে থাকো, না হয় তুমি মারা যাবে।

কেন এমন হয়:

চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, ডিম্বস্ফুটনের সাত দিন ব্যাপী সময়ের মধ্যে স্বামীর সঙ্গে মিলন হলে একজন স্ত্রীর গর্ভবতী হবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী। সাধারণত শেষ মাসিকের ১২ দিন এই সময় আসে। একটি ডিম্বানু ডিম্বাশয় থেকে নির্গত হওয়ার পর ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত জীবিত থাকে। গর্ভধারণের লক্ষ্যে এ সময়ের মধ্যে ডিম্বাণুটিকে শুক্রাণুর সাথে মিলিত হতে হবে। এমন কোন তথ্য নেই যে যেই দিন ডিম্বস্ফুটন হয় শুধু সেই দিন মিলিত হলেই আপনি গর্ভবতী হতে পারবেন। একজন নারীর শরীরে শুক্রাণু ৪-৫ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। এই কারণে ডিম্বস্ফুটনের ৪-৫ দিন মিলন হলেও শুক্রানুটি ডিম্বাণুর জন্যে ডিম্বনালীর ভেতরে অপেক্ষা করে থাকতে পারে।

উগান্ডার জাতীয় রেফারেল হসপিটালের গাইনোলজিস্ট বিভাগের কনসালটেন্ট চার্লস কিগুডু বলেন, তার এ সন্তান জন্মদান প্রক্রিয়া স্বাভাবিক নয়। কিছু নারীর মাঝে এমন প্রবণতা থাকতে পারে। কারণ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতি মাসে একজন নারীর শরীরে ১২ থেকে ১৫টি কার্যকর ডিম্বানু উৎপাদিত হয়। যার মধ্যে সাধারণত জরায়ুতে চূড়ান্তভাবে এক থেকে দুটি টিকে গিয়ে তার সন্তানে পরিণত হয়।

তিনি বলেন, এটি জেনেটিক ফ্যাক্টর, পরিবেশগত ফ্যাক্টর হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে তার এ ঘটনা অস্বাভাবিক নয়।' ডা. কিগনডো আরও জানান, বিভিন্ন মিডিয়ায় এই নারীকে উগান্ডার সবচেয়ে বেশি ফার্টাইল নারী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

দু:খে ভরা জীবন:

এ কিশোরী যখন তার শ্বশুরবাড়িতে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল আরও কঠিন পরিবেশ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার স্বামীও এর আগে অনেকগুলো বিয়ে করেছেন। তারও অনেক সন্তান। তাদের ছেড়ে তাদের মায়েরা চলে গেছে। সেগুলোকে আমারই দেখভাল করতে হতো। আর কোনো কাজ পছন্দ না হলে আমাকে চরম নির্যাতনের শিকার হতে হতো।

বিয়ের পরের বছর জমজ শিশুর জন্ম দেন মারিয়ম নাবাতানজি। দুই বছর পর তার কোলজুড়ে আসে একসঙ্গে তিন সন্তান। এর এক বছর সাত মাস পর আরও চার সন্তানের জন্ম দেন তিনি। এভাবে চলতেই থাকে। একবার আমি চেষ্টা করেছি এক ধরণের (ইন্টার আটারিং ডিভাইস) প্রক্রিয়ায় এটা বন্ধ করতে চেয়েছি। কিন্তু সফল হইনি। এজন্য আমি আমি প্রায় একমাস কোমায় ছিলাম। মৃত্যুর কাছাকাছি ছিলাম। মরিয়ম বলেন, আমি এখন নিয়মিত মোলাগো হসপিটালে চেকআপ করি, তাদের পরামর্শে জীবনযাপন করি।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আন্তর্জাতিক বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

তুরস্কে ইউরোপের সর্ববৃহৎ হাসপাতাল, যা আছে তাতে

তুরস্কে ইউরোপের সর্ববৃহৎ হাসপাতাল, যা আছে তাতে

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ইউরোপের সর্ববৃহৎ এবং বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম হাসপাতাল নির্মাণ করেছে তুরস্ক।…

এবার হাসপাতালে হামলার হুমকি!

এবার হাসপাতালে হামলার হুমকি!

মেডিভয়েস ডেস্ক: নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরে মসজিদে হামলার একদিন পর এবার দেশটির হ্যাস্টিংসের…

কঠিন সময় পার করছেন ক্রাইস্টচার্চের চিকিৎসকরা

কঠিন সময় পার করছেন ক্রাইস্টচার্চের চিকিৎসকরা

মেডিভয়েস রিপোর্ট: দুর্যোগ সামাল দেওয়ার দক্ষতা রয়েছে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের চিকিৎসকদের। তবে এসব…

ইরানে যেভাবে কিডনি দিবস পালিত হয়

ইরানে যেভাবে কিডনি দিবস পালিত হয়

বিশ্ব কিডনি দিবস বাংলাদেশে কিভাবে পালিত হলো তা নিয়ে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর দিকে…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর