ঢাকা      মঙ্গলবার ২০, অগাস্ট ২০১৯ - ৫, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বিভাগীয় প্রধান, প্যাথলজি,

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ।


স্মৃতির পাতা থেকে

আমার মেডিকেলে ভর্তি যাত্রা

১৫ ই ডিসেম্বর ১৯৭৯। দুলাভাই একটি চিরকুট নিয়ে আমাদের বাড়ী এলেন বিকেলে। লিখা “সাদেক, তোমার এমবিবিএস ভর্তির তারিখ ১৭ ই ডিসেম্বর। অবশ্যই ১৭ তারিখে আসবে। না আসলে বিরাট ক্ষতি হবে।” লিখেছেন আমার চাচা শাহ আলম তালুকদার। তিনি তখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ২য় বর্ষ শেষের দিকে, ম-১৫ ব্যচ (আমি ছিলাম ম-১৭)। তিনি এখন এই কলেজে শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রধান। তিনি এক রুগীর কাছে এই চিরকুট দিয়েছেন ময়মনসিংহ থেকে।

রুগীর বাড়ী আপার বাড়ির কাছে। তিনি দিয়েছেন দুলাভাইর কাছে। তখন মোবাইল ছিল না। এক মাত্র মাধ্যম চিরকুট। ১০ কিলোমিটার দূর থেকে দুলাভাই এসেছেন চিরকুট নিয়ে। সেদিন বাবা বাড়ী ছিলেন না। চাচারা যুক্তি দেখালেন যেহেতু ক্ষতি হতে পারে সেহেতু আগামীকালই রওনা দেয়া হোক।

খুব সম্ভব তিন হাজার টাকা নিয়ে, প্রয়োজনীয় জামা জুতা নিয়ে ১৬ তারিখ সকাল ৯ টায় বাড়ী থেকে বের হলাম ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে। আমাদের বাড়ী সখিপুর উপজেলার ঢনডনিয়া গ্রামে। টাংগাইল ও ময়মনসিংহ যেতে হলে কালিহাতি গিয়ে কাঠবডি বাসে উঠতে হত। কালিহাতি আমাদের বাড়ী থেকে প্রায় ২২ কিলো মিটার পায়ে হাটার পথ ছিল। এতদুর পথ জুতা পায়ে হাটলে সমস্যা হতে পারে ভেবে জুতা বেগে ভরে স্পঞ্জের সেন্ডেল পরেনিলাম। এক কিলোমিটার যাবার পর ঘোনার চালার মনসুর ভাইর সাথে দেখা। তিনি উলটা দিক থেকে আসছেন। বললেন-

: কই যাও?

: কালিহাতি হয়ে ময়মনসিংহ যাব। কাল এমবিবিএস ভর্তির তারিখ।

: আমি কালিহাতি থেকে আসলাম। আজ হর্তাল। কোন রকম যান বাহন চলেনা। কিছুতেই যেতে পারবে না।

: আমার ভিশন ক্ষতি হবে। ভর্তি আমার হতে হবে। ডাক্তার আমার হতেই হবে।

: একান্ত যদি যেতেই হয় তবে পায়ে হেটে যাও।

: কন কি? পায়ে হেটে ময়মনসিংহ? কিভাবে সম্ভব?

: এখান থেকে ফুলবাড়িয়া ৪০/৫০ কিলো হবে। এইটুকু গিয়ে রাতে ফুলবাড়িয়া বোর্ডিং-এ থাকবে। আগামীকাল গাড়ী চলবে। সকালে গাড়ীতে গিয়ে ময়মনসিংহ পৌছে ভর্তি হবে।

: পা যখন আছে, যেতে পারব।

মনসুর ভাই আমাকে রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্ট ও ডিরেকশন বলে দিলেন। আমি ইতিপুর্বে কুতুবপুরের উত্তরে কখনো যাই নি। এতদুর পাহাড়ি রাস্তা কিভাবে যাব!

আমি ডান দিকে ঘুরে হাটা শুরু করলাম। চার কিলো হাটার পর কুতুবপুর পৌছলাম। দেখি রাস্তার পুব পাশে বিরাট একটা নতুন পুকুর কাটা হয়েছে। এই সুযোগে দেখে নেই। আমি পারে ফেলা নতুন মাটির উপর হেটে হেটে পুকুর দেখছি। ক্যাচ করে ভাংগা কাচে পায়ের তলার এক পাশ কেটে ছিলছিলি রক্ত পড়া শুরু করল। আমি চমকে গেলাম। কেউ সামনে থাকলে হয়ত অজ্ঞান হয়ে যেতাম। কেউ দেখার নেই কাজেই অজ্ঞান হয়ে লাভ নেই। আমি হাত দিয়ে চেপে ধরে রক্ত পরা বন্ধ করলাম। বলেছিলাম পা যখন আছে যেতে পারব।

এখনো পা আছে কিন্তু যাব কিভাবে? মনে পরল তখন বলার সময় ইনশাআল্লাহ বলিনি। আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ে খুরিয়ে খুরিয়ে বাজারের দিকে গেলাম। মুদির দোকান থেকে চার আনা দিয়ে একটা ইন্ডিয়ান বামের কৌটা কিনলাম। পাচ টাকার নোট দিলাম। ভাংতি নাই। সামনে বেঞ্চে কয়েকজন বসে আমার তামাসা দেখছিল। একজনকে আমি চিনে ফেললাম। তিনি আমার এক চাচাত চাচির চাচাতো বোনের দেবর। তিনি আমাকে চিনেন না। আমি বললাম

: চার আনা পয়সা আপনি দিয়ে দিয়েন।

: আপনাকে আমি চিনি না। পয়সা দিব কেন?

: আমি সিদ্দিক ভাইর চাচাত ভাই।

: আচ্ছা, ঠিক আছে।

আমি এক দর্জির দোকানে গিয়ে কিছু ফেলে দেয়া নেকড়া নিয়ে খত স্থানে মলম ভরে ভাল করে পেচিয়ে নিলাম। তারপর দুই পায়ের সেন্ডেলের সাথে পা পেচালাম যাতে পায়ের সাথে সাথে সেন্ডেলও উঠে আসে হাটার সময়।

আকাবাকা হাটার পথ দিয়ে আমি হাটছি। রাস্তায় তেমন লোক নেই। গ্রামের লোকজন থেকে জেনে নিচ্ছি ডিরেকশন ঠিক আছে কিনা। আমি হাটছি তো হাটছি। হাটছি আর হাটছি। কোথা থেকে যেন এনার্জি পাচ্ছি। হাটছি আর হাটছি।

বিকেল পাচটার দিকে ফুলবাড়িয়া শহরে পৌছে গেলাম। এক খাবারের হোটেলে বসে পেটভরে ভাত খেলাম। বাস স্টেন্ডে গিয়ে শুনলাম সুর্যাস্তের পর বাস ছাড়বে। অল্পক্ষনের মধ্যেই সুর্যাস্ত হল। বাস ছাড়ল। বাসে বসে ভাবলাম ময়মনসিংহ পৌছে আচ্ছা করে একটা ঘুম দেব। একঘুমে সকাল হয়ে যাবে। এত হাটা জীবনে হাটি নি।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে কাকার হোস্টেলে পৌছলাম। কাকা আমার হিস্ট্রি শুনে থ মেরে গেলেন।

: হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে ধেয়ে শুয়ে পড়। আমার রুম মেট আজ নেই। আমি তার বিছানায় শুব, তুমি আমার বিছানায় শুবে।

আমি খেয়ে একটু খবর দেখার জন্য টিভির সামনে বসলাম। সাড়ে আটটায় খবরের পর ঘোষণা দিল “এখন বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রচারিত হবে পুর্ন দৈর্ঘ বাংলা ছায়াছবি ‘মা’।” বসে গেলাম সিনেমা দেখতে। রাত একটায় দেখা শেষ করে চুপিসারে কাকার পাশের ছিটে শুয়ে ঘুমিয়ে পরলাম।

পরেরদিন নাস্তা সেরে কলেজে গেলাম। ভর্তি প্রক্রিয়ার প্রথম দিকে মেডিকেল চেকাপ হল। মেডিকেল বোর্ডের যিনি চেয়ারম্যান ছিলেন তাকে আমি পরে চিনেছি। তিনি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক এম এ জলিল স্যার। তিনি পরে অধ্যক্ষ ছিলেন। সেন্টার ফর মেডিকেল এডুকেশন-এর ডাইরেক্টর ছিলেন, পিএসসির সদস্য ছিলেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ । আমার ফেইসবুকের সক্রিয় ফ্রেন্ড। সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক।

যাহোক, আমি এমবিবিএস ভর্তি হলাম। স্বপ্নপুরনের খালে পরলাম। দীর্ঘদিন নদীতে ভেসে বেড়াচ্ছি। সাগরে পরার ইচ্ছা আছে। আল্লাহ ভরসা।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থোপেডিক হাসপাতাল নিটোরের গল্প

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থোপেডিক হাসপাতাল নিটোরের গল্প

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় নিটোর নিয়ে কিছু কথা উঠেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থোপেডিক হাসপাতালটির…

মৃত্যুর আগে কথোপকথন

মৃত্যুর আগে কথোপকথন

হাতির মতন বিশাল মেশিনটি আমার বুকের উপর দিয়ে বার কয়েক চক্কর দিয়ে…

সরকারি হাসপাতালে নানা অনিয়মই যখন নিয়ম!

সরকারি হাসপাতালে নানা অনিয়মই যখন নিয়ম!

একজন কনসালটেন্ট তার মামাতো ভাইকে দেখাতে এসেছে। রোগীর সাথে কথা বলছি, এই…

মানহীন মেডিকেলের প্রাদুর্ভাব বন্ধে মেডিকেলিয় ভূমিকা

মানহীন মেডিকেলের প্রাদুর্ভাব বন্ধে মেডিকেলিয় ভূমিকা

আমরা সবাই জানি এবং প্রতিনিয়ত বলে বেড়াচ্ছি ব্যাঙের ছাতার মতো মানহীন মেডিকেল…

স্বাস্থ্যখাতে নৈরাজ্য সৃষ্টির পাঁয়তারা ‘অশনিসংকেত’

স্বাস্থ্যখাতে নৈরাজ্য সৃষ্টির পাঁয়তারা ‘অশনিসংকেত’

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সৈন্যের সংখ্যা বিশ্বে তৃতীয়! অথচ জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ কোনো…

ভিআইপি রোগী

ভিআইপি রোগী

এমবিবিএস পাস করে কেবল ১৯৮৫ সনের নভেম্বর মাসে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং শুরু করেছি।…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর