ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১২ ঘন্টা আগে
০২ জানুয়ারী, ২০১৯ ১১:০১

ঢাকা শিশু হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. তোফায়েল আহমেদ স্মরণে

ঢাকা শিশু হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. তোফায়েল আহমেদ স্মরণে

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ৬০ ও ৭০’র দশকে কোন শিশু জন্ম নিয়ে বেঁচে থাকার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। সঠিক চিকিৎসার অভাবে অনেক শিশু আতুরঘরেই মারা যেত। আতুরঘর পার হওয়া শিশুদেরও একটি অংশ জীবনের প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে নানা রোগে ভুগে মারা যেত। সেই সংকটাপন্ন সময়ে অকালে শিশু মৃত্যুর ঘঠনাটি ভীষণভাবে নাড়া দেয় একজন দেশপ্রেমিক চিকিৎসকের। সেসময়ে তার হাত ধরেই জন্ম নেয় ঢাকা শিশু হাসপাতাল নামক শিশুদের জন্য বিশেষায়িত একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালের।

আজ  (২ জানুয়ারি) সেই গুণী মানুষটির ৯০তম জন্মদিন। একসময় স্বপ্ন দেখতেন শিশুদের জন্য বিশেষায়িত এক পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও কঠোর শ্রমের বিনিময়ে জীবদ্দসাতেই এবং তার হাতেই প্রতিষ্ঠা লাভ করে ঢাকা শিশু হাসপাতাল। তিনি অধ্যাপক ডা. তোফায়েল আহমেদ। ১৯৯৭ সালে এ বরেণ্য চিকিৎসক মারা যান।

বিজ্ঞজনরা বলেন, যে দেশে গুণীর কদর নেই, সেখানে গুণীর জন্ম হয় না। কথাগুলো কিন্তু মিথ্যা নয়। তোফায়েলের অবদান ইতিহাস থেকেও হয়তো হারিয়ে যাবে। তার সঙ্গে কাজ করা হাতেগোনা সংখ্যক চিকিৎসকরা মারা গেলেই তিনিও হারিয়ে যাবেন পৃথিবীর অতল গহব্বরে।  কেননা, ডা. তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে আমাদের সমাজে কারও কোন গবেষণা বা গবেষণার উদ্যোগ নেই।

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি তার প্রেরণায় উজ্জীবিত হতে হয়, তবে অবশ্যই কালবিলম্ব না করে ডা. তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে গবেষণা শুরু করতে হবে। বিশেষ করে এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, চিকিৎসকদের সংগঠন বিএমএ উদ্যোগ নিতে হবে।

ধানমন্ডিতে ৭০’র দশকের শুরুতে তাঁবু টানিয়ে কয়েকজন সমমনা চিকিৎসককে নিয়ে প্রথম শিশু হাসপাতালের যাত্রা শুরু এই স্বপ্নবাজ চিকিৎসকের হাত ধরে। তার এ মহৎ উদ্যোগকে সর্বাত্মক সহায়তা দেয় তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকার। শেরেবাংলা নগরে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল স্থাপনের অনুমতি দেয় সরকার। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নেই। এতে কিন্তু দমে যাননি। প্রস্তাবিত হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব ডা. তোফায়েল। ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করে অর্থ সংগ্রহ শুরু করেন। দুটি লটারির মাধ্যমে আসে বেশ কিছু টাকা। এ টাকার সঙ্গে মানুষের অনুদান ও সরকারি সহায়তায় ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠা হয় পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল।

কেবল শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেই থেমে থাকেননি ডা. তোফায়েল আহমদ, তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৮৩ সালে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট হিসেবেও প্রতিষ্ঠা লাভ করে। দেশের নামকরা শিশু বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানটি।

শিশু চিকিৎসকদের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করে এ প্রতিষ্ঠান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তৎকালীন পিজি হাসপাতাল এটিকে ইনস্টিটিউট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।  ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক বিখ্যাত হাসপাতালের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণার কাজ শুরু করে এ ইনস্টিটিউট।  ৪০ বছর আগে যাত্রা করা স্বায়ত্তশাসিত এ হাসপাতাল শিশু চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ভালো চিকিৎসা পাওয়ায় প্রতিদিন ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে ধনী-গরিব নির্বিশেষে অসংখ্য রোগী ভিড় জমায় এখানে। প্রতিদিন ৮০০ থেকে এক হাজার শিশু চিকিৎসা নিতে আসে। তাদের মধ্যে ১০০ থেকে ১৫০ রোগী ভর্তি করা সম্ভব হয়।

নবজাতক থেকে শুরু করে ১৮ বছর পর্যন্ত শিশুর সব ধরণের রোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকে ঢাকা শিশু হাসপাতাল। ৩০০ শয্যার এ হাসপাতালটি বর্তমানে ৬৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। শয্যাগুলো অর্ধেকের বেশি রোগী বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ পায়। তাদের ওষুধপত্র, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, খাবারও বিনামূল্যে দেওয়া হয়।

ডা. তোফায়েল আহমদ বিশ্বাস করতেন, দেশের তৃণমূল পর্যায়ের মা ও শিশুর উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা না হলে উন্নত জাতি গঠন সম্ভব নয়। তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবার প্রতিও তার সমান আগ্রহ ছিল। যে কারণে তিনি পল্লী শিশু ফাউন্ডেশন গড়ে তুলেছিলেন। যার মাধ্যমে এখনও মাঠ পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত মানুষকে সেবা দেওয়া হচ্ছে।

অধ্যাপক ডা. তোফায়েল আহমেদ দেশের শিশু ও মা’দের স্বাস্থ্য নিয়ে আজীবন কাজ করলেও তাকে কিন্তু মনে রাখতে পারিনি আমরা। দূভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে কোনো ধরনের সম্মাননাও দিতে পারেনি দেশ। শুধুমাত্র ঢাকা শিশু হাসপাতালের সামনে একটি ম্যুরাল স্থাপন করেই দায় সেরেছে রাষ্ট্র। এতো বড় দেশপ্রেমিক চিকিৎসককে নিয়ে নেই কোনো গবেষণা। এমনকি নেই কোনো বইপত্রও।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত