ঢাকা      সোমবার ১৭, জুন ২০১৯ - ৩, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ

একুশে পদক প্রাপ্ত চিকিৎসক 

 


সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা: সময়ের দাবী

বিংশ শতাব্দীর চরম উৎকর্ষের যুগে আজও পৃথিবীর ১ বিলিয়ন লোক কোনোদিন চিকিৎসকের দেখা পাননি বা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। বিশ্বের লক্ষ লক্ষ লোকের ন্যূনতম চিকিৎসা গ্রহণের আর্থিক সামর্থ্য নাই, এমনকি সুচিকিৎসা পেতে অনেককে সম্পদ বিক্রি কিংবা লোন গ্রহণ করতে হয়।  বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার তথ্য অনুয়ায়ী, চিকিত্সা ব্যয় মেটাতে দেশে প্রতিবছর ৩.৪ শতাংশ মানুষ দরিদ্র হচ্ছে, ১৫ শতাংশ পরিবার অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে।  অথচ গরীব-ধনী নির্বিশেষে সবার মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতভাবে পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং সেই সেবা প্রাপ্তির জন্য যেন কারও আর্থিক দৈন্যতার মধ্য পড়তে না হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব ব্যাংকের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের মাথাপিছু আয় দৈনিক ১.৯০ ও ৩.১০ ডলার, স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে তাদের যথাক্রমে ৪.৫১% এবং ৪.০৮% চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে।  অনেকেই আর্থিক বিপর্যয়ে পড়ছে অতিরিক্ত স্বাস্থ্যব্যয়ে।  ২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্ট’-এর তথ্যমতে, স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে জনপ্রতি ১০০ টাকার ৬৭ টাকাই মানুষের পকেট থেকে ব্যয় হচ্ছে, ২০১২ সালে যা ছিলো ৬৩ টাকা।  সরকার জনপ্রতি ২৩ টাকা, দাতা সংস্থাগুলো ৭ টাকা ও অন্যান্য সংস্থা ৩ টাকা ব্যয় করছে।

আমাদের দেশে জনসংখ্যা বেশি, তাই রোগীও বেশি।  গ্রামেগঞ্জে, উপজেলা, জেলা এবং  বিভাগসমূহেও প্রয়োজনের তুলনায় ডাক্তার, চিকিৎসার সরঞ্জাম, ঔষধপত্র, জনবল এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ সুযোগ সুবিধা সীমিত।  প্রতি ২০৩৯ জনের জন্য মাত্র একজন রেজিস্টার্ড ডাক্তার।  ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা মৌলিক অধিকার নয়, বরং একটি সুযোগ, যা কেউ পাচ্ছে, কেউ পাচ্ছে না।  এই অসমতা এতটাই তীব্র যে, তা দেশের অগ্রগতির অন্তরায়।

রোগীর অভিযোগ ও বাস্তবতা: যদি জানতে চাওয়া হয়, কেমন চলছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ডাক্তার-রোগীর সম্পর্কই বা কেমন? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর হবে নেতিবাচক।  উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত, উচ্চশিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত, সবার মধ্যেই ডাক্তারদের সম্পর্কে বিরূপ বা নেতিবাচক ধারনাই বিরাজ করে বেশি।  রোগী এবং জনগণের বিরাট অংশই ডাক্তারদের প্রতি ক্ষুব্ধ ও বীতশ্রদ্ধ। অনেকেরই অভিযোগ, ডাক্তাররা রোগীকে ভালোভাবে সময় দিয়ে দেখেন না, ভালো করে কথা বলেন না, মনোযোগ দিয়ে শোনেন না, যত্নসহকারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন না, কথা না শুনেই ওষুধ লিখে দেয়।  রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে বুঝিয়ে বলেন না, দুর্ব্যবহার করেন, একগাদা দামীদামী ঔষধ লেখেন, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বলেন।  হাসপাতালের বর্হিবিভাগের রোগীদের অবস্থা আরও করুণ।  ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করেও চিকিৎসা পেতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়।  হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের অভিযোগ, অনেকদিন ধরে ভর্তি আছি, কিন্তু ডাক্তার-নার্স ঠিকমত আসে না, ভালো করে দেখে না, ঔষধপত্র ঠিকমত দেয় না, বিছানাপত্র ঠিক নাই, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নাই, খাবার মান ভালো না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব।  এমনকি যে অধ্যাপকের তত্ত্বাবধায়নে ভর্তি তারও দেখা মেলে না, জুনিয়র চিকিৎসকরাই চিকিৎসা করেন।  ডাক্তারদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তাঁদের উচ্চ ফী, বিভিন্ন ল্যাবরেটরি বা ক্লিনিক থেকে কমিশন খাওয়া, বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধির কাছ থেকে উপঢৌকনের বিনিময়ে ঔষধ লেখা ইত্যাদি।  অভিযোগগুলো অসত্য নয়, কিন্তু ঢালাওভাবে সব ডাক্তারদের ক্ষেত্রে সত্যও নয়। 

বাস্তবায়নের উপায়: আমাদের দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অস্বস্তিকর এবং বিশৃংখল অবস্থা চলছে, জনগনের মাঝেও ভয়-ভীতি-ক্ষোভ আর চিকিৎসক ও চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা বেড়েই চলেছে।  এগুলোর কারণ উদ্ঘাটন ও সমাধানকল্পে পর্যালোচনা প্রয়োজন।  তবে একক প্রচেষ্টা বা কোনো গোষ্ঠীর পক্ষে এর সমাধান অনেকটাই অসম্ভব।  স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার এই ভগ্নদশা থেকে উত্তরণের জন্য রোগী, ডাক্তার, প্রশাসন, চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি মিডিয়ার সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  সকলের সমন্বয়ে বাস্তব ও কার্যকারী পদক্ষেপ গ্রহণ এবং নিজ নিজ দায়িত্ব সততার সাথে পালন করলে “সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা: সবার জন্য, সর্বত্র ” বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়।

ডাক্তারের করণীয়: রোগীর আস্থা অর্জনই ডাক্তারদের জন্য সবচেয়ে জরুরী।  দক্ষতা ও পেশাগত আচরণে রোগীর চাহিদাপূরণে ব্যর্থ হলে অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটতেই থাকবে।  রোগীদের সংশয় এবং অভিযোগগুলো দূর করার দায়িত্ব ডাক্তারদেরই।  মনে রাখতে হবে, ভালো ডাক্তার হওয়ার পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়া জরুরি।  রোগীদের কথা ধৈর্য সহকারে শোনা, তাকে ভালোভাবে দেখা, অসুখের ধরন এবং চিকিৎসা সম্পর্কে জানানো, অনিরাময়যোগ্য বা জটিল রোগ সম্পর্কে রোগী বা তার স্বজনকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে।  রোগীর আর্থিক সঙ্গতি বিবেচনাপূর্বক তার সামর্থ্যের বাইরে অতিরিক্ত বা দামী দামী পরীক্ষা-নীরিক্ষা না দেওয়া, গাদা-গাদা ঔষধ কিংবা অযথা বেশি দামী ঔষধ না লেখা উচিত।  ডাক্তারদের উপলব্ধি করতে হবে, কথায় কথায় তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে এমনকি শত উসকানির মুখেও ধর্মঘট করা অনুচিত। নিরীহ মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের নামে ধর্মঘটের মত ধ্বংসাত্মক কাজ করলে ডাক্তারদেরকে মানুষ শ্রদ্ধা করবে কেন? দু’একজন রোগী বা তার আত্মীয়স্বজনের অপকর্মের জন্য অনান্য রোগীকে অসহায় অবস্থায় ফেলে ধর্মঘট অযৌক্তিক। মনে রাখতে হবে, চিকিৎসাসেবা অন্যান্য পেশার মতো নয়, এর সঙ্গে জীবন-মৃত্যু জড়িত।

রোগীদের করণীয়: রোগী বা তার আত্মীয়স্বজনের মনে রাখা দরকার, অনেক জটিল রোগ যেমন স্ট্রোক, হৃদরোগ, কিডনি বা লিভার নষ্ট হলে, ব্লাড ক্যান্সার বা অনেক ক্যান্সার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিরাময়যোগ্য নয়।  আই.সি.ইউ তে মুমূর্ষু রোগীদের ভর্তি করা হয় এবং সেখানে মৃত্যুর হার বেশি।  শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে চিকিৎসা অসম্ভব।  মৃত্যু অমোঘ, চিরন্তন, চিকিৎসক শুধু রোগ নিরাময় আর রোগীকে রোগের উপশম দেবার চেষ্টা করেন।  রোগীর মৃত্যু হলেই তার আত্মীয়স্বজন উত্তেজিত হয়ে ডাক্তার-নার্সদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ, শারীরিক নির্যাতন বা হাসপাতালে হামলা চালিয়ে ভাংচুর এবং প্রচুর ক্ষতিসাধন করেন।  অভিযোগ প্রমাণ হবার আগেই এসব অন্যায়, দায়িত্বহীন এবং আবেগতাড়িত কর্মকাণ্ড পরবর্তীতে যেকোনো রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে ডাক্তারদের দায়িত্ব নিতে নিরুৎসাহিত করে।  কোনো অভিযোগ যথাযথ কতৃপক্ষ যেমন বিএমডিসি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ে পেশ করে প্রয়োজনে আইনি সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।  একতরফা শুধু ডাক্তারকে দোষ দেয়াটাও অযৌক্তিক।  হাসপাতালে ঔষধ নাই, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নাই, বিছানাপত্র ভালো নাই, খাওয়া দাওয়ার মান নিম্নমুখী, এগুলোর দায়-দায়িত্ব সম্পূর্ণ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।  অথচ এসবের জন্যও দোষ দেয়া হয় ডাক্তারদেরকেই।  ফলে ভুল বোঝাবুঝি আরও বাড়ে।  

সরকারের কর্তব্য: স্বাস্থ্যব্যবস্থার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তায় সরকার তথা প্রশাসনের উপর।  সেজন্য বাস্তব পরিকল্পনা, বাস্তবায়নের যথাযথ ব্যবস্থা এবং সমন্বয়ের কার্যকারী পদক্ষেপ নিতে হবে।  

১।  মানসম্মত মেডিকেল কলেজ এবং দক্ষ ডাক্তার : অদক্ষ চিকিৎসক দিয়ে ভালো সেবা আশা করা বাতুলতা।  মানসম্মত মেডিকেল কলেজ দক্ষ ডাক্তার তৈরীর পূর্বশর্ত।  যত্রতত্র মেডিকেল কলেজের ছড়াছড়ি, মানসম্মত মেডিকেল কলেজের অভাব, শিক্ষক সংকট, দক্ষ প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অপ্রতুলতা, নূন্যতম সংখ্যক শিক্ষকের পদ না থাকা বা শূন্য থাকা ও সহযোগী লোকবলের অভাব, কিছু কিছু প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজে মেধার চেয়ে ব্যবসায়ী মনোবৃত্তিকেই প্রাধান্য দেওয়া, মেডিকেল কলেজ স্থাপনের শর্ত পূরণ না করেই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা, হাসপাতালে পর্যাপ্ত রোগীর অভাবে হাতে-কলমে বাস্তব ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন ব্যাহত, সবকিছুই যোগ্য চিকিৎসক তৈরির অন্তরায়।  দলীয় অথবা রাজনৈতিক প্রভাবও অনেকাংশেই এর জন্য দায়ী।  তাই প্রশাসনকে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় না নেমে বরং ভালো চিকিৎসক তৈরির অন্তরায়গুলো দূর করার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

২।  চিকিৎসা ব্যয় কমানো: অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধি, বেসরকারিখাতে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, ওষুধের আকাশচুম্বী দাম, রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার উচ্চ খরচ, বেড চার্জ, এডমিশন ফি, মাত্রাতিরিক্ত অপারেশন চার্জ, সিসিউ, আইসিইউ এবং ডায়ালাইসিস ফি, দালালদের দৌরাত্ম্য, চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্তরের পেশাজীবীদের অনৈতিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কারণে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে।  তাই অপারেশন এবং আই সি ইউ চার্জ একটি সহনীয় মাত্রায় রাখা, অতি প্রয়োজনীয় ওষুধগুলোর দাম সাধারণ জনগণের নাগালে আনা, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা-নীরিক্ষার খরচ কমানো উচিত।  চিকিৎসা ব্যয়কে সহনীয় পর্যায়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে এবং এর জন্য ডাক্তার, প্রাইভেট হাসপাতাল এবং ক্লিনিকের মালিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিসহ চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক পেশাজীবীর সদিচ্ছা জরুরী। বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অহেতুক ব্যয় বাড়িয়ে যারা সাধারণ জনগণের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে, তাদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে চিকিৎসাব্যবস্থাকে আরও রোগীবান্ধব করা যায়।  বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার খরচ সাধারণের নাগালের মধ্যে নির্ধারণ, বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে ৩০% ফ্রী বেডের যে নিয়ম আছে, তা কঠোরভাবে মনিটরিংয়ের মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যয়ে ব্যাপক পরিবর্তন করা সম্ভব। আয় অনুসারে উচ্চবিত্তে, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চত করতে হবে। গরীব রোগীদের সর্বাবস্থায় ফ্রি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিৎ।

৩।  চিকিৎসক এবং চিকিৎসা সংশ্লিষ্ঠদের কর্মস্থলের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: গ্রামে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য ডাক্তারদের থাকা আবশ্যক। তাই গ্রামে ডাক্তারদের আবাসন, যাতায়াত ও অনান্য সুযোগ সুবিধা, নিরাপত্তা এবং নির্দিষ্ট সময় গ্রামে থাকার পর নিজের উচ্চশিক্ষার পরিবেশে ফিরে আসার নিশ্চয়তা থাকলে ডাক্তার অবশ্যই গ্রামে যেতে আগ্রহী হবেন।  তাছাড়া যাদের পোস্টিং গ্রামে হবে তাদের অতিরিক্ত প্রণোদনা প্রদান করে আগ্রহী করা যেতে পারে।  চিকিৎসক এবং চিকিৎসাসেবা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মীদের নিরাপত্তা ও নিরাপদ কর্মস্থলের ব্যবস্থা এবং যথাযথ আইন প্রণয়ন ও তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা: চিকিৎসাব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নকল্পে প্রিন্ট মিডিয়া, অনলাইন ও অন্যান্য গণমাধ্যম কর্মীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  চিকিৎসাসেবার অন্যতম উপাদান জনসচেতনতা তৈরী, যেটা গণমাধ্যমের সহযোগিতা ছাড়া বাস্তবায়ন অসম্ভব।  বর্তমান প্রেক্ষাপটে চিকিৎসক-সাংবাদিক সম্পর্কের বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।  গণমাধ্যমের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, চিকিৎসাক্ষেত্রের সাফল্যগুলো উপেক্ষা করে শুধু গুটিকয়েক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ফলাও করে প্রচার করার চর্চা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার।  আমাদের দেশেই অনেক জটিল রোগের চিকিৎসাসহ শতশত অপারেশন সফলভাবে করা হচ্ছে।  কিডনি, লিভার এবং বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট, হৃদরোগের বাইপাস, রিং পরানো, নিউরোসার্জারি ইত্যাদি আধুনিক চিকিৎসা উন্নত দেশের মতোই হচ্ছে।  এসব বিষয়েও জনগনকে অবহিত করা দরকার।  আমাদের দেশেও আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসক আছেন, চিকিৎসায় সফলতাও আছে। কিন্তু সর্বদা যদি দোষ-ত্রুটিগুলো প্রচার করা হয়, ভালো কাজের স্বীকৃতি না দেয়া হয়, তবে অনেকেই উৎসাহ হারিয়ে ভয়-ভীতির মধ্যে কাজ চালাতে বাধ্য হবেন।  কর্মক্ষেত্রে ডাক্তাররা যে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন সেগুলো সঠিকভাবে প্রচার করা দরকার।

কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেই ভুল চিকিৎসা বলে প্রচার করে জনগণের আস্থা নষ্ট করা অনুচিত।  এতে জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চার হবে।  অনেক জটিল রোগ যেমন স্ট্রোক, হৃদরোগ, কিডনি বা লিভার নষ্ট, ব্লাড ক্যান্সার বা অন্যান্য অনেক ক্যান্সার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিরাময়যোগ্য নয়।  মুমূর্ষু রোগীদের আ.ইসি.ইউ তে ভর্তি করা হয়, সেখানেও মৃত্যুর হার বেশি। মৃত্যুপথযাত্রী রোগীকে কেউই বাঁচাতে পারবেনা। তাই স্বাভাবিক বা রোগজনিত মৃত্যু হলেই ভুল চিকিৎসা হলো, এভাবে প্রচার করাটা অন্যায়, অযৌক্তিক।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে তৎক্ষনাৎ খবর প্রকাশ করা হয়, জনগন সেটাই ঘটেছে বলে বিশ্বাস করে এবং চিকিৎসকের প্রতি অনাস্থা আরও বেড়ে যায়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিলেনা।  কিন্তু তা আর পুনরায় প্রকাশ করা হয়না কিংবা স্বল্প পরিসরে প্রকাশিত হলেও তা জনগণের মনে সৃষ্ট পূর্বের ভ্রান্ত ধারণার পরিবর্তন করতে পারেনা।  

মনে রাখা দরকার সমগ্র চিকিৎসা ব্যবস্থায় একজন চিকিৎসক উপাদান মাত্র, কখনোই মূল নিয়ামক বা নিয়ন্ত্রক নন। এর সাথে যুক্ত থাকেন নার্স, টেকনোলজিস্ট, ওয়ার্ডবয়, সুইপার, কর্তৃপক্ষ। অন্যদের ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য ডাক্তারদের দায়ী করে সংবাদ প্রকাশ করলে ডাক্তার-রোগীর ভুল বুঝাবুঝি ও দূরত্ব বাড়ে।  তাই আপনাদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, ডাক্তার এবং রোগীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়, এমন নেতিবাচক খবর প্রচারে সতর্ক থাকা উচিৎ।  সমাজের অন্য মানুষের মতো ডাক্তারদেরও ভুলত্রুটি হতে পারে, তা সারা বিশ্বেই হয়।  কিন্তু নেতিবাচক খবর বেশি প্রচার করলে ডাক্তারদের আন্তরিকতার খবরটুকু অপ্রকাশিত থেকে যায়।  ভুল বুঝাবুঝি আরও বাড়ে, যা কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়। এসব সংবাদে জনগণ শুধু ডাক্তারের উপর আস্থা হারায় না, হারায় মূলত রাষ্ট্র প্রদত্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর, যার খেসারত দিতে হয় আপনার, আমার, আমাদের সকলের এবং সরকারের।  তাই এমন খবর প্রচারে মুখরোচক জনপ্রিয়তার চেয়ে দেশ ও দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি সংবাদকর্মীদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া উচিত।  চিকিৎসা সংক্রান্ত রিপোর্টিং সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।  এভাবে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল পেশার সদস্য হিসেবে আপনিও দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ণে ভূমিকা রাখতে পারেন।

সুচিকিৎসা যেমন সকলের মৌলিক অধিকার, তেমনি তা সুনিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্বশীল হওয়া একান্ত জরুরি।  সেজন্য এখনই সময় সম্মিলিত পদক্ষেপের, প্রয়োজন সঠিক বাস্তবায়ন।  নিম্নোক্ত কিছু প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে।

  • গরীব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্রি চিকিৎসা, উচ্চবিত্তের জন্য স্বাস্থ্যবীমার ব্যবস্থা।  দেশের সকল নাগরিকের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী হেল্থ কার্ড ও স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনা উচিত।
  •  সরকারী ও প্রাইভেট মেডিকেল কলেজগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ ও ভালো ডাক্তার তৈরির যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া এবং অন্তরায়গুলো দূর করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
  • চিকিৎসা ব্যয় কমানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ওষুধপত্র, পরীক্ষার খরচ, অপারেশন চার্জ, আইসিইউ, সিসিইউসহ প্রাইভেট বা কর্পোরেট হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার অতিমুনাফা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা।
  • বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে যৌক্তিক বরাদ্দ বাড়ানো এবং বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহ প্রদান।
  • প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তাসহ গ্রাম পর্যায়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ।
  • প্রতিকার থেকে প্রতিরোধ উত্তম।  তাই অসংক্রামক রোগ যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, ক্যান্সার প্রতিরোধে জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে।
  • রোগীবান্ধব পরিবেশ, চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক বাস্তবায়নে গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সম্পৃক্তকরণ।
  • শুধু ডাক্তার নয়, চিকিৎসাসেবা সংশ্লিষ্ট সকল কর্মীদের ধর্মঘটের মত ধ্বংসাত্মক কাজ পরিহার করতে হবে।
  • হাসপাতালের গন্ডিতে যেকোনো ধরণের রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকা উচিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য বাজেট '১৯: আমার ভাবনা

স্বাস্থ্য বাজেট '১৯: আমার ভাবনা

বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নে সরকারের ভুমিকা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। দেশের দরিদ্র…

‘দুর্বল পরিকল্পনার কারণে স্বাস্থ্যে সর্বনিম্ন বরাদ্দ’ 

‘দুর্বল পরিকল্পনার কারণে স্বাস্থ্যে সর্বনিম্ন বরাদ্দ’ 

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৫…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর