ঢাকা      শনিবার ২৩, মার্চ ২০১৯ - ৯, চৈত্র, ১৪২৫ - হিজরী

স্বাস্থ্য খাতে বিস্ময়কর সাফল্যেও অপুষ্টিতে লক্ষাধিক শিশু

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাংলাদেশ বর্তমানে (১৮ বছরের নিচে) শিশুর সংখ্যা প্রায় ছয় কোটি ৬০ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ। এ বিপুলসংখ্যক শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মননশীল বিকাশে সর্বোচ্চ যত্ন নেওয়া আমাদের দায়িত্ব হলেও শিশুরা এগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিগত বছরগুলোতে স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছে। অনেক মধ্যম আয়ের দেশের তুলনায় এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের শিশুকেন্দ্রিক বাজেট প্রায় ৬৫ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা, যা নির্ধারিত ১৫টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শিশুদের কল্যাণে ব্যয় করা হবে মর্মে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জনের পরও আমাদের দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। এর মধ্যে শিশুদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ শিশুরা অনুপুষ্টিকনা; বিশেষ করে ভিটামিন-এ, আয়োডিন ও জিংকের অভাবে সবচেয়ে বেশি ভুগে থাকে।

সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রায় ৩৬ শতাংশ শিশুর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম। এর মধ্যে সিলেট বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজনের শিশুর সংখ্যা বেশি, যা প্রায় ৪৫ শতাংশ। পাঁচ বছরের ও কমবয়সী প্রায় শতকরা ৪১ ভাগ শিশু খর্বকায় (small), সিলেট বিভাগে খর্বকায় শিশুর হার সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৪৯ শতাংশ। খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে এ হার সবচেয়ে কম, যা প্রায় শতকরা ৩৪ শতাংশ। পাঁচ বছরের কম বয়সী শতকরা ১৬ ভাগেরও বেশি শিশু কৃশকায়(
lean)।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণ অথবা ঘন ঘন সংক্রমণ ও প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান যেমন- আমিষ, শর্করা, তেল, ভিটামিন ও খনিজ লবণ ইত্যাদি উপাদানের ঘাটতির কারণে পুষ্টিহীনতা দেখা দেয়। শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগলে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা বয়স অনুপাতে খর্বাকৃত, কৃশকায় ও কম ওজন নিয়ে বেড়ে ওঠে। ফলে এসব শিশু রোগা, পাতলা, দুর্বল খিটখিটে মেজাজের হয়। ফলে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে দ্রুত শিশু রোগাক্রান্ত হয়। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতা কমে যায়।

জানা যায়, মেয়ে শিশুদের ঠিকমতো খাদ্য, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান না করলে তারা খর্বাকৃত হয়ে বাড়তে থাকে। পরে খর্বাকৃত অপুষ্ট কিশোরী হিসেবে গড়ে ওঠে। বিয়ের পর সে একজন কম ওজনের মহিলা হিসেবে গর্ভধারণ করে, ফলে কম ওজনের শিশু জন্ম হয়। সেই কম ওজনের মেয়ে শিশু সঠিক খাদ্য, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা না পেলে সেও অপুষ্টিতে ভুগতে থাকে এবং বিয়ের পর অপুষ্ট শিশু জ দেয়। এভাবে মেয়েদের ভেতর অপুষ্টির চক্র ঘুরতেই থাকে।

এছাড়াও আমাদের সমাজে শিশুকে খাওয়ানোর ব্যাপারে নানা রকম কুসংস্কার বা ভুল ধারণা রয়েছে। যেমন শিশুর অসুখ হলে তার স্বাভাবিক খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া, ডায়রিয়া হলে মায়ের দুধ খাচ্ছে এমন শিশুর মাকে শাকসবজি খেতে না দেওয়া। বাড়তি খাবার খেলে শিশুর পাতলা পায়খানা হয় অথবা শুধু দামি খাবারে বেশি পুষ্টি থাকে ইত্যাদি। এসব কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

সরকার কর্তৃক গৃহীত সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো শিশুর উন্নয়ন ও শিশু অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে দেশের সব শিশুর নিরাপত্তা বিধান, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, পুষ্টি ও শিক্ষার ব্যবস্থা করা। এছাড়া জাতীয় সমাজকল্যাণ নীতিমালা-২০০৫ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩-এর অন্যতম মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও ঝুঁকির মুখে থাকা পথশিশু, এতিম ও প্রতিবন্ধী শিশুদের সুবিধা প্রদান ও তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন করা। এছাড়া শিশু আইন ২০১৩-এর মাধ্যমে সব শিশুর সুরক্ষার পাশাপশি সুবিধাবঞ্চিত ও ঝুঁকির মুখে থাকা শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক সেবা এবং বিকল্প যত্নের ব্যবস্থা প্রদানসহ শিশু কল্যাণ বোর্ড, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন ও শিশু আদালত প্রতিষ্ঠা অন্যতম।

এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদফতর তৃণমূল পর্যায়ে পুষ্টি সেবা কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এইচপিএনএসডিপির আওতায় ২০১৭-২০২২ মেয়াদে ন্যাশনাল নিউট্রিশন সার্ভিসেস শীর্ষক একটি অপারেশনাল প্ল্যান বাস্তবায়ন করছে। এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো অপুষ্টিজনিত ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মাঝে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে পুষ্টি সেবা পৌঁছে দেওয়া। এ কার্যক্রমের আরেকটি প্রধান লক্ষ্য হলো অপুষ্টি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস করা। 

তৃণমূল পর্যায় শিশুর অপুষ্টি রোধ করার জন্য জেলা সদর ও উপজেলা হাসপাতালে ৩৯৫টি ইনটেগ্রিটেড ম্যানজমেন্ট অব চাইল্ডহুড ইলনেস প্রোগ্রাম বা ইআইএমসিআই এবং পুষ্টি কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে শিশুর খাবার ও পুষ্টি বিষয়ক নানা রকম প্রচার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২২ সালের মধ্যে পাঁচ বছরের কমবয়সী স্বল্প ওজনের ও খর্বাকৃত শিশুর হার ২৫ শতাংশ এবং কৃশকায় শিশুর হার ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। 

জাতিসংঘের উদ্যোগে সব মানুষের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে একটি অধিকতর টেকসই ও সুন্দর বিশ্ব গড়ার প্রত্যয় নিয়ে সার্বজনীনভাবে একগুচ্ছ সমন্বিত কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। এতে ১৭টি টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট রয়েছে। যার ২ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে ‘ক্ষুধামুক্তি’ ক্ষুধা দূর করা এবং সব মানুষের জন্য, বিশেষ করে দারিদ্র্য ও ক্ষুধার ঝুঁকিতে থাকা মানুষ এবং শিশুদের জন্য সারা বছর নিরাপদ, পুষ্টিকর এবং পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করা।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সরকারি মেডিকেলে চান্স না পাওয়ায় অনেক অপমান সইতে হয়েছে

সরকারি মেডিকেলে চান্স না পাওয়ায় অনেক অপমান সইতে হয়েছে

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজের ২০১৮ সালের নভেম্বরের এমবিবিএস ফাইনাল প্রফে…

যুক্তরাষ্ট্রে রেসিডেন্সি পেলেন অর্ধ শতাধিক বাংলাদেশি চিকিৎসক

যুক্তরাষ্ট্রে রেসিডেন্সি পেলেন অর্ধ শতাধিক বাংলাদেশি চিকিৎসক

মেডিভয়েস রিপোর্ট: চলতি বছর অর্ধ শতাধিক বাংলাদেশি চিকিৎসক যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কসহ একাধিক অঙ্গরাজ্যে…

ডা. রাজনকে হত্যার অভিযোগ স্বজনদের

ডা. রাজনকে হত্যার অভিযোগ স্বজনদের

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি…

ডাক্তার হওয়া হলো না আবরারের!

ডাক্তার হওয়া হলো না আবরারের!

মেডিভয়েস রিপোর্ট: রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে আলোচিত সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আবরারের স্বপ্ন…

বিএসএমএমইউর সহকারী অধ্যাপক ডা. রাজন কর্মকার আর নেই

বিএসএমএমইউর সহকারী অধ্যাপক ডা. রাজন কর্মকার আর নেই

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ওরাল এন্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের…

চিকিৎসকদের পদোন্নতি দেওয়া হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

চিকিৎসকদের পদোন্নতি দেওয়া হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

মেডিভয়েস রিপোর্ট: চিকিৎসকদের পদোন্নতি দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক।…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর