ঢাকা      বুধবার ১৮, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৩, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


বিড়াল ভয় এইলোরো ফোভিয়া

মি. রহমান এসেছেন তার সদ্য বিবাহিত পুত্রবধূ কে নিয়ে। সমস্যাটা বেশ জটিল আকার ধারন করেছে। বিয়ের দিন পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক ছিলো। বাসর রাতের পরদিন সকাল থেকেই ঘটনার সুত্রপাত। সকালে সবাই বসেছেন নাস্তার টেবিলে, অমনি নববধূ "ওমাগো বিড়াল" বলে চিৎকার দিয়ে দিলেন এক লাফ। ডাইনিং টেবিল উলটে গিয়ে গরম তরকারি শাশুড়ির আর জ্যা'দের গায়ে পড়ে লংকা কান্ড।  তারপর থেকে নববধূর সাথে শাশুড়ি আর জ্যা'য়েদের মুখ চাওয়াচাওয়ি কথাবার্তা সব বন্ধ। আজ সাত দিনে গড়ালো সব।

ননদ সামিয়া আর তার বর হাবিব অত্যন্ত নিতান্ত অমায়িক, ভালো। বিষয়টি তারা বেশ হালকা ভাবেই নিয়েছেন এবং সবাইকে বুঝিয়ে এক টেবিলে বসানোর যথেষ্ট চেষ্টা তদবির করেছেন। হাবিব পেশায় ইঞ্জিনিয়ার তিনিই মোটামুটি এ বাড়ির দ্বিতীয় অভিভাবক। বেজায় রসিক মানুষ। তিনি প্রথমেই এক হাত নিলেন তার স্নেহের শ্যালক  কে। শ্যালক তুমিই যত নষ্টার মুল। কথায় আছে, "বাসর রাতে  বধিবে বিড়াল"। নিশ্চয়ই তুমি নববধূ কে বাগে আনতে রাতে বিড়াল মারা জাতীয় কিছু করেছো। যেটা ছিলো নৃশংস। তাই ভয়ে বেচারির এই অবস্থা এখন । বিড়াল দেখলেই বা বিড়ালের ডাক শুনলেই বেচারি "ওমাগো বিড়াল" বলেই মূর্ছা যায়।

বাড়ির একমাত্র দুলা ভাইয়ের এমন কথাতে রস থাকলেও অযৌক্তিক নয়। কিন্তু ননদ শাশুড়ি কেউই সেটা পাত্তা দিচ্ছেন না। তাদের কথা, "এ মেয়ে এ সংসারে থাকতে চায়না। তাই প্রথম দিনেই সবার হাত পা পুড়িয়ে এখন দোষ দিচ্ছে তাদের পোষা বিড়ালের উপর। তার নাকি বিড়ালভীতি আছে। এ বাড়িতে হয় বিড়াল থাকবে না হয় সে থাকবে। কি স্পর্ধা বড়লোকের মেয়ের। সে নাকি বিড়ালের সাথে থাকবেন না"।

বিড়াল ভীতি নিয়ে এ সাতদিনে দু পরিবারের সম্পর্কে ফাটল দেখা দিয়েছে।

দুই.

মি: রহমান সাহেবের কাছে চেম্বারে নববধূ নিয়ে আসার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস শুনে বিষয়টা আমার কাছে খুবই ইন্টারেস্টিং লাগলো। রহমান সাহেবকে বাইরে পাঠিয়ে আমি তাকে জিগ্যেস করলাম,

"বিষয়টা খুলে বলুনতো", বেচারি কাঁদোকাঁদো হয়ে বললো,

" স্যার সত্যিই আমার বিড়ালে অসম্ভব ভয়। বিড়াল দেখলেই আমার গলা শুকিয়ে যায়, হাত পা কাঁপতে থাকে। অজ্ঞানের মতো অবস্থা হয়। সেটা ছোট বেলা থেকেই। সে জন্যে আমাদের বাসার চৌহদ্দি তে বিড়াল ছিলোনা। আমার বাবা যদিও বলতেন, 'মা বিড়াল অতি পোষা নিরীহ প্রানী',  কিন্তু স্যার তাতেও আমার বিড়াল ভীতি লেগেই ছিলো। স্কুল কলেজে যেতে রাস্তায় বিড়াল দেখলে সেদিন আমি স্কুলে যেতাম না"।

"সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে ক্যানো"?, আমি হেসে জিগ্যেস করলাম।

সে বললো, গত তিন চার দিন থেকে সে ইন্টারনেট ইউটিউব দেখে দেখে কোথায় যেনো পেয়েছে, কিছু কিছু মানুষের এরকম বিড়াল ভীতি থাকতে পারে। এটা এক রকমের মানসিক রোগ। তাই তিনি শ্বশুর কে নিয়ে এসেছেন।

তার শ্বশুর মি: রহমান একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ।  অবসর প্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মকতা। শ্বশুর কে খুলে বলায় তিনি সানন্দে রাজী হলেন। তবে কিছুটা গোপন রাখতে বললেন। তাই সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে আসাটা কেবল তিনি আর তার শ্বশুরই জানেন। এর একমাত্র কারন সাইকয়াট্রিক কাউনসেলিং নিতে এখনো আমাদের দেশে কিছুটা সংকোচ বা লজ্জাবোধ রয়ে গেছে। বিষয়টি শিক্ষিত জনের জন্যে হাস্যকর তথাপি দুজনকেই ধন্যবাদ দিলাম। তারা কিছুটা বুঝতে পেরেছেন, সমস্যা আসলে কোন জায়গায়।

অনেক সময় আমরা আমাদের  সমস্যা ঠিক কোন জায়গায় সেটাই বুঝতে পারিনা, তাই সমাধানে তালগোল পাকিয়ে ফেলি।

তিন.

পোকামাকড়, তেলাপোকা, জোঁক, সাপ,, শামুক, মাকড়শা ইত্যাদি তে অনেকের ভয় থাকতে পারে। এ ভয় অনেক সময় মারাত্মক রুপ নেয়। ভয় বা ফোবিয়ে যখন আপনার দৈনন্দিন জীবন কে বাধাগ্রস্ত করবে তখনই সেটা কে বলা হয় মানসিক রোগ। শুধুমাত্র বিড়াল ভীতি থাকার কারনে এখানে নববধূর সাথে তার পরিবারের সম্পর্কের অবনতি ঘটে যাচ্ছে এমন বিচ্ছেদের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। হয়ত তারা উচ্চ শিক্ষিত, তাই তারা বিষয়টি ধরতে পেরেছেন। এসব ভয়ভীতি কে অনেকে অনেক সময় বাতাস লাগা, উপরি ধরা ইত্যাদি মনে করে অপচিকিৎসার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারান। ভুক্তভোগী না পারেন সইতে, না পারেন কইতে।

বিড়াল ভীতি কে বলা হয় এইলোরো ফোবিয়া। এটি এক ধরনের মানসিক রোগ। এ রোগে আক্রান্ত রোগী বিড়াল দেখলেই মারাত্মক প্যানিক হয়ে যান। দৌড়ে পালাতে গিয়ে লংকা কান্ড ঘটিয়ে ফেলেন। এমন কি বিড়ালের ডাক শুনলেই তার মাঝে প্যানিক ডিসওর্ডারের কিছু লক্ষন দেখা দেয়। একমাত্র সাইকিয়াট্রিক কাউনন্সেলিং, কগনেটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি এবং মামুলী কিছু রিলাক্সেন দিলে এ রোগ বা এরকম স্পেসিফিক কোন প্রাণী বা অবজেক্টে ফোভিয়া টা চলে যায়।

পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত লোকের মধ্যে এইলোরো ফোভিয়া ছিলো তাদের মধ্যে বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডার, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, জার্মান চ্যান্সেলর এডলফ হিটলার, ইতালীয় সর্বাধিনায়ক মুসোলিনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

প্রশ্ন: স্যার আমি মেডিকেলের ৩য় বর্ষের ছাত্রী। মেডিকেলে ইতিমধ্যেই ১ বছর লস…

ডাক্তাররা রোগের চিকিৎসা করে, মৃত্যুর নয়

ডাক্তাররা রোগের চিকিৎসা করে, মৃত্যুর নয়

: ব্যাটসম্যানদের ভুলে আজ খেলাটা চলে গেল! : ভুল বলছেন কেন? বল…

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সিএমসি, ভেলোরে আমি যে রুমে বসে রোগী দেখছি সেখানে ইন্ডিয়ার অন্যান্য রাজ্যের…

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

রাস্তায় একজনের মুখে সরাসরি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিলো আনিস। আচমকা এ আচরণে…













জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর